অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‘‌দেবদাস’‌কে পছন্দ করতেন না স্বয়ং শরৎচন্দ্র। এই ‘‌কাঁচা লেখা’‌টা প্রকাশ হোক, এটাও চাননি তিনি। কিন্তু এই কাঁচা লেখাই যে কত পাঠকের হৃদয়-‌হরণ করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। এবং শরৎচন্দ্রের এই ‘‌কাঁচা’ কাহিনি নিয়ে কত যে সিনেমা হয়েছে বাংলা এবং হিন্দিতে!‌ আজও এই কাহিনি উত্তর-‌আধুনিক পরিচালকদেরও‌ সমানতালে টেনে যাচ্ছে। তাঁরাও ‘‌দেবদাস’‌কে বিনির্মান করতে করতে এগোচ্ছেন এবং খুঁজে যাচ্ছেন ‘‌দেবদাস’‌-‌এর অন্তর্গত রক্তের ভিতরে ভালবাসার কোন খেলাটা আজও বহমান।
কিন্তু বাংলা ছবিতে প্রথম যিনি ‘‌দেবদাস’‌কে নিয়ে এলেন, আলোড়ন তুললেন এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় ছবির শিরোপা তুলে দিলেন, তিনি প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া। সেই প্রমথেশকেও ‘‌দেবদাস’‌ করতে বারণ করেছিলেন শরৎচন্দ্র।
গৌরীপুরের রাজার কুমার প্রমথেশচন্দ্র প্রেসিডেন্সি থেকে যখন পদার্থবিদ্যায় বি এস সি পাশ করলেন, সেটা ১৯২৪ সাল। থাকেন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। তাঁর বাবা গৌরীপুরের রাজা প্রভাতচন্দ্রর নিবিড় যোগ ছিল শিল্প, সংস্কৃতির সঙ্গে। পিয়ানো, এসরাজ, তবলার দক্ষ শিল্পীও ছিলেন শিকারে পটু রাজা প্রভাতচন্দ্র। বাড়িতে গুনী ওস্তাদের আসরও বসত। ফলে, গান-‌বাজনায় শৈশব থেকেই অনুরক্ত ছিলেন প্রমথেশ। কিন্তু প্রেসিডেন্সিতে পড়তে পড়তেই নাটকের বা অভিনয়ের প্রেমে পড়লেন তিনি। এই প্রেমে পড়ার পেছনে ছিলেন বাংলা থিয়েটারের সর্বকালের সেরা এক পরিচালক ও অভিনেতা শিশিরকুমার ভাদুড়ি। ‘‌শ্রীরঙ্গম’‌-‌এ ১১ বার ‘‌ষোড়শী’‌ দেখেছিলেন তিনি, যে নাটকে শিশিরকুমার একাধারে পরিচালক ও জীবানন্দ। শরৎচন্দ্রের লেখারও প্রেমে পড়লেন প্রমথেশ। গৌরীপুরে গিয়ে তৈরি করলেন ইয়ংমেনস অ্যাসোসিয়েশন। নিজের পরিচালনায় মঞ্চস্থ করলেন ‘‌ষোড়শী’‌ এবং নিজে করলেন জীবানন্দ।
সিনেমা করতে যখন শুরু করলেন, তার আগে ফ্রান্সের ফক্স স্টুডিওতে বিখ্যাত ক্যামেরাম্যান মিস্টার রজার্সের কাছে হাতে-‌কলমে সিনেমার চিত্রগ্রহণ নিয়ে শিক্ষা নিয়ে এসেছেন। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার, তখন রবীন্দ্রনাথ ইউরোপে। এবং তিনিই প্রমথেশকে চিঠি লিখে দেন, যার সুবাদে ফক্স স্টুডিও-‌য় যোগাযোগ করাটা সহজ হয়ে যায় প্রমথেশের।
যখন ‘‌দেবদাস’‌ ছবি করার সিদ্ধান্ত নেন প্রমথেশ, ১৯৩৪ সালে, ততদিনে তিনি অভিনেতা, পরিচালক হিসেবে যথেষ্ট পরিচিত। তিনিই প্রথম এখানে রিফ্লেকটর-‌এ কৃত্রিম আলো ফেলে শুটিং করেন। তাঁর পরিচালন-‌ দক্ষতা, তাঁর উদ্ভাবনী ক্ষমতা তখন আলোচনার বিষয়। ততদিনে তাঁর প্রযোজনায় ছবি হয়েছে, তাঁর কাহিনিতে দেবকীকুমার বসু করেছেন ‘‌অপরাধী’‌, তিনি নিজে ১৯৩৩ সালে করেছেন ‘‌রূপলেখা’‌ যেখানে প্রধান চরিত্রে তিনি, সঙ্গে ছিলেন অহীন্দ্র চৌধুরি, যমুনা বড়ুয়া।
১৯৩৪-‌এ তিনি শরৎচন্দ্রের কাছে যান ‘‌দেবদাস’‌ করার অনুমতি চাইতে। প্রমথেশের পরিচয় জানতেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কথা বলে শরৎচন্দ্র খুশি। কিন্তু শরৎচন্দ্রই প্রশ্ন করলেন প্রমথেশকে, ‘‌আমার এত উপন্যাসের মধ্যে থেকে আপনি দেবদাসের মতো কাঁচা লেখাকে বাছলেন কেন?‌’‌ একেবারে নিজের ভেতর থেকে উঠে আসা উচ্চারণে প্রমথেশ বলেছিলেন, আপনার দেবদাসের সঙ্গে যে আমার ভারি মিল।
