শিল্পী দাস: আলপনা আঁকতেন। এঁকেছিলেন বিয়ের পিঁড়ি। সেই আঁকায় মুগ্ধ হয়ে কিশোরী নিভাননীর সঙ্গে নোয়াখালির জমিদার–‌পুত্র মনোরঞ্জন চৌধুরি ঠিক করলেন ভাই নিরঞ্জনের সঙ্গে বিয়ে দেবেন এই কন্যার। সেটা ১৯২৭ সাল। এবং এই আঁকার গুণ দেখে তাঁর স্বামী নিয়ে গেলেন শান্তিনিকেতনে, রবীন্দ্রনাথের আশ্রয়ে বা আশ্রমে। পাল্টে গেল নিভাননীর জীবন। তিনি হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথের চিত্রনিভা।
চিত্রনিভা চৌধুরির জন্ম ১৯১৩ সালের ২৭ নভেম্বর মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জে। মা শরৎকুমারী দেবী ও বাবা ড.‌ ভগবানচন্দ্র বসু। পৈতৃক নিবাস ত্রিপুরার চাঁদপুর জেলায়। বছর সাতেক যখন বয়স, তখন তিনি পিতৃহারা হন এবং তাঁর ছোটবেলা কাটে মা শরৎকুমারী দেবীর বাপেরবাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জে। ছোট থেকেই শিল্পের প্রতি আগ্রহ। চক ও খড়ির সাহায্যে নানা ধরনের আলপনা আঁকা, সুরকি, কাঠকয়লা, চালের গুঁড়ো আর শুকনো বেলপাতার গুঁড়ো মিশিয়ে নানা ধরনের রঙের কাজে মেতে থাকতেন তিনি। বিয়ের ও নানান অনুষ্ঠানে পিঁড়িতে আলপনা দেওয়ার মাধ্যমেই ছোট্ট নিভাননীর শিল্পচর্চা শুরু হয়েছিল। তখনও তাঁর নিভাননী থেকে চিত্রনিভা হয়ে ওঠা হয়নি।
তাঁর বৈবাহিক জীবনের সূচনাও শিল্পকলার মাধ্যমেই। নোয়াখালির লামচর নিবাসী জমিদার ঈশ্বরচন্দ্র চৌধুরির জ্যেষ্ঠ পুত্র মনোরঞ্জন চৌধুরি, নিভাননীর আঁকা বিয়ের পিঁড়ি দেখে মোহিত হয়ে তৎক্ষণাৎ মেয়েটির খোঁজ করে তাঁর সঙ্গীত ও কাব্যচর্চার ব্যাপারে পরখ করে নিজের কনিষ্ঠ ভাই নিরঞ্জন চৌধুরির সঙ্গে বিয়ের কথা মনস্থির করে ফেলেন। মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে ১৯২৭ সালে নিভাননীর বিয়ে হয়। তাঁর জমিদার শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকে ছিলেন শিক্ষিত, সংস্কৃতি‌মনস্ক ও স্বদেশি আন্দোলনের চেতনায় দীক্ষিত। লামচরের এই চৌধুরি পরিবার তথা নিভাননীর শ্বশুরকুল ছিল সময়ের চেয়ে বেশ কিছু ধাপ এগিয়ে।
নববধূর শিল্পানুরাগ ও শৈল্পিক সত্তার বিকাশে তাঁদের আগ্রহ ছিল প্রবল। সংসারের দায়দায়িত্ব পালনে তাঁকে না জড়িয়ে শ্বশুরকুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নিভাননীকে শিল্পশিক্ষার জন্য শান্তিনিকেতনে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের আশ্রমে পাঠানোর। ১৯২৮ সালে স্বামী নিরঞ্জন চৌধুরির সঙ্গে সুদূর লামচর থেকে নিভাননী পৌঁছোলেন কবিগুরুর আশ্রমে। সদ্যবিবাহিতা কিশোরীর কল্পজগতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘‌ধ্যানের ঋষি’‌ এবং তাঁর ‘‌ধ্যানের আশ্রম’‌ ছিল শান্তিনিকেতন। শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সূচনা ঘটল নিভাননীর শিল্পজীবনে নতুন এক অধ্যায়ের।
