বিক্রম ঘোষ, অনুলিখনে সংযুক্তা বসু: সঙ্গীতের সেরা বাসা রসনায়
রবিশঙ্কর মানে সারা বিশ্বের কাছে ভারতীয় সংস্কৃতির দিগন্ত খুলে যাওয়া। সারা পৃথিবীর সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়ার একটা আশ্চর্য সহজ উপায় বলেছিলেন আমার গুরুজি পণ্ডিত রবিশঙ্করের। সে গল্পটা না বললেই নয়।
আমি জাপানি খাবার ওই কাঁচা মাছটাছ, স্কুইড, অক্টোপাস— এ সব একেবারেই খেতে পারতাম না। ৮৯ সালে একবার জাপানে সাতদিনের জন্য একটা অনুষ্ঠানে গিয়ে কাঁচা মাছটাছ কিছুই খেতে পারিনি। প্রায় না খেয়েই ছিলাম। ১৯৯৫ সালে জাপান গেলাম গুরুজির সঙ্গে একটা কনসার্টে বাজাতে। প্রায় রাতেই বিভিন্ন সঙ্গীতরসিক মহল থেকে ডিনারের নিমন্ত্রণ থাকত। আমি যথারীতি সেই কাঁচা মাছের বিভিন্ন পদ দেখে ইতস্তত করছিলাম। তখন গুরুজি বললেন, ‘‌দ্যাখো বিক্রম, অনেক বছর তো কেবল বাঙালি ছেলে হয়ে কাটালে, যদি বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠতে চাও তো সারা পৃথিবীর সমস্ত রকম সংস্কৃতিকে গ্রহণ করো। সংস্কৃতির মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়াটাও একটা আর্টের স্তরে পড়ে। সব দেশের সব রকম খাবারের স্বাদ নাও। তুমি যত বিশ্বের নানা দেশের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করবে তত দ্রুত তোমার বাদ্য পৃথিবীর দরবারে পৌঁছবে। মিলে মিশে যাবে অন্য দেশের সুর তাল লয়ের সঙ্গে।
গুরুজির এই কথা আমার মনে মন্ত্রের মতো কাজ করছিল। ওঁর সান্নিধ্যে এসেই আমি বিশ্বের দরবারে কোলাবরেট করার, নিজেকে মেলে ধরার এতটা অনুপ্রেরণা পেয়েছি। বিশ্বের সংস্কৃতির সঙ্গে আমার তালবাদ্যর যোগাযোগ স্থাপনের ইতিহাস পণ্ডিত রবিশঙ্করের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে।
রবিরাগের আলোয়
আমার বাবা পণ্ডিত শংকর ঘোষ গুরুজির সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এক সময় সঙ্গত করেছেন। কিন্তু তখন ওঁর সঙ্গে আমার খুব একটা আলাপ ছিল না। গুরুজির সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে প্রথম দেখা হয় ১৯৯৩ সালে ব্রাসেলস শহরে একটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে। উনি আমার অনুষ্ঠান শুনে প্রশংসা করে বললেন, ‘‌এত ভাল বাজাও, তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গত করবে কালকে?‌’‌ মানুষের জীবনে এমন এক একটা ঘটনা ঘটে যায়, যা ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছু নয় বলেই মনে হয়। পরদিন ব্রাসেলস শহরে ওঁর সঙ্গে বাজালাম। এবং আমার সঙ্গত গুরুজিসহ তাবড় উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে প্রশংসিত হল। ব্রাসেলসের সেই সন্ধ্যার পারফরম্যান্সের কথা ভাবলে আজও আমার মনে উৎকণ্ঠা, রোমাঞ্চ আর বুক দুরুদুরু ভীতি কাজ করে। গায়ে কাঁটা দেয়। ভক্তিতে মাথা নত হয়। তারপর জীবনটাই যেন অন্য লয়ে বয়ে গেল। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত টানা গুরুজির সঙ্গে বাজিয়েছি। এই ১১টা বছরে কত যে অনুষ্ঠান করেছি ওঁর সঙ্গে তার হিসেব দেওয়া কঠিন। এগারোটা বছরে প্রায় হাজারখানেক অনুষ্ঠান তো করেইছি।
গুরুজির সঙ্গে প্রতিটা কনসার্টের প্রস্তুতি ও উপস্থাপনা দুটোই ছিল একটা শিক্ষা যে নিজেকে দীক্ষিত করব।
আমি একজন তাল শিল্পী। সেই হিসেবে বলি তবলা শিল্পীদের ফোর ফ্রন্টে আনা বা শ্রোতাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া উনিই শুরু করেছেন। গুরুজি যে কোনও জলসাতেই নিজে বাজাতে বাজাতে একটা সময়ের পর সেতার রাখতেন নামিয়ে। তখন শুরু হত তবলাবাদকের সোলো পারফরম্যান্স। এই ধারার প্রচলনের সর্বাঙ্গীন কৃতিত্ব প্রাথমিকভাবে পণ্ডিত রবিশঙ্করের। এটা অনিবার্য সত্য।
নিত্য রবির যে ফুল ফোটে
পণ্ডিত রবিশঙ্কর নিত্যকারের সুরের পূজারি। নিয়মিত রেওয়াজ। শীতগ্রীষ্ম বারো মাস স্নান সেরে পুজো ও ধ্যান করে বাজাতে বসতেন। খুব ডিসিপ্লিনড জীবন। কোথাও অন্য কোনও শহরে, দেশে অনুষ্ঠান করতে গেলেই হোক বা বাড়িতে থাকলে নিয়ম করে পঁয়তাল্লিশ মিনিট হাