‌সংবাদ সংস্থা, মুম্বই: ‘‌ব্যক্তিগত জীবনে চরম অসুখী ছিলেন। সাদা চোখে যা দেখা যায়, তার থেকে বাস্তব জীবন কতটা বিপরীত হতে পারে, তার চরম দৃষ্টান্ত ছিলেন শ্রীদেবী।’‌ বলছেন রামগোপাল বর্মা। ‘‌গ্রেট রবারি’‌, ‘‌গোবিন্দা.‌.‌.‌গোবিন্দা’‌, ‘‌হয়রান’‌–‌‌এর মতো পরপর ছবিতে এক সঙ্গে কাজ করছেন পরিচালক–‌‌অভিনেত্রী জুটি। এক খোলা চিঠিতে অভিনেত্রীর অকাল প্রয়াণে তঁার দেখা শ্রী–‌র স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পরিচালক লিখেছেন, ‘‌অনেকের কাছেই শ্রীদেবী ছিলেন একেবারে ‘‌পারফেক্ট’‌। সুন্দর মুখ, দুরন্ত প্রতিভা, সুখী সংসারে থিতু দু‌টি ফুটফুটে মেয়ের মা। বাইরে থেকে সব কত ঈর্ষাজনক, লোভনীয় মনে হত। কিন্তু শ্রীদেবী কি ব্যক্তিগত জীবনে সত্যিই সুখী ছিলেন?‌’‌ তেলুগু ছবি ‘‌ক্ষণ ক্ষণম’‌–‌‌এর সেটে তঁার সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় রামগোপালের। লিখেছেন, ‘‌বাবা বেঁচে থাকতে শ্রীদেবীর জীবন ছিল মুক্ত বিহঙ্গের মতো। তঁার মৃত্যুর পর অতি–‌সাবধানি মায়ের হাতে পড়ে খঁাচায় বন্দি পাখির দশা হয়েছিল তঁার। সব কিছুতেই মায়ের কড়া নজর থাকত। ওই সময়ে অধিকাংশ প্রযোজকই কালো টাকায় অভিনেতা–‌‌অভিনেত্রীদের পারিশ্রমিক দিতেন। আয়কর তল্লাশির আতঙ্কে শ্রীদেবীর উপার্জনের অধিকাংশ আত্মীয়‌–‌বন্ধুদের কাছে রেখেছিলেন তঁার বাবা। তঁার মৃত্যুর পর ওই সব কাছের মানুষই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এর পর তঁার অতি–‌সাবধানি মা ভুলভাল জায়গায় বিনিয়োগ করেন, অবৈধ সম্পত্তি কেনেন, যা আরও সমস্যার হয়ে দঁাড়ায়। বনি কাপুরকে যখন বিয়ে করেছিলেন শ্রীদেবী, তখন তিনি প্রায় কপদর্কশূন্য। বনির অবস্থাও তখন বেশ খারাপ। টাকাপয়সা নেই বললেই চলে। মায়ের মৃত্যুর পর অভিনেত্রীর একমাত্র বোন শ্রীলতা বাড়ি থেকে পালিয়ে তঁার প্রতিবেশীকে বিয়ে করেন। এবং সম্পত্তির ভাগ দাবি করেন। যদিও সম্পত্তির সবই ছিল শ্রীদেবীর কষ্টার্জিত উপার্জন। এবং তঁার মা তঁাকেই সব দিয়ে গিয়েছিলেন। বিবাদ আদালত অবধি গড়ায়। এবং মামলা লড়তে অনেক টাকা খরচ হয়। তা ছাড়া মায়ের মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার এবং চিকিৎসকদের ভুলে মায়ের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা লড়তে আগেই প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছিল।’‌ সারা দেশের নয়নমণি ছিলেন। অথচ কঠিন সেই সময়ে এক বনিকে ছাড়া কাউকেই পাশে পাননি শ্রীদেবী। স্ত্রী নামী সাংবাদিক মোনা শৌরিকে বিচ্ছেদ দিয়ে ১৯৯৬–‌‌এ শ্রীদেবীকে বিয়ে করেন বনি। এক পঁাচতারা হোটেলে সন্তানসম্ভবা অভিনেত্রীর পেটে লাথি মেরেছিলেন বনির মা!‌ বউমা মোনার ঘর ভাঙার জন্য তঁাকে দায়ী করেছিলেন। অভিযোগ রামগোপালের। আক্ষেপ করেছেন, সারা জীবন দুঃখকষ্টই পেয়েছেন অভিনেত্রী। স্পষ্ট করে পরিচালক লিখেছেন, শিশুশিল্পী ‌হিসেবে অভিনয়ে আসা। স্বাভাবিক জীবনের স্বাদই পাননি। ফলে গভীর অসুখী ছিলেন। অন্তরের ব্যথা ঢাকতে নিজেকে বাইরে থেকে বেশি সুন্দর রাখতে খুবই উদ্যোগী ছিলেন শ্রীদেবী। মত রামগোপালের। লিখেছেন, ‘‌খুব লাজুক ছিলেন শ্রীদেবী। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। আত্মবিশ্বাস বলে কিছুই ছিল না। আর সব সময় আতঙ্কে থাকতেন, পাছে কেউ তঁার মনের অবস্থা বুঝে ফেলেন!‌ তাই একটা অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রাখতেন। যা সহজে ভেদ করা যেত না।’‌ লিখেছেন নিজস্ব মতামত ছিল না বলেই কখনও বাবা–‌‌মায়ের, কখনও আত্মীয়‌পরিজন, স্বামী এমন–‌কি সন্তানদের ইচ্ছেতেও সায় দিতে হত। একেবারে শিশু বয়সে খ্যাতি পাওয়ায় স্বাধীনচেতা হওয়ার সুযোগ ঘটেনি। যা ইচ্ছে তাই করার সাহস হয়নি। তাই ক্যামেরায় সামনেই শুধু নয়, পেছনে ‘‌মেক–‌‌আপ’‌ করে থাকতেন শ্রীদেবী। মনের অবস্থা ঢাকার একটা চেষ্টা করতেন। একই সঙ্গে অন্য অভিনেত্রীর মতো বয়স বাড়া তঁাকেও বিচলিত করত। বয়স ঢাকার জন্য অনেক অস্ত্রোপচারও করতেন। বহু বছর ধরে করেছেন। তা দেখেই অনুমান করা যেত। তবে কোনও কিছুই ওঁর বেদনা ঢাকতে পারেনি। ওঁর চোখে বেদনা দেখা যেত। মহিলার শরীরে বন্দি আসলে একটি শিশু ছিলেন শ্রীদেবী। ব্যক্তিগত জীবনে বার বার আঘাতে জেরবার হয়ে সহজে বিশ্বাস করতে পারতেন না। লিখেছেন পরিচালক। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সদ্য মা–‌হারা অভিনেত্রীর দুই মেয়ে জাহ্নবী ও খুশিকে নিয়ে। অনেক পরিচিতের মতোই বাথটবে ডুবে শ্রীদেবীর মৃত্যুর ঘটনাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। জল্পনা উসকে তঁার অনুমান, এর পেছনে অবসাদের ওষুধ আছে!‌ ‌লিখেছেন, ‘‌অবসাদে অনেকে আত্মহত্যা করেন। অনেকে অবসাদ মেটাতে কঁাড়ি–‌কঁাড়ি ওষুধ খান। বোঝেনও না কী মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে!‌’‌ অধিকাংশ ‘‌দুর্ঘটনাজনিত’‌ মৃত্যু বড় বড় অনু্ষ্ঠানের পর হয়, এই মত প্রকাশ করে রামগোপালের ব্যাখ্যা, ‘‌যঁারা অবসাদগ্রস্ত, তঁারা বুঝে উঠতে পারেন না, কেন সারা পৃথিবী এত খুশি, তঁাদের কীসের এত আনন্দ!‌ তাতে তঁাদের ব্যক্তিগত দুঃখ আর বড় করে দেখা দেয়। মনে হয় পৃথিবীতে সব ঠিক আছে। যে যেখানে আছে, ভাল আছে। সব দোষ শুধু তঁাদের!‌’‌ ‌রামগোপাল শেষ করেছেন এই ভাবে, ‘রেস্ট ইন পিস— কথাটা সচরাচর বলি না। তবে এ–‌ক্ষেত্রে অন্তর থেকে বলছি। কারণ আমার মনে হয় এবার অবশেষে এবং সত্যিই তিনি শান্তি পাবেন। পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি না। তবে একান্ত অনুরাগী হিসেবে পুনর্জন্ম চাইছি, যাতে আবার আপনাকে দেখতে পারি। এবং কথা দিচ্ছি, আপনার যোগ্য অনুরাগী হয়ে উঠতে কোনও কসুর করব না।’‌ যোগ করেছেন, ‘‌ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি অ্যাকশন আর কাটের মধ্যের সময়টা শান্তিতে থাকতেন, আনন্দে থাকতেন শ্রী। কারণ ওই সময়টা রূঢ় বাস্তবের থেকে খানিক পালিয়ে কল্পনার জগতে বিচরণ করতেন।’‌ লিখেছেন, ‘‌মনশ্চক্ষুতে দেখছি আপনি মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়াচ্ছেন। দু’‌চোখে শান্তি আর আনন্দ নিয়ে পরলোকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’‌ ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top