অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: • একসময়ে ভরতনাট্যমের শিল্পী ছিলেন। আপনার প্রথম আনুষ্ঠানিক মঞ্চ প্রকাশ তথা ‘‌আরেঙ্গাত্রম’‌-‌এ বিশেষ অতিথি ছিলেন সত্যজিৎ রায়। বিরল এবং উজ্জ্বল অভিজ্ঞতা।
•• হ্যাঁ, এই সৌভাগ্যটা হয়েছিল অবশ্যই বাপির (‌সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)‌ জন্যে। আমি গুরু থাঙ্কমণি কুট্টির ছাত্রী ছিলাম। আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে ওই অনুষ্ঠানে দর্শকদের কাছে আমাকে উপস্থাপন করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেটা সত্যিই একটা স্বপ্নের মতো ব্যাপার। তখন আমার ১১ বছর বয়স।
• সেই আকাদেমি মঞ্চে এখন আপনার নির্দেশনায় অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
•• ভাবলে তো খুবই আশ্চর্য লাগে।
• নাচ থেকে নাটকের মঞ্চে আসাটা কি বাবার অনুপ্রেরণায়?‌
•• আমি কিন্তু খুব ছোটবেলা থেকেই স্কুলে নাটক করি। আমাদের মডার্ন হাইস্কুলে সুদর্শনাদি (‌সুদর্শনা বাগচি)‌ আমাদের নাটক করাতেন। শেক্সপীয়র, বার্নার্ড শ-‌এর সিরিয়াস নাটক আমরা করেছি। ডি এল রায়ের ‘‌সাজাহান’‌ করেছি। আমার খুব ভাল লাগত। নাচ শেখার জন্যে যে সুবিধাটা হয়েছিল, আমি বরাবরি স্টেজ ফ্রি হতে পেরেছি।
• কিন্তু থিয়েটারের বড় মঞ্চে আসাটা কীভাবে?‌
•• সেটা উৎপল জেঠুর (‌উৎপল দত্ত)‌ সঙ্গে। তখন পি এল টি তে হচ্ছে ‘‌আজকের সাজাহান’‌। একদিন শোভা জেঠিমা (‌শোভা সেন)‌ আমাদের বাড়িতে ফোন করে বলেন, বিষ্ণুপ্রিয়াদি (‌উৎপল দত্ত ও শোভা সেনের মেয়ে)‌ বাইরে যাচ্ছে। বিষ্ণুপ্রিয়াদির ‘‌রোল’ টা আমাকে করতে হবে। তখন সবেমাত্র আমি টুয়েলভ পাস করেছি। ব্যস, আমি চলে গেলাম। উৎপল জেঠুর পরিচালনায় অভিনয় শুরু হয়ে গেল।
• উৎপল দত্তর কাছে অভিনয় করতে গিয়ে একটুও ভয় করেনি?‌
•• অভিনয় করতে গিয়ে কোনওদিনই আমি ভয় পাইনি। নাচের ট্রেনিংটা তো আমাকে সাহায্য করেছিল। আর, আমাদের বাড়িতে তো নাটকের, অভিনয়ের পরিবেশটাই ছিল স্বাভাবিক। আমার মা (‌দীপা চট্টোপাধ্যায়)‌ ছিলেন ‘‌প্রতিকৃতি’‌র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সেই দলের নাটক বাপি পরিচালনা করে দিত। বাড়িতে রিহার্সাল হত। অভিনেতৃ সঙ্ঘের নাটকের রিহার্সালে বাপি আমাকে ট্যাঁকে করে নিয়ে যেত। ফলে, থিয়েটার বা নাটকের মঞ্চটা আমার কাছে ছোট থেকেই খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিল। জীবনেরই অঙ্গ।
• পরিচালক উৎপল দত্তকে তো সবাই ভয় পেতেন। বকুনিও খেয়েছেন অনেকে। আপনি কখনও বকুনি খাননি?‌
