‌অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: • এই মুহূর্তে আপনি তো যতখানি সিনেমার, ততটাই থিয়েটারের। আবার নতুন নাটক নিয়ে মঞ্চে আসছেন কাল।
•• হ্যঁা, বেহালা ব্রাত্যজনের ‘‌তারপর একদিন’‌ কলকাতার মঞ্চে কালই প্রথম করব। আকাদেমিতে। কাঞ্চন আমিনের পরিচালনায়।
• এই মুহূর্তে কতগুলো নাটক করছেন?‌
•• ‘‌সংসৃতি’‌র প্রযোজনায় ‘‌তুঘলক’‌ করছি। ‘‌নাট্যশালা’‌র ‘‌সোক্রাতেস’‌-‌এও নামভূমিকায়। অসাধারণ টেক্সট। মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। এছাড়া ‘‌কোরাস’‌-‌এর প্রযোজনায় করছি ‘‌বন্ধের দশ দিন’‌।
• এটা তো সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প থেকে তৈরি?‌
•• হ্যঁা, অমিতাভ দত্তর নাট্যরূপ।
• আপনি কি এখন সিনেমার চেয়ে বেশি থিয়েটারের?‌
•• থিয়েটার আমার রক্তে। কিন্তু আমি তো একজন অভিনেতা। সিনেমাকে কম গুরুত্ব দিচ্ছি, সেটা একেবারেই নয়। এই তো সবে ফিরলাম কসৌলি থেকে ‘‌অন্তর্লীন’‌-‌এর আউটডোর শুটিং সেরে।
• সিনেমা করছেন, থিয়েটার করছেন, কিন্তু টিভি সিরিয়ালে আপনি বহু বছর অনুপস্থিত। সেটা কি একঘেয়েমির কারণে?‌
•• এমন সোজাসাপ্টা ভাবে বললে বড্ড সরলীকরণ হয়ে যাবে। আমি একজন পেশাদার অভিনেতা। অভিনয় করতে করতেই একঘেয়েমি কাটাতে হবে। কিন্তু এক-‌একটা সিরিয়াল তো প্রায় বছর দুয়েক ধরে চলে। আমি যদি করি কেন্দ্রীয় চরিত্রই করব। এখন মাসে কুড়ি-‌বাইশ দিন যদি ধারাবাহিকেই ‘‌এনগেজড’‌ থাকি তাহলে ফ্রিলান্স কাজ করতে পারব না। ছবি এলে ছেড়ে দিতে হবে। নাটকও করতে পারব না। কিন্তু টিভি নিয়ে, ধারাবাহিক নিয়ে আমার কোনও গোঁড়ামি নেই।
• ধারাবাহিক করছেন না, অথচ ধারাবাহিকভাবে থিয়েটার করছেন।
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ এটা ভাল বলেছেন।
• কিন্তু ধারাবাহিক যে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, বাংলা থিয়েটার তো তার ধারে কাছেও নেই?‌
•• এটা ঠিকই ধারাবাহিকে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আছে, নিরাপত্তা আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কি সেই আর্থিক নিরাপত্তার চাপটা আমার এখন নেই। ফলে, অন্য চরিত্রে নিজেকে এক্সপ্লোর করতে পারছি। এটাই আমি বেশি পছন্দ করি। থিয়েটারে ফিরি বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করব বলে। সেজন্যই ২০০৯-‌এর পর থেকে আমি কোনও ধারাবাহিক করিনি। কিন্তু যদি নির্দিষ্ট পর্বের ধারাবাহিক হয়, লিমিটেড পর্বের, তাহলে চরিত্র এবং গল্প পছন্দ হলে নিশ্চয়ই করতে পারি।
• কিন্তু, যেটা জিজ্ঞেস করছিলাম, নাটকে তো টাকা নেই?‌
•• সেই অর্থে টাকা নেই আমাদের থিয়েটারে। রুজি-‌রোজগারের জায়গাটা থিয়েটার দেয় না। কিন্তু সেই ৮৭ সাল থেকে আমি থিয়েটার করছি।
• কোন দলে শুরু?‌
•• ‘‌অন্তর্মুখ’‌ নাট্যদলে, সৌমিত্র বসুর পরিচালনায় নাটক করেছিলাম। তারপর আমি প্রায় চোদ্দ-‌পনেরোটা আলাদা আলাদা নাটকের দলে কাজ করেছি। এই ২২ বছরে এমন একটা বছরও যায়নি, যখন আমি থিয়েটার করিনি। কোনও বছরেই আমি থিয়েটারটা বন্ধ রাখিনি। তবে টাকার জন্যে তো থিয়েটার করা নয়। যদিও এখন অনেক নাট্যদলই নিজেদের মতো করে কিছু কিছু টাকা সবাইকেই দেয়। এটা তো ভাল লক্ষণ।
• তাহলে নিজেকে বারবার আবিষ্কারই থিয়েটার করার মূল কারণ?‌
•• এটা তো বটেই। আসলে, আমাদের এখানে নতুন অভিনেতা, অভিনেত্রীদের জন্যে ওয়ার্কশপ হয়। কিন্তু আমাদের জন্যে তো কোনও ওয়ার্কশপ নেই। তাই নিজেকে আপ-‌টু-‌ডেট রাখার জন্যে, নিজেকে ধার দেওয়ার জন্যে আমার কাছে থিয়েটার করাটা জরুরি।