শরৎচন্দ্রের পক্ষে এরপর আর প্রমথেশকে ‘‌না’ করা সম্ভব হয়নি। তিনি বুঝেছিলেন, এই ছবিতে বোধহয় আত্ম-‌আবিষ্কার করতে চান প্রমথেশ।
প্রমথেশের জন্ম ১৯০৩-‌এর ২৪ অক্টোবর। প্রেসিডেন্সি থেকে বি এস সি পাশ করলেন ১৯২৪-‌এ। তার আগেই বিয়ে ১৯২১-‌এ, মা সরোজবালার পছন্দ করা পাত্রী মাধুরিলতাকে। পরবর্তীকালে স্ত্রী মাধুরিলতা এবং দুই পুত্র অলকেশ ও শ্যামলেশকে ছেড়ে আসামের লক্ষ্মীপুরের জমিদারের মেয়ে অমলাবালা তথা ক্ষিতিকে ভালবেসে বিয়ে করে কলকাতায় সংসার পাতেন প্রমথেশ। এবং সেই থেকে গৌরীপুরের সঙ্গেও সম্পর্ক তুলে দিলেন গৌরীপুরের রাজার কুমার। কিন্তু এই ক্ষিতিই একদিন ছেড়ে চলে যান প্রমথেশকে। এবং ক্ষতবিক্ষত হয়ে যান তিনি।
এবং তখন তিনি সত্যিই দেবদাস। এক ছকভাঙা জীবন। মদ্যপান তো আছেই। যেন এক চন্দ্রমুখীর কাছেই তাঁর নিত্য যাতায়াত শুরু। যেন পার্বতীকে আর তিনি কখনও খুঁজে পাবেন না, এটাই দেবদাস প্রমথেশের নিয়তি।
কিন্তু, পরিচালক, অভিনেতা হিসেবে তিনি এক অন্য ধাতুর মানুষ। সেখানে তিনি বৈদগ্ধে উজ্জ্বল, নিষ্ঠ, খুঁতখুতে এবং আধুনিক।
তৈরি করলেন ‘‌দেবদাস’‌। এ ছবিতে দেবদাস তিনি ছাড়া আর কে?‌ সঙ্গে ‘‌পার্বতী’‌ যমুনা বড়ুয়া, ‘‌চন্দ্রমুখী’ চন্দ্রাবতী দেবী। ‘‌দেবদাস’‌ মুক্তি পেল ১৯৩৫-‌এর ৩০ মার্চ। জনপ্রিয়তায় ইতিহাস সৃষ্টি করল প্রমথেশের ‘‌দেবদাস’‌। ছবি দেখার পর শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, আমার দেবদাসকে আপনি অমর করে দিলেন।
রেডিওতে শ্রুতিনাটকে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল দেবদাস। সেখানেও ‘‌দেবদাস’‌ প্রমথেশ। ‘‌পার্বতী’‌ যমুনা বড়ুয়া। কিন্তু ‘‌দেবদাস’‌ ছবির প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে, উপায় নেই পর্দায় দেবদাস প্রমথেশকে দেখার। ‘‌দেবদাস’‌ নাটকটি পরবর্তীকালে ‘‌সেনোলা রেকর্ড’‌ প্রকাশ করেছিল। সেই রেকর্ড ছিল লেখক সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সংগ্রহে। রবি বসুর লেখা প্রমথেশের জীবনকথা ‘‌রাজার কুমার’‌-‌এর সঙ্গে সেই অডিও রেকর্ড সি ডি আকারে ক্রেতাদের উপহার দিচ্ছে দে’‌জ পাবলিশিং। প্রমথেশ বড়ুয়ার নাতনি রাই বড়ুয়া, রবি বসুর ছেলে অশোক বসু এবং দে’‌জ এর নবীন কর্ণধার অপু তথা শুভঙ্কর‌‌ দে-‌র উদ্যোগে নতুন করে আবার আমাদের কাছে এলেন প্রমথেশ বড়ুয়া। এল দেবদাস। ছবিতে না হোক, শ্রুতিতে তো বটেই।
মাত্র ৪৮ বছর ১ মাস বয়সে কলকাতায় মারা গেলেন বাংলা ছবির এক পুরোধা পুরুষ প্রমথেশ বড়ুয়া। যিনি আজও বাঙালির কাছে ‘‌দেবদাস’‌। সেদিন ছিল ১৯৫১ সালের ২৯ নভেম্বর। এর ঠিক কুড়িদিন পরে রাজার কুমারের চিতাভস্ম নিয়ে একটি মিছিল বের হয় গৌরীপুরে। সামনে ঘোড়সওয়ার বাহিনি। তারপর সারিবদ্ধ হাতির দল। নীরব, শোকস্তব্ধ মিছিল এগিয়ে যায় ব্রহ্মপুত্রের দিকে। সেখানেই বিসর্জিত হল প্রমথেশের চিতাভস্ম।
বহুবছর বাদে, আবার, এভাবেই গৌরীপুরে ফিরে এসেছিলেন প্রমথেশ। কোন প্রমথেশ?‌ গৌরীপুরের রাজার কুমার, নাকি, বাঙালির চিরকালীন দেবদাস?‌ প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা সহজ নয়।

জনপ্রিয়

Back To Top