অদিতি রায় ও সঙ্কর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: রবীন্দ্রনাথ আমাকে পথ দেখান
শ্রীকান্ত আচার্য
জীবনের মূল্যবোধ, জীবনকে ভালবাসতে শেখা, নান্দনিকতার সঙ্গে পরিচয়, জীবন-‌দর্শন, সৃষ্টিশীল হওয়া, সবই তো ওই মানুষের দৌলতে, তিনি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর মতো প্রাসঙ্গিক আমাদের জীবনে আর কে আছেন?‌ তিনি শিখিয়ে চলেছেন, আর প্রতি মুহূর্তে আমরা শিখছি। তাও তো দেখি সব কেমন ভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে!‌ এই ধ্বংসলীলায় ওঁকে আরও বেশি করে প্রয়োজন। ওঁকে নিয়ে ‘দেখানেপনা‌’‌র বাড়াবাড়িটা যে একটু বেশিই। রবীন্দ্রনাথের গান বুঝতে হলে তাঁর সাহিত্যকে বুঝতে হবে, তাঁর সাহিত্য বুঝতে হলে বাংলা ভাষাকে জানতে হবে। এই ভাষাটা আজ খুব অবহেলিত। কাজেই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যতই তোলপাড় হোক, তাঁকে বোঝাটা অসম্পূর্ণই থেকে যাচ্ছে!‌  অনেকটা তাঁর ভাষাতেই বলি, ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি‌’‌। রবীন্দ্রনাথকেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যে লড়তে হয়েছে। আমাদের সেই বুকের পাটা নেই, তাই চুপ করে সহ্য করে যাওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই যে উত্তরণ হয়। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে পরীক্ষা-‌নিরীক্ষা হচ্ছে, তা নিয়ে নানা মত তৈরি হচ্ছে। কিন্তু খেয়াল করার বিষয়, অতুলপ্রসাদ বা নজরুলের গান নিয়ে তো হচ্ছে না!‌ আসলে রবীন্দ্রনাথ এতটা প্রাসঙ্গিক, এতটাই সময়ের চেয়ে এগিয়ে। ওঁকে এড়িয়ে কিছু ভাবার ক্ষমতাই আমাদের নেই। অথবা একটা দল ভাবছে, এই লোকটাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করলে বাজারে খাবে ভাল!‌ রবীন্দ্রনাথ নিজেও জীবনভর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, তিনি কখনই বলেননি, আমি যা করে গেলাম সেটাই শেষ কথা। একটা মত আঁকড়ে ধরে থাকেননি। কোনও ফর্মকেই তিনি ‘অ্যাবসোলিউট ফর্ম‌’‌ বলেননি। কিন্তু আমি যদি সত্যিই রবীন্দ্রনাথের গান উপলব্ধি করে থাকি, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা থাকে, তাঁর দর্শনে আস্থা থাকে, তাহলে এক্সপেরিমেন্টের নামে তাঁর সৃষ্টি থেকে বিচ্যুত হবনা। কিন্তু শিল্পীদের নিজস্ব অনুভূতি দ্বারা চালিত নিজস্ব ইন্টারপ্রিটেশন তো থাকবেই। দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবিনয় রায় একই গান তো আর একইরকম করে ইন্টারপ্রেট করবেন না, তাই তাঁদের গায়কিও ভিন্ন হবে একটুও চ্যুত না হয়েই। রবীন্দ্রনাথ আমার দিশারী, আমার পথপ্রদর্শক। আমার কোনও স্খলন হলে উনিই আমাকে পথ দেখান। ওঁর সৃষ্টির মধ্যেই আমি জীবনের দিশা খুঁজে পাই। উনি আমার অভিভাবক। 