এখানে অভিনয়ের স্কোপ অনেক বেশি। হাতে-‌গরম রি-‌অ্যাকশন পাওয়া যায়। থিয়েটারে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ অনেক বেশি হয়। ‘‌তুঘলক’‌ বা ‘‌সোক্রাতেস’‌-‌এ আড়াই ঘণ্টার নাটকে মঞ্চে তো আমি প্রায় সোয়া দু’‌ঘণ্টা থাকি। ফলে, প্রতিদিন-‌ই একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। নিজেকে টাটকা রাখার এক্সারসাইজ।
• তথাকথিত ছোট দল, বড় দল—সব ধরনের নাটকের দলেই আপনাকে অভিনয় করতে দেখা যায়। নাটক বা দল বাছেন কীভাবে?‌
•• বড় দল, বড় ডিরেক্টর দেখে নাটক করি না। ‘‌নাট্যশালা’‌ তো নতুন দল। সেখানে রানা বসুর পরিচালনায় ‘‌সোক্রাতেস’‌ করছি। আমি প্রথমত নাটকের টেক্সট-‌টা দেখি এবং দেখি আমার চরিত্রটা। যে ধরনের চরিত্র আমি আগে করিনি, সেটাই আমাকে উদ্দীপ্ত করে, টানে। এটাই আমার বিবেচনায় থাকে নাটক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে।
• থিয়েটারের তো অনেক কল শো থাকে। তার জন্যে সিনেমা ছাড়তে হয়েছে?‌
•• কখনও ছাড়তে হয়নি, এমন নয়। কল-‌শো-‌র জন্যে অনেক আগে থেকে আমি ডেট ব্লক করে রাখি। ফলে, সচরাচর অসুবিধে হয় না।
• কতদূর পর্যন্ত কল-‌শো-‌এ যান?‌
•• দিল্লি, বেঙ্গালুরু তো যাই-‌ই। প্রত্যন্ত উত্তরবঙ্গেও শো করেছি। গ্রামের ভেতরেও। এক-‌এক জায়গায় এক-‌এক রকম দর্শক। তাদের কাছে কীভাবে অভিনয় দিয়ে পৌঁছব এটাও তো একজন অভিনেতার চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সব নাটক সব জায়গায় বা ছোট স্টেজে করা সম্ভব নয়। যেমন ‘‌বন্ধের দশ দিন’‌ গ্রামে ছোট মঞ্চেও করা সম্ভব, যেটা ‘‌তুঘলক’‌-‌এ সম্ভব নয়।
• থিয়েটারে যেমন চরিত্র বেছে অভিনয়ের সুযোগ আছে, সিনেমায় কি সেটা পারেন?‌ বহু ছবিতেই তো আপনি নায়ক বা নায়িকার বাবা এবং ভয়ঙ্কর টাইপের ভিলেন?‌
•• প্রথমত, সংসারের চাকা চালাতে হয় সিনেমায় অভিনয় করে। তাই, ‘‌না’‌ বলার উপায় তো সব সময় থাকে না। আমি তো শখের অভিনেতা নই, পেশাদার। ফলে, অভিনেতা হিসেবে চরিত্রের প্যারামিটারটা আমি ঠিক করতে পারি না। হ্যঁা, আপনি যেমন বললেন, এমন চরিত্র আমি বহু করেছি। কিন্তু ২০০২ থেকে ২০১১/‌১২ পর্যন্ত কমার্শিয়াল ছবির যে রমরমা ছিল, এখন সেটা নেই। দর্শকরা মুখ ফিরিয়েছেন। ফলে অন্যরকম একটা নাগরিক বা আর্বান ছবি শুরু হয়েছে। আমিও সেই সব ছবিতে আরও বেশি অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছি। আগেও করেছি, কিন্তু ২০১২-‌র পর এধরনের ছবিতে অভিনয়ের সংখ্যা বেড়েছে, যা প্রথাগত বা ফর্মুলা মেনে চলা চরিত্রের মধ্যে পড়ে না।
• তাহলে, ফর্মুলা ছবির ফর্মুলা চরিত্র এখন আর উত্তেজিত করে না?‌
•• ওই যে বললাম, পেশাদার অভিনেতার শুধু উত্তেজনা খুঁজে বেড়ালে তো চলবে না। উত্তেজনার খোরাকটা অন্য জায়গা থেকে পেয়ে যাই।
• সেটা তাহলে থিয়েটার?‌
•• অবশ্যই। সেজন্যেই তো গত ২২ বছর ধরে লাগাতর থিয়েটারের সঙ্গে আছি।
• থিয়েটারও আপনার সঙ্গে আছে।
•• এটা তো কমপ্লিমেন্ট। মাথা পেতে নিলাম। তবে, থিয়েটারের সঙ্গে আজীবন থাকব, এটা নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই।

আমাদেরও শুভেচ্ছা রইল, বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে নিবিড়ভাবেই থাকুন তিনি। তবেই তো ‘‌তুঘলক’‌ বা ‘‌সোক্রাতেস’‌কে আজও মঞ্চে পাব আমরা। যেমন আগামীকাল নতুন করে মঞ্চে পাব তাঁকে, সিনেমা ও নাটকের পরিচালক ‘‌বিনায়ক চট্টোপাধ্যায়’‌ হিসেবে।‌

 ‌তারপর একদিন:‌ মহড়ায় রজতাভ দত্ত, সঙ্গে সঙ্গীতা পাল‌, ছবি:‌ বিপ্লব মৈত্র‌

জনপ্রিয়

Back To Top