সঙ্কর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: • দেখতে দেখতে গান–জীবনের কুড়ি বছর। শুরুর সেই রাঘব চট্টোপাধ্যায় আর আজকের রাঘবে কোনও পরিবর্তন?‌
••‌ প্রথম দিনে আমার যে মানসিকতা ছিল, আজও একইরকম আছে;‌ আমি সবসময় একটু ঘরোয়া পরিবারের সঙ্গে কাটাতে পছন্দ করি। রেওয়াজ, ভাল গান শোনা, নতুন সুর নিয়ে ভাবনা, শুরুর দিনগুলিতে যেমন ছিল, আজও আছে এখন সেই সঙ্গে দুই মেয়ে আনন্দি ও আহিরিকে নিয়ে গান করতে বসা। প্রথম দিন থেকে আজও নৈহাটিতেই আছি। সব কিছুই আগের মতোই আছে যতই আমি দেশে–বিদেশে অনুষ্ঠান করি না কেন। হ্যাঁ, এইটুকু বলব গানের দিক থেকে অনেক ম্যাচিওরিটি এসেছে আজকের রাঘবের।
•‌ গান–জীবনের কুড়ি বছরের অনুষ্ঠান। একক সঙ্গীত নয় কেন?‌
••‌ কুড়ি বছর উদ্‌যাপনে সাধারণত যেমন হয়, একক গানের আসর তেমনভাবে আমি করতে চাইনি। সমাজের অবহেলিতদের জন্য আমরা তো কিছুই করতে পারি না। ‘‌হৃদয়া’‌ বলে একটা সংস্থা গরিব বাচ্চাদের হার্টের অপারেশনের দায়িত্ব নিয়েছে। এই ‘‌উনিশে কুড়ি’‌ অনুষ্ঠানটা তাদের সাহায্য করার জন্যই। আমার গানের বন্ধুরা যাঁরা এই কুড়ি বছর আমার সঙ্গী, তাঁদের আমার এই ভাবনার কথা বলি। ওঁরা এই কথা শুনে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। অনুষ্ঠানের প্রথম অর্ধে ওঁদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ কীভাবে বা আমাকে কী চোখে দেখেন, সেকথার সঙ্গে সঙ্গে আমার একটা করে জনপ্রিয় গান থাকবে। সঙ্গে ওঁরা নিজেদের গানও গাইবেন। দ্বিতীয় পর্বে পুরোটা আমি থাকছি। মীর পুরো অনুষ্ঠানটা স্বেচ্ছায় সঞ্চালনা করবেন এমন একটি উদ্যোগের জন্য।
• ছোটবেলায় মার কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম, সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমিতে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কাছে তালিম পরবর্তীতে উস্তাদ রাশিদ খাঁর কাছে তালিম নিয়ে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী না হয়ে আধুনিক তথা লাইট গানে কেন?‌
••‌ আমার শুরুটা গিটার দিয়ে। পরে গান গাইব ঠিক করি। গানটা ভাল করে রপ্ত করার তাগিদেই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শেখা। তবে আধুনিক গান গাইলে অনেক শ্রোতার কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়।
•‌ কখনও কি মনে হয় বাংলা গান চ্যালেঞ্জের মুখে?‌
••‌ সেটা তো কিছুটা নিশ্চয়। প্রথমত এত গান, এত গায়ক। শ্রোতা কম। অতিরিক্ত কিছু হলেই সেটার মান পড়তে বাধ্য। বাংলা গানের ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে। সবই যে খারাপ হচ্ছে তা নয়। তবে খারাপ কাজের ভিড়ে ভাল কাজ হারিয়ে যাচ্ছে। শ্রোতাদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছোনো যাচ্ছে না।
•‌ বাংলা ছবির গান কি বৈচিত্র‌্য হারাচ্ছে?‌
••‌ বাংলা ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে যাঁরা আছেন, তাঁদের বাইরে অনেকেই ভাল ভাল কাজ করছেন। তাঁরা ঠিকমতো ছবির প্রযোজক, পরিচালকের কাছে পৌঁছোতে পারছেন না। এই কারণে একটা একঘেয়েমি তো আছেই। এটা কাটাতে নতুন মুখ চাই।
• আপনি নিজেও তো ছবির সঙ্গীত পরিচালক?‌
•• ‘‌বিটনুন’‌ বলে একটা ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলাম। যার পরিচালক সুদেষ্ণা রায় ও অভিজিৎ গুহ। চারটে গান রেখেছিলাম। ‘‌জানি পাল্টে যায়’‌‌ বলে গানটা সুপার হিট। রূপঙ্কর প্রতিটি অনুষ্ঠানে গানটি করে। আমাকে তো সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ দেয় না। আমায় দিলে আমার মনে হয় না যাঁরা করছেন, তাঁদের থেকে খারাপ করব। আমার মতো আরও অনেকে আছেন, যাঁরা খুব ভাল কম্পোজার, সুযোগ পাচ্ছে না। আমি কাউকেই ছোট করছি না। সবাই সবার মতন করে করছেন। কিন্তু, আমরাও আছি যারা ভাল গান বানাতে পারি, ভাল গান দিতে পারি। প্রযোজকদের বলব একই মানুষকে দিয়ে পঞ্চাশটা কাজ না করিয়ে, তাদেরও ৩০টি দিন আমাদের অন্তত ১০–‌১২টা দিন। আমরাও কিন্তু ভাল কাজ করব, সেই ভরসাটা রাখুন।
•‌ ছবির গানে আপনার কণ্ঠ কি কম ব্যবহৃত?‌
••‌ আমি বাংলা ছবির থেকে বেশি গেয়েছি হিন্দি ছবিতে। শঙ্কর–‌এহসান–‌লয়, সাজিদ–‌ওয়াজিদ, শান্তনু মৈত্র, সঞ্জয় লীলা বনশালির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমার গানের নিজস্ব গায়কি আছে। সেটা হয়তো সব বাংলা ছবির সঙ্গে যায় না। দ্বিতীয়ত, আমার পি–আর খুব খারাপ। সেটা একটা কারণ হতে পারে। তবে আমার কিন্তু খুব একটা আপশোস নেই। ‘‌আমি বেসিক অ্যালবামের ওপর জোর দিয়েছি। ছবির গান ছাড়াও গান হিট করানো যায়, আমার এটাই বিশ্বাস। তাই আজ কুড়ি বছর পরেও অনুষ্ঠানে প্রথম অ্যালবাম ‘‌ভোরের আলো’‌র গানের অনুরোধ আসে। এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া।
•‌ আপনি কি মনে করেন হিট গান মাত্রেই ভাল গান?‌
•• একেবারেই না। এখন তো বেসুরো বলেই কিছু হয় না। এখন বেসুরো বেতালা লোককেও সফ্‌টঅয়্যারের সাহায্যে সুরে তালে করে দেওয়া যায়। এখন অনেক বেসুরো শিল্পীর গান বাজারে হিট। তার সঙ্গে ভাল গানের কোনও যোগ নেই।
•‌ আজকের কলামন্দিরে ‘‌উনিশে কুড়ি’‌ অনুষ্ঠানে নতুন গান নিশ্চয় থাকছে?‌
••‌ আমি সবসময় নতুন গান গাইতে ভালবাসি। আজকের অনুষ্ঠান আমার গান জীবনের বিশ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান যেমন, তেমনি এক সামাজিক দায়বদ্ধতার অনুষ্ঠান। আজ আমার কাছে সত্যিই আনন্দের দিন। এমন দিনে অবশ্যই নতুন গান গাইব, নিজের সুরের পাশাপাশি দুই মেয়ে আনন্দি ও আহিরির কম্পোজিশনও গাইব। ওরা দুজনেই থাকবে আমার সঙ্গে এটাই আমার কাছে বড় পাওনা।

ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top