এমন এক চিত্রে–‌সমর্পিত কন্যাকে দেখে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘‌চিত্রনিভা’‌ নাম দিলেন। সত্যিই পাল্টে গেল তাঁর জীবন। হৃদয়ে–‌বাহিরে, স্বদেশে–‌বিদেশে, শোকে–‌আনন্দে শিল্পী চিত্রনিভার জীবনে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই তাঁকে ছাত্রী থাকাকালীনই আশ্রমের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভুবনডাঙার মাঠেঘাটে স্কেচ করে বেড়ানোর অনুমতি দিয়েছিলেন। যখন যা কিছু বোঝার ইচ্ছে হত একছুটে চলে যেতেন গুরুদেবের কাছে। চিত্রনিভা বহুবার খুব কাছ থেকে কবিকে ‘‌ধ্যানমগ্ন ঋষিরূপে’‌ দেখেছেন। আত্মকথায় শিল্পী লিখেছেন, ‘‌আমাদের জন্য খোলা ছিল তাঁর হৃদয়ের দ্বার। তাই আমাদের যখন ইচ্ছে হয়েছে তাঁর কাছে গিয়ে হাজির হয়েছি।’‌ চিত্রনিভা কী কী ছবি আঁকলেন সেই ব্যাপারে গুরুদেব যথেষ্ট আগ্রহ দেখাতেন। তিনিও যখন যা ছবি আঁকতেন, কবিকে দেখাতে নিয়ে যেতেন। তখন ১৩৩৮ সালের বৈশাখ মাস, একদিন চিত্রনিভা তাঁর আঁকা কিছু ডিজাইন গুরুদেবকে দেখাতে গিয়েছিলেন। ডিজাইনের মাঝখানে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা থাকায় কবি সেই শূন্যস্থানটি পূরণ করেছিলেন একটি নতুন কবিতা লিখে—
‘‌যখন ছিলেম অন্ধ,/‌সুখের খেলায় বেলা গেছে পাইনি তো আনন্দ.‌.‌.‌॥‌’‌
যতবার ছবি দেখাতে যেতেন ততবার গুরুদেব আগ্রহের সঙ্গে ছবিটি দেখে তাঁকে আশীর্বাদ করে বলতেন, ‘‌তোমার শক্তি আছে, তুমি পারবে, তোমায় আশীর্বাদ করলুম।’‌ 
নন্দলাল বসুর প্রিয় ছাত্রী আলপনা আঁকায় সিদ্ধহস্ত চিত্রনিভাকে শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েরা ‘‌আলপনাদি’‌ নামে সম্বোধন করতেন। কলাভবন প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘‌কালোবাড়ি’‌–‌র ‘‌শিবের বিয়ে’‌ ম্যুরাল নির্মাণে চিত্রনিভার বিশেষ অবদান রয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে ডেকে পাঠায় রাজঘাটে গান্ধীমণ্ডপ জুড়ে আলপনা দেওয়ার জন্য। প্রখ্যাত শিল্পী সুখময় মিত্র ও দিনকর কৌশিক তাঁকে এই কাজে সহযোগিতা করেছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসু শতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে ডাকা হয়েছিল আলপনা দেওয়ার জন্য। কলাভবনে ১৯৩৪ সালে তাঁর শিল্পশিক্ষা সমাপ্ত হলে কবিগুরু ও নন্দলাল বসুর ইচ্ছানুসারে তিনি ১৯৩৫ সালে কলাভবনে শিল্প–‌অধ্যাপিকার পদে যোগ দেন। সেই অর্থে তিনিই ছিলেন কলাভবনের প্রথম অধ্যাপিকা। সুখময় মিত্র, নিহাররঞ্জন চৌধুরি, সুকৃতি চক্রবর্তী, শঙ্খ চৌধুরি এইসব প্রখ্যাত শিল্পী ছিলেন তাঁর ছাত্র। ১৯৩৬ সালে এক বছর অধ্যাপনা করার পর চাকরিজীবন থেকে অব্যাহতি নিয়ে চিত্রনিভাকে ফিরে যেতে হয় লামচরে। 