•• ওই নাটকের সেকেন্ড শো-‌তেই আমি একটা গণ্ডগোল করেছিলাম। মঞ্চে আমি উৎপলজেঠুর লাইট গার্ড করে দাঁড়িয়েছিলাম। এটা তো থিয়েটারের মঞ্চে খুব বড় অপরাধ। সেই সিন-‌টা শেষ হলে উইংসের ধারে এসে উৎপলজেঠু আমাকে ভীষণ বকুনি দিয়েছিলেন। তবে, সেটা একটা বিরাট শিক্ষা ছিল। জীবনে ওই ভুল আমি আর করিনি। কখনও মঞ্চে কারও আলো আমি কাটিনি। অন্য অভিনেতার আলো আড়াল করা তো মঞ্চ অভিনয়ের বেসিক একটা ত্রুটি। সেটা দ্বিতীয় শো-‌তেই সংশোধন হয়ে গেল।
• উৎপল দত্তর সঙ্গে আর কোন কোন নাটক করেছেন?‌
•• ‘‌বণিকের মানদণ্ড’‌, ‘‌একলা চলো রে’‌।
• সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম কোন নাটকে মঞ্চে এলেন?‌
•• ‘‌নীলকণ্ঠ’‌। ১৯৮৮তে। রঙমহলে।
• ‘‌পরিচালক’‌ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আপনার ‘‌বাবা’‌ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের থেকে কতটা আলাদা?‌
•• বাপি ছিল সর্বার্থে আমার বন্ধু। কিন্তু পরিচালক হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ভীষণ কড়া। ভীষণ বকত সবাইকে। আমি মাকে এসে বলতাম, বাইরের লোকের সামনেও বাবা ভীষণ বকে। মা বলত, ভাল করলে আর বকবে না।
• মাঝখানে তো বেশ কয়েক বছর আপনাকে মঞ্চে পাওয়া যায়নি।
•• তখন সময়ের অভাব ছিল। ব্যস্ততা ছিল। দুই ছেলেমেয়ে হল। তাদের সময় দিতে হত। তারপর আবার ১৯৯৯ সালে ‘‌নীলকণ্ঠ’‌ দিয়েই আমার সেকেন্ড ইনিংস শুরু। তখন ‘‌আয়ন্দা’‌ গ্রুপ থিয়েটারের ব্যানারে ‘‌নীলকণ্ঠ’‌ হত।
• সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় অনেক নাটক করেছেন। তাঁর সঙ্গে বহুমাত্রিক নানা চরিত্র করেছেন। এমন কি এক অর্থে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকাতেও অভিনয় করেছেন ‘‌তৃতীয় অঙ্ক অতএব’‌ নাটকে।
•• ‘‌তৃতীয় অঙ্ক অতএব’‌ তো বাবার নিজেরই জীবন। এটা সত্যিই একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
• এখন আপনি পরিচালক। সৌমিত্রবাবুই কি অনুপ্রাণিত করলেন পরিচালনায় আসতে?‌
•• বাপি তো সবসময়ের অনুপ্রেরণা। কিন্তু পরিচালনা করব, এমনটা কিন্তু আমি ভাবিনি। বিলু (‌‘‌মুখোমুখি’‌র কর্ণধার‌ বিলু দত্ত)‌ জোর করল। বলল, তোর এত আইডিয়া। এবার তুই পরিচালনা কর। তার আগে আমি নাচ, গান, অভিনয় মিলিয়ে ‘‌কালমৃগয়া’‌ করেছি। কিন্তু বিলুর চাপে থিয়েটারের পরিচালক হলাম। ‘‌ফেরা’‌ দিয়ে।
• ‘‌ফেরা’‌ কেন?‌ এটা তো সৌমিত্রবাবুর পরিচালনায় একসময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। তেমন নাটক কেন বাছলেন, যেখানে বাবা, মেয়ের তুলনা করার চান্স থাকছে?‌