আমার যাপনে জড়িয়ে
রবীন্দ্রনাথের গান
সাহানা বাজপেয়ী
রবীন্দ্রনাথের গান আমার যাপনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। আমার বাবা নিবেদিতপ্রাণ শ্রোতা ছিলেন ও আপনমনে বেহালা বাজিয়ে উদাত্তস্বরে গাইতেন - আমার রবীন্দ্রনাথের গান শোনার প্রথম স্মৃতি এইটাই। শান্তিনিকেতন পাঠভবনে বেড়ে ওঠার কল্যাণে এই গান অজান্তে প্রাণের মধ্যে প্রবেশ করে খুব সুসংহত একটা শিকড় গেড়ে দেয়। আমরা সকলেই সুরে হোক বেসুরে হোক মহানন্দে গান গাইতাম। গানের শিক্ষা পাঠভবনে একটি আবশ্যিক বিষয় ছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ইস্কুলের ছাত্রছাত্রীদের গান গাইবার উৎসাহ জোগানোর তাগিদে বছরভর বিভিন্ন ধরণের উপলক্ষ্যের সৃষ্টি করেছিলেন এবং এইসব উৎসব অনুষ্ঠানে গানই ছিল প্রধান অঙ্গ। সেই ধারায় আমরাও নিমজ্জিত ছিলাম। ফলে এই গানের প্রাসঙ্গিকতা আমাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে এসেছিল। ফলস্বরূপ, প্রতিনিয়ত রবীন্দ্রনাথের গানকে দিয়েই জীবনকে দেখি বলা যায়। সুখে, দুঃখে, বাধা-বিঘ্নে, বসন্তে-বর্ষায়। একটি বিশেষ শ্রেণীর বাঙালির সার্বিক জাতিগত পরিচয়ে রবীন্দ্রনাথের গান অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। 
দেবদত্ত ফিল্মস রবীন্দ্রনাথের ‘‌গোরা’‌ উপন্যাসের চিত্ররূপ করেছিলেন ১৯৩৮ সালে সম্ভবতঃ, সংগীত পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তখন বিশ্বভারতীর সংগীত বিভাগীয় বোর্ড থেকে রেকর্ড বা ফিল্মের গানের জন্যে অনুমোদন নিতে হতো কিন্তু কবি নজরুল সেই অনুমতি না নিয়েই গানগুলি তৈরী করেন। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার দুতিনদিন আগে ট্রেড শো'র দিন বিশ্বভারতীর পর্যবেক্ষক এসে কবি নজরুলের গাওয়ানো গানগুলির ভুল ধরলেন ও ছবির মুক্তি বন্ধ করলেন। কবি নজরুল সঙ্গে সঙ্গে ছবিটির একটি কপি ও একটি ছোট প্রজেক্টর নিয়ে শান্তিনিকেতনে যান ও রবীন্দ্রনাথের সই আদায় করেন অনুমোদন পত্রে। এই গল্পটা মনে পড়লো কারণ, কবি নজরুলের ফিল্মে রবীন্দ্রসংগীত পরিচালনা রবীন্দ্রনাথকে আশ্বস্ত করেছিল। নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের যথার্থ মনে হয়েছিল গানগুলির নিবেদন, কারণ উনি নিজেই ওঁর গান নিয়ে শঙ্কিত থাকতেন খুব। ফলে, রবীন্দ্রনাথের গান যথার্থ ভাবে ছবিতে ব্যবহৃত হলে মন্দ কী? আর আজকের দিনে ছবির গান ছাড়া অন্য গান মানুষের কাছে পৌঁছোয়না খুব একটা। ফিল্মে ব্যবহৃত হলে অনেক বেশি মানুষ গানটি শোনেন, দেখেন। 
রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপি আছে কিন্তু তাতে গানের লয়, গায়কি কী হবে তার নিৰ্দেশ নেই, গানের যন্ত্রাণুষঙ্গেরও নির্দেশ নেই। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, বকলমে রবীন্দ্রনাথ গায়ক ও বাদকদের এইখানেই শৈল্পিক স্বাধীনতা দিয়েছেন। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সাহানা দেবীকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘‌গায়ক তো আর গ্রামোফোন নয়।’‌  কবি নিজেই বলেছেন, ‘‌আমার গানের উন্নতিসাধনের চেষ্টা করে গায়করা যাতে তাদের প্রতিভার অবক্ষয় না করে’‌...। কারণ গানগুলি স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু তা বলে শিল্পীদের নিজেদের ইন্টারপ্রিটেশন থাকবে না, সেটা কাম্য নয়। রবীন্দ্রনাথের গান আমাকে সত্যকে সহজে নিতে শিখিয়েছে, দুঃখকে সহ্য করার শক্তি জুগিয়েছে, অহংকে মাথায় তুলে নেচে বেড়ানো বন্ধ করেছে, আর শিখিয়েছে সব কিছুর ওপরে মানবতাবাদ। রবীন্দ্রনাথ আমার খুবই কাছের কেউ একটা হন। কিন্তু সেই সম্পর্কের নাম খুঁজে পাইনা। 
রবীন্দ্রনাথের গান
সব থেকে আধুনিক
শ্রীজাত
কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন, অক্সিজেন আপনার জীবনে কী কাজ করে, বা জল আপনার জীবনে কী কাজ করে, সেটা বলা যেমন কঠিন, তেমনই রবীন্দ্রনাথ আমার জীবনে কী, বলাটা বড্ড কঠিন!‌ এটা বোধহয় সবার ক্ষেত্রেই সত্যি। প্রথমে শুনলে একটু বেশি কাতরতা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তা বোধহয় নয়, কারণ একটা মানুষ যখন এত বিস্তৃত হন, তখন তাঁকে কোনও না কোনও ভাবে প্রত্যেকদিন ছুঁতেই হয়। তাঁকে এড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। সে তাঁর গান হোক, কবিতা হোক, নাটক হোক বা প্রবন্ধ। বা নিছক তাঁর ভাবনাই হোক। তিনিই তো আমাদের ভাবতে শিখিয়েছেন, আমাদের ভাবনা তো তাঁর ভাষা, তাঁর চিন্তার ওপর ভিত্তি করেই। কেউ যদি দিনের শেষে আমার কাছে হিসেব চান, ক’‌লিটার জল খেয়েছি, সেটা তো বলতে পারব না। তেমনই কেউ যদি জানতে চান, আজ আমাকে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে আগলালেন, সেটাও বলতে পারব না। আমি জানি সারাদিন তিনি কোথাও না কোথাও আমাকে ছুঁয়ে রেখেছিলেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটা প্রবাহে তাঁর সংস্পর্শ আমরা জিনের ভেতর নিয়েই জন্মাই। ওঁর গানে আমি ওঁকে সবথেকে কাছে অনুভব করি। একসঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে ওঁর গান যখন গলা ছেড়ে গাই, তখন মনে হয় রবীন্দ্রনাথের গানের থেকে আধুনিক গান আর হয়না। আমি জানিনা কেন রবীন্দ্রসঙ্গীত আলাদা, আর আধুনিক বাংলা গান আলাদা। তার কারণ হয়ত এই, যে, রবীন্দ্রনাথের গানকে আধুনিক বললে বাকি সব গান পুরাতনী হয়ে যাবে!‌ আমার মনে হয়, কথা ও সুরের জায়গায় রবীন্দ্রনাথের থেকে বেশি আধুনিক কেউ এখনও পর্যন্ত আসেননি বাংলা গানে। ওঁর গান ছাড়া এমনিই আমার দিন কাটেনা। প্রথমবার সুমনদার কণ্ঠে ‘আজি যে রজনী যায়‌’‌ শুনেছিলাম পিয়ানোর সঙ্গে। অপূর্ব লেগেছিল। বাংলা চলচ্চিত্রেও তো তিনি অপরিহার্য!‌ তাতে আমরা যারা গীতিকার তাদের সমস্যা হয়ে গেছে!‌ রীনাদি (‌অপর্ণা সেন)‌ বা সৃজিতের ছবির টাইটেল ট্র‌্যাকে যখন দেখি ‘গীতরচনা :‌ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীজাত‌’‌ তখন খুব খারাপ লাগে!‌ পরিচালকরা প্রথমে বলেন, তোমার চারটে গান থাকবে। তারপর বলেন, একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত থাকবে। তখন আমি স্পষ্ট দেখতে পাই আমার চারটে গান পুরো বিফলে গেল!‌ এটা সত্যিই খুব সংকোচের। কারণ নিজে কী পারি, কী পারিনা, এটা তো বুঝতে শিখেছি। নিজের দৈন্য ওঁর লেখার পাশে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই তো সেদিন জয় (সরকার‌)‌ বলল, একটা ছবির দুটো গান তুমি লিখবে, আমি সুর করব, বাকি দুটো গান রবীন্দ্রনাথ লিখে, সুর করে গেছেন। কাজেই এই বিপদ মাথায় নিয়েই কাজ করে যেতে হবে!‌