লামচরে ফিরে তিনি উদ্যোগ নিলেন গ্রামের মহিলাদের শিল্পশিক্ষার মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তোলার। বাংলাদেশের ঢাকা শহরে তাঁর ভাশুর (‌ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের বিভাগীয় প্রধান)‌ ড.‌ জে কে চৌধুরির বাড়ির বৈঠকখানার দেওয়াল জুড়ে প্রথম জয়পুরী রীতির ভিত্তিচিত্রটি তিনি আঁকলেন। মনে হয় বিনোদবিহারীর আঁকা হিন্দি ভবনের ফ্রেসকোটির আগে এটিই ছিল শান্তিনিকেতন–‌উত্তীর্ণ কোনও বাঙালি শিল্পীর নির্মিত বৃহত্তম ফ্রেক্সোচিত্র। দেশভাগের পরে বারংবার বাড়িটির মালিকানা হস্তান্তরিত হওয়ার ফলে ভিত্তিচিত্রটির আজ আর কোনও অস্তিত্ব নেই।
নিসর্গ, বিশেষত ফুলের ছবি, শান্তিনিকেতনের জীবন ও নানা অনুষ্ঠান, সাঁওতালদের জীবনযাপন, পুরাণকল্পমূলক বিষয় নিয়ে তিনি বেশ কিছু ছবি সৃষ্টি করেছেন যেমন ধ্রুব, ননিচোরা, বাল্মীকি প্রতিভা, একলব্য। আর রয়েছে তাঁর মুখাবয়বের চিত্রের বিপুল সম্ভার।
১৯৪৬ সালে তিনি দুই সন্তান— চিত্রলেখা চৌধুরি ও রঞ্জিত চৌধুরিকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে আসেন শিক্ষাদানের জন্য। চিত্রনিভা চৌধুরি ঠিক এই সময় মনোনিবেশ করেন মুখাবয়ব প্রতিকৃতি অঙ্কনে এবং জীবনের এই অধ্যায়ে তাঁর শিল্পসম্ভার ভরে ওঠে শান্তিনিকেতনে ঘুরতে আসা স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বদের মুখাবয়ব প্রতিকৃতিতে। এই ব্যাপারে তাঁকে বিশেষ সহযোগিতা করেন ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। শিল্পকলার প্রায় সবকটি বিষয় ছাড়াও মানব প্রতিকৃতি–‌অঙ্কনে তাঁর দক্ষতা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরোজিনী নাইডু, হাজারী প্রসাদ দ্বিবেদি, মহাত্মা গান্ধী, খান আবদুল গফফর খান, রামকিঙ্কর বেজ, বিনোদবিহারী মুখার্জি, ক্ষিতিমোহন সেন প্রমুখ ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতির এই শিল্পকর্মগুলি নিঃসন্দেহে জাতীয় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে। 
বহু ছবি এঁকেছেন। কিন্তু তাঁর আঁকা ‘‌বসন্ত উৎসব’‌–‌কে তাঁর অন্যতম সেরা ছবি বললে অত্যুক্তি হবে না। সেই ছবিতে বড় জীবন্ত হয়ে আছেন তাঁর জীবনের আদর্শ ‘‌ঋষি রবীন্দ্রনাথ’‌।

শিল্পী চিত্রনিভা চৌধুরি, (‌ছবি সৌজন্য:‌ চিত্রনিভা চৌধুরির কন্যা বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী চিত্রলেখা চৌধুরির সৌজন্যে এই ছবি)‌।‌

জনপ্রিয়

Back To Top