•• আমি যখন কী নাটক করব ভাবছি, তখন ব্রাত্যই (‌ব্রাত্য বসু)‌ প্রথম সাজেস্ট করেছিল ‘‌ফেরা’‌টা করার জন্য। বাপি কীভাবে ‘‌ফেরা’‌টা করেছিল, সেটা আমার ভাল মনেও ছিল না। আমি প্রচুর এডিট করেছি বাপির নাটকটা। যারা দেখেছেন, তাঁরা বলেছেন বাপির প্রোডাকশনের সঙ্গে এই ‘‌ফেরা’‌র কোনও মিল নেই।
• ‘‌ঘটক বিদায়’‌ও তো পরিচালনা করলেন। এটাও তো উনি করেছিলেন।
•• আমি কিন্তু বাপির ‘‌ঘটক বিদায়’ দেখিনি।
• কিন্তু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালিত কোনও নাটক নতুন করে মঞ্চে আনার ক্ষেত্রে কোনও টেনশন থাকে না?‌ একটা চাপ?‌
•• চাপ ভাবলে চাপ। আমি সেটা ভাবি না। আমি নিজের ক্রিয়েটিভিটিতে বিশ্বাস করি। অন্য লোকে কী বলবে, এটা ভাবলে কাজ করাই তো যাবে না।
• এখন নাটকে বাবাকে ডিরেকশন দেওয়ার সুবিধে আর অসুবিধেটা কী?‌
•• বাপির মতো অত বড় একজন অভিনেতাকে আমি পাচ্ছি, এর চেয়ে বড় সুবিধে আর কী আছে?‌ এটাই তো আমার একটা বড় অস্ত্র। যা চাইছি, তার থেকেও বেশি দিচ্ছেন। আর, বাবা বলে অসুবিধে কিছু নেই। (‌হাসতে হাসতে)‌ উনি ডিরেক্টরকে খুব সম্মান দেন। আর, এত পাংচুয়াল যে নতুনরাও লজ্জা পায়।
• একটা অসাধারণ টেলিফিল্ম করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ‘‌মহাসিন্ধুর ওপার থেকে’‌। আপনিও খুব ভাল অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু পর্দায় আপনাকে সেভাবে দেখা গেল না কেন?‌
•• সেভাবে তখন কেউ অফার করেনি। ফলে, আলাদা করে আগ্রহও হয়নি। মঞ্চই আমাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছে।
• বাংলা মঞ্চে এখন দুজন পৌলমী।
•• হ্যাঁ, ও বোধহয় ‘‌ল’‌-‌এ ও-‌কার দেয়। পৌলোমী।
• পৌলোমী বসুর অভিনয় কেমন লাগে আপনার?‌
•• খুব সিনসিয়ার অভিনেত্রী।
• পৌলোমীর কোন অভিনয়টা সবচেয়ে ভাল লেগেছে?‌
•• ব্রাত্যর বিখ্যাত নাটক। ‘‌অশালীন’‌। পূর্বপশ্চিম করেছিল বিপ্লবের (‌বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ নির্দেশনায়। খুব ভাল লেগেছিল পৌলোমীর অভিনয়।
• পরিচালক হিসেবে আপনার নতুন পরিকল্পনা কী?‌
•• ‘‌অন্ধযুগ’‌ করার পরিকল্পনা করেছি। দেবশঙ্কর হালদার, রজত গাঙ্গুলি করবেন। প্রস্তুতি চলছে।
• আপনার নাটকে সৌমিত্রবাবু কি থাকছেন?‌
•• বাপিকে খুব বেশি ‘‌লোড’‌ দেওয়া যাবে না। এখন অনেকটা সুস্থ। আর একটু সময় লাগবে। তবে, ‘‌ফেরা’‌ আমরা ৯৪টা শো করেছি। আর ছ’‌টা শো হলে একশ পূর্ণ করবে ‘‌ফেরা’‌। বাবা এই নাটকে করবেন। আগামী ৪ অক্টোবর দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর দিন ‘‌ফেরা’‌র ৯৫তম শো-‌এ বাবা অভিনয় করবেন।
অনেক শুভেচ্ছা আমাদের পক্ষ থেকে, এমন একটা আনন্দজনক ফেরা-‌র সংবাদের জন্য।‌

জনপ্রিয়

Back To Top