সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ● ‌রাংতার মুকুট। রচনা। পরিচালনা:‌ অসিত বসু। প্রযোজনা:‌ পাইক পাড়া আখর।
‘‌ডন কুইকজোট’‌। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে এসেছে অশান্ত এ শহরে। স্বপ্নের লড়াইয়ে।
মাথায় এবার তার ‘‌রাংতার মুকুট’‌। ওই স্বপ্নের অভিজ্ঞান হিসাবে। শিল্পের শিরোপা হিসাবে।
দুটো নাটক। একটা বাইরের। একটা ভিতরের। ভিতরে থাকা নাটকটার কেন্দ্রবিন্দু হরিপদ কেরানি। যে এই শহরের, এই সময়ের ‘‌ডন কুইকজোট’‌। আদতে একজন ছা–‌পোষা কেরানি। যার চাকরি গিয়েছে। তার ওপর দুর্ঘটনায় মিনিবাসের ধাক্কা খাওয়া। ফল মাথার গণ্ডগোল। এবং নিজেকে মেবারবীর রানা প্রতাপ (‌এ নাটকে ডন কুইকজোট–‌এর প্রতিরূপ)‌ ভাবা। লড়াই ঘোষণা করা রাষ্ট্রশক্তি তথা ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরুদ্ধে। ডনের ছিল বিশ্বস্ত অনুচর সাঙ্কো পাঞ্জা। হরিপদবাবুরও আছে। ছোকরা কবি শিবনাথ। এই টিম রানা প্রতাপে আছে আরও দু’‌জন। শিবনাথের প্রেমিকা শিখা। আর রামধন ধোপার পলাতক গাধা, যার নাম ‘‌চৈতক’‌ (‌রানা প্রতাপের ঘোড়া)‌ দিয়েছে হরিপদ।
এদের বিপক্ষে পাড়ার পুরনো লম্পট, পিতৃতন্ত্র, পুলিস, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধি, হয়ত বা বিচারব্যবস্থাও। অর্থাৎ গোটা ‘‌সিস্টেম’। আর এই সিস্টেমই ভেতরের নাটকে হরিপদ অ্যান্ড কোং–‌এর হাতে প্রবল মার খেয়ে। এ নাটককে টেনে বের করে আনে বাইরে। তৈরি হয় ‘‌ড্রামা আউটসাইড দ্য ড্রামা’‌। যে বাইরের নাটকে ওই নাটকের নাট্যকার অভী রায়কে এই বিপক্ষ–‌পক্ষ‌ আদালতে দায়রাসোপর্দ করে বিপজ্জনক মত প্রচারক বলে। তার বিরুদ্ধে ‘‌সিডিশান’‌ বা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা চালু করা হয়। নাটক শুরু হয় বিচারকের উপস্থিতিতে তথা জেরায় সরগরম কোর্টরুম দিয়ে। এক অদ্ভুত বিচারের মুখোমুখি হতে হল নাট্যকার অভিকে এখানে। যেখানে বিচারকও যেন তাকে শাস্তি দেবার জন্য দায়বদ্ধ। সব সাক্ষ্য, যুক্তি, জেরা, ব্যাখ্যা সব যেন সেই পথে চালিত হচ্ছে। আর শাস্তি মানে চরম শাস্তি। মধ্যযুগীয় ‘‌ইমকুইজিশন’‌–‌এর নিয়ম মেনে মৃত্যুদণ্ড। নাটকের এই কাঠামো। এই লক্ষ্য সব আমাদের বুঝিয়ে দেয় অসিতবাবুর এ নাটকের আসল অনুপ্রেরণা কী। তা হল ডেল ওয়াসেরম্যানের নাটক ‘‌ম্যান অবলা মাঞ্চা’‌ যা ব্রডওয়ের একটি সর্বকালের অন্যতম সেরা সুপারহিট নাটক। ১৯৭২ সালে তা থেকে একই নামে একটি জগদ্বিখ্যাত ছবিও হয় হলিউডে। মুখ্য চরিত্রে ছিলেন পিটার ও টুল ও সোফিয়া লোরেন। যার একটি হুবহু বঙ্গজ চেহারা তৈরি করেন অরুণ মুখোপাধ্যায়। ‘‌দুখীমুখী যোদ্ধা’‌ নামে। যেখান ‘‌ডন কুইকজোট’‌–‌এর মতো একটি বিপজ্জনক লেখা লেখার জন্য ‘‌ইমকিউজিশান’‌–‌এ তোলা হচ্ছে লেখক সেরভান্তেসকে। এখানে যা বদলে গিয়ে হয়েছে অভি রায়। প্রসঙ্গত, এই অভিবাবু চরিত্রটি আবার ছিল অসিতবাবুর বিখ্যাততম নাটক ‘‌কলকাতার হ্যামলেট’‌–‌এর মূল চরিত্র। আর তার সৃষ্টি হরিপদ কেরানি ওরফে রানা প্রতাপ। এ নাটকে সাম্প্রতিক ঘটনা ও রাজনীতির প্রচুর রেফারেন্স খুঁজে পাওয়া যাবে। তা নিশ্চয়ই সাম্প্রতিক সংযোজনক। কারণ এ নাটক অসিতবাবুর পরিচালনায় প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৮১ সালে। ‘‌থিয়েটার ফ্রন্ট’‌–‌এর সে প্রযোজনায় অসিতবাবু নিজে করেছিলেন শিবনাথ। এখন ‘‌পাইক পাড়া আখর–‌এর প্রযোজনায় তিনি হরিপদ কেরানি।
শুরুর নাটকে মঞ্চকে বিচারপতির আসন আর কাঠগড়া— এই দুই কোণের দুই ভাগে ভাগ করে নেওয়ার অভিনয় অঞ্চলকে বিস্তৃত করা গেছে। আসামী ও বিচারপতির ভেতর ছিপের টানের দৃশ্যটি সুপ্রযুক্ত। কেঁপে উঠতে হয় ভয়ে ও আবেগে শেষ ফাঁসির দৃশ্যটিতেও। তবে এ নাটকে প্রধান সম্পদ অসিতবসুর অভিনয়। তা কী ‘‌ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’‌ বলায়, কী ঘোড়ার পিঠে চড়ার শারীরিক সক্ষমতায়। তার ছেড়ে যাওয়া শিবনাথ চরিত্রের জুতো নিজের পায়ে দারুণভাবেই গলিয়েছেন তথাগত চৌধুরীও। বিচারপতির চরিত্রে রুদ্রতেজ সেনগুপ্ত যথারীতি দাপুটে।

জনপ্রিয়

Back To Top