রবীন্দ্র-‌দর্শনে বিশ্বাসী আমি
শ্রাবণী সেন
রবীন্দ্রনাথ আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। সুখে-‌দুঃখে সবসময়ই ওঁকে পাশে পেয়েছি। বিশেষ কিছু দুঃখ তো আমাদের রয়েই যায়, কারণ আমরা যারা শিল্পী তারা একটু দুঃখ-‌বিলাসী, অন্তত আমি তো বটেই। এই শোক বা দুঃখ থেকে উত্তরণের পথ রবীন্দ্রনাথই বাৎলে দেন। তাঁর গান, কবিতা, যে কোনও সৃষ্টি আজও সমান প্রাসঙ্গিক, ভীষণ সময়োপযোগী। মনে হয়, কী করে আমার মনের কথা আগেই বলে দিয়েছেন উনি!‌ এই প্রজন্মও কিন্তু কম-‌বেশি টের পায় ওঁর প্রাসঙ্গিকতা। আমার জীবন যাপনেই তো রবীন্দ্রনাথ। ৩০ বছর ধরে আমি ওঁর গানে নিমজ্জিত। রোজ নতুন ভাবে আবিষ্কার করি ওঁকে। আমি দারুণ উপভোগ করি ওঁর সৃষ্টি। আজও রেডিও-‌তে রবীন্দ্রসঙ্গীতের জনপ্রিয়তা সব থেকে বেশি। আজও উনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কারণ ওঁর গানের কথা সবাই না বুঝলেও, ওঁর সুর সবার হৃদয়ের নরমটাকে ছুঁয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে পরীক্ষা-‌নিরীক্ষা আমিও এককালে বহু করেছি। কিন্তু পরিমিতি বোধ থাকাটা জরুরি। গানকে ছাপিয়ে যেন না যায় এক্সপেরিমেন্টের শোরগোল। সিনেমা বা ধারাবাহিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার একদিক থেকে ভাল, কারণ প্রসার বাড়ে। কিন্তু বিশেষত ধারাবাহিকে যখন ভুল সুর বা ভুল কথায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া হয়, তখন মনে হয় একটা গাইডলাইন থাকলে বোধহয় ভাল হত। যে যাই হোক, আমি তো রবীন্দ্র-‌দর্শনে বিশ্বাসী। আমি যখন তখন গেয়ে উঠতে পারি ‘শুধু যাওয়া আসা/‌ শুধু স্রোতে ভাসা‌’‌।

রবীন্দ্রনাথ
আমার সোলমেট
ইমন চক্রবর্তী

রবীন্দ্রনাথের গান শুধু যে গাই, তা নয়। বিশ্বাস করি, যাপন করি। খুব খারাপ সময়, ঘুরে দাঁড়ানোর জায়গা নেই, সেইসময় আমাকে বাঁচান রবীন্দ্রনাথ। তাঁর গানে, কবিতায়, আঁকায়, প্রবন্ধে, তাঁর দর্শনে আমি বাঁচার রাস্তা খুঁজে পাই। ঈশ্বর আছেন কি নেই, সেটা তো আপেক্ষিক। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ঐশ্বরিক অস্তিত্ব আপামর বাঙালির দৈনন্দিনে জড়িয়ে। এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। এই প্রজন্মের বহু ছেলেমেয়েকে দেখেছি রবীন্দ্রনাথের গান যত্নভরে শিখছে। তিনি যুগে যুগে প্রবাহমান। সিনেমায় রবীন্দ্রনাথের গান যেভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই। আমিও বহু ছবিতে গেয়েছি। ‘জ্যেষ্ঠপুত্র‌’‌-‌তে আমার গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত চমৎকার ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানের ইন্টারপ্রিটেশন বদলে দেওয়াকে আমি সমর্থন করিনা। রবীন্দ্রনাথ আমার ‘সোলমেট‌’‌, আমার অন্তরাত্মা। কিছু সম্পর্ক থাকেনা, যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না, ওঁর সঙ্গে আমার তেমনই। আমি যখন তখন গেয়ে উঠতে পারি ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি‌’‌, ‘আরও আঘাত সইবে আমার, সইবে আমারও‌’‌ বা ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে‌’‌। ওঁকে আমার প্রত্যেক মুহূর্তে প্রয়োজন।‌‌

রবীন্দ্রনাথ
আমার ডাক্তার
স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

আমি যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘর করি, তার পরিচয় আমার কাজেই। ওঁর গান আমি শুধু গলায় ধারণ করেছি তা নয়, আমার মস্তিষ্কে, আমার আঙুলে ধারণ করেছি। আমার শিরা-‌ধমণীতে প্রবাহিত রবীন্দ্রনাথ। আমি কথা বলতে গেলেও আমার জিভে রবীন্দ্রনাথই আগে আসেন। আমার সংলাপে উনি বাসা বেঁধে আছেন। রবীন্দ্রনাথ আমার অন্ন, আমার বস্ত্র, আমার আশ্রয়। রবীন্দ্রনাথ আমার সবথেকে কাছের বন্ধু, যাঁর সঙ্গে প্রত্যেকটা মুহূর্ত শেয়ার করে চলেছি। রবীন্দ্রনাথ আমার ডাক্তার। ওঁর প্রত্যেকটা গান আমার কাছে প্রেসক্রিপশন, গীতবিতান আমার মেটিরিয়া মেডিকা। কখনও কোনও প্রেসক্রিপশনে বলছেন ‘‌আমি বহু বাসনায়/‌ প্রাণপণে চাই/‌ বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে’,‌ আবার কখনও প্রেসক্রিপশনে লেখা ‘‌এখনও ঘোর ভাঙে না তোর যে’‌!‌ শিকল আমায় বিকল করবে না, নাকি, মারের সাগর পাড়ি দেব, সব লেখা আছে ওই প্রেসক্রিপশনে। আমার জীবনের যে কোনও ঝড় গীতবিতান বুকে নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি। কাজেই আমি তো ছাড়িনা তাঁকে, তিনিও আমাকে ছাড়েন না।

‌নবীন প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথের গান শুনছে
অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমার মনে হয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সবসময় প্রাসঙ্গিক। কতখানি প্রাসঙ্গিক তা বুঝতে পারা নির্ভর করে শ্রোতাদের বোধের ওপর। কার বোধ কতটা জাগ্রত। বোধ যদি জাগ্রতর জায়গায় থেকে, সেটাকে নেওয়ার মতো শিক্ষা যদি থাকে, তবে দেখা যাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে কোনওদিন আমরা ভুলতে পারব না। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় অধ্যাপনা বা আকাশবাণীর সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে নবীন প্রজন্মকে প্রচণ্ডভাবে দেখার সুযোগ পেয়েছি। দেখেছি আজ থেকে ১৫ বছর আগে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখার ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে স্টিফনেস ছিল তা কিন্তু অনেকটাই ভেঙেছে। তবে স্টিফনেস ভাঙার অর্থ এই নয় যে, তারা সঠিকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখছে বা গানের ভাব বুঝে নিজের মতো করে গাইছে। গান শোনাতে পারলে কিন্তু লোকে শোনে। আমি নিজে নবীন প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনাতে গিয়ে দেখেছি আমার কোনও সমস্যা হয় না। নবীন প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথের গান শুনছে। মাঝে মাঝে তাঁদের মধ্যে থেকে এমন গানের অনুরোধ আসে যে অবাক হয়ে যেতে হয়। হয়তো সেই গানটা খুবই কম শোনা গেছে। আর দেখেছি তুলনায় মফস্‌সলের ছেলেমেয়েরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখতে বেশি আসছেন। ত্রিপুরা বা বাংলাদেশ থেকেও আসছেন। তুলনায় কলকাতার ছেলেমেয়ের সংখ্যা কিন্তু কম। আমাদের সেই জায়গাটা ধরতে হবে।

‌ভারতের সেরা আন্তর্জাতিক সুরকারের নাম রবীন্দ্রনাথ
প্রবুদ্ধ রাহা
আমার মনে হয় রবীন্দ্রসঙ্গীতকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে হলে একটা বয়সে পৌঁছনো দরকার। একটা ২০ বছরের ছেলে বা মেয়ে যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছেন তখন যতখানি ভাল লাগে, সেই ছেলে বা মেয়েটি যখন ৪০ বছরে সেই গান গাইছে তখন কিন্তু তাঁর গলায় রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে আরও বেশি ভাল লাগে। কারণ, রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি তাঁর ভাল লাগাটা তখন শুরু হয়েছে। এটা কিন্তু আমি নিজের ছেলেকে দিয়েই বুঝেছি। ও যখন ডনবসকোতে পড়ত তখন ব্যান্ডার গান ছানা কিছু শুনতো না। আমি কিন্তু একবারের জন্যেও বারণ করিনি। কারণ, আমি জানতাম, সময় হলে ও নিজেই বিচার করতে পারবে ব্যান্ডের গানে কী ধরনের এলিমেন্ট আছে আর রবীন্দ্রসঙ্গীত বা রাগসঙ্গীতে কী এলিমেন্ট আছে। আসলে এই সময়টা দেওয়া জরুরি। রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর মৃত্যুর ১৬০ বছর পরেও তাই সমান জনপ্রিয়। আর সেই জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। আমি মনে করি ভারতবর্ষের সেরা ইন্টারন্যাশনাল কম্পোজারের নাম রবীন্দ্রনাথ। তাঁর গান শেখার জন্য সারা পৃথিবীতে যত স্কুল আছে তা আর কারও গান শেখার জন্যে নেই। দেবব্রত বিশ্বাস বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। ঝকঝকে স্মার্ট উচ্চারণ রবীন্দ্রনাথের গানকে প্রথম পপুলারিটি দিল। আসলে রবীন্দ্রগানের প্রথম শর্ত তাঁর গানের বাণী ১০০ ভাগ লোকের মধ্য পৌঁছে দেওয়া। এখন রবীন্দ্রসঙ্গীত বিকৃত করার একটা ট্রেন্ড এসেছে। সাধারণ মানুষ রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বিকৃত করলে কিছু যায় আসে না। কিন্তু যাঁরা নমস্য গায়ক, তাঁরা যখন রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বিকৃত করেন, তখন সেটা বিপদজনক হয়ে ওঠে। আসলে লোকে তখন ভাবে উনি যখন এইভাবে গাইছেন তখন আমিও গাই। সেইভাবে কিছু সিডি বিক্রি হল। আর কোম্পানিও ভাবল আমার তো শুধু সিডি বিক্রি নিয়ে কথা। অনেকে মনে করবেন আমি হয়তো এক্সপেরিমেন্ট বিরোধী। কিন্তু তা নয়। সেই এক্লপেরিমেন্টটা সঠিক পথে করতে হবে। যেমন আমি ২০১০-‌এ এরকম একটা এক্সপেরিমেন্ট নিয়েই ‘‌মন’‌ বলে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম করেছিলাম, যেটা কিন্তু এখনও লোকে শোনে।

‌রবীন্দ্রসঙ্গীতের কোনও বিপদ নেই
অলক রায়চৌধুরি

রবীন্দ্রনাথের গানের এখন যে অবস্থা তা অনেকটা জলাশয়ের মতো। একটা পরিস্কার পুকুর তাতে কেউ বাসন মাজছে, কেউ স্নান করছে, কেউ উপবীত ধারণ করে পুজো করছে আবার কেউ শ্রাদ্ধের পিণ্ড ঢালছে। খোলা ময়দান, বাধা দেওয়ার কেউ নেই। এর মধ্যে ২০ ভাগ মানুষ, যাঁরা পুকুরটাকে পরিস্কার রাখতে আগ্রহী, তাঁরাই ভাল কাজ করছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেই তাঁর গান নিয়ে যা পরীক্ষা নীরিক্ষা তা হয়ে গেছে। যাঁরা করেছেন তাঁরা সবাই বিখ্যাত মানুষ। জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী রবীন্দ্রসঙ্গীত অন্যরকমভাবে গাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি পঙ্কজকুমার মল্লিকের গানেও রবীন্দ্রনাথ খুশি ছিলেন না। তাঁরা দুজনেই সিদ্ধ গায়ক। হয়তো কাজটাও ঠিকঠাক করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানে তিনিই সব। তিনিই গীতিকার, তিনিই সুরকার, তিনিই সংগঠক। এমনই একটা জমাট বাঁধা ইমারত রবীন্দ্রসঙ্গীত। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখন কিছু মানুষ মনে করছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত আর যুগোপযোগী নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথই তো লিখে গেছেন ‘‌রবার যেটা সেটাই রবে’‌। আমার অভিজ্ঞতা বলে যাঁরা শুদ্ধভাবে রবীন্দ্রনাথের গান গান তাঁদের পাল্লাটাই ভারী। কাজেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের কোনও বিপদ নেই।

‌রবীন্দ্রসঙ্গীতের চেয়ে আধুনিক আর কোনও গান নেই
মনোময় ভট্টাচার্য
রবীন্দ্রসঙ্গীত শুধু প্রাসঙ্গিক ছিল না, যত দিন যাচ্ছে তত বেশি প্রাসঙ্গিক হয় উঠছে। আসলে রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের জীবনধারণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের গানের থেকে বেশি আধুনিক আর কোনও গান নেই। যখন গান গাই, তখন মনে হয় রবীন্দ্রনাথের গানই আমার একমাত্র আশ্রয়। এই গান তাঁদেরই ভাল লাগে যাঁদের একটা মেধা আছে। তিনি নবীন প্রজন্মেরও হতে পারেন আবার বয়স্কও হতে পারেন। আর সেই মেধাটা আসে কিন্তু জীবনবোধ থেকে। যাঁর জীবনবোধ যত গভীর, রবীন্দ্রনাথের গান তাঁদের তত বেশি প্রিয়। তবে এখন যেমন রবীন্দ্রসঙ্গীতের কেউ রিমিক্স করছেন সেটা আমার পছন্দ নয়। কারণ, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানকে যে সুর, যে কথা, যে ছন্দে বেঁধে গেছেন সেখানে কাটাছেঁড়ার কোনও জায়গা নেই। যন্ত্রানুসঙ্গে অবশ্য নতুনত্ব আসতেই পারে। তাতে হয়ত গানের ফ্লেবারে একটা নতুনত্ব আসে। একটা অন্যরকম ভাললাগা তৈরি হয়। কিন্তু কখনোই সেটা নোটেশনকে বিকৃত করে নয়। রবীন্দ্রনাথের গান আমরা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে শুনে আসছি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সেই গানই আমাদের বেশি ভাল লাগে যেই গানগুলো বেশি শুনেছি। যেগুলো স্বল্পশ্রুত গান, সেই গানের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কিন্তু কম। আমাদের আগের প্রজন্ম, তার আগের প্রজন্ম বা তার পরের প্রজন্মের কাছে যে গানগুলো শুনে এসেছি সেগুলোই আমাদের কাছে বেশি গৃহীত। ফলে স্বল্পশ্রুত গানগুলোকে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে সময় লাগবে। তাই আরও বেশি করে এই গানগুলোকে শ্রোতাদের কাছে বারবার পৌঁছে দেওয়া জরুরি। সেই লক্ষ্য নিয়েই এখন কাজ করছি আমি।

জনপ্রিয়

Back To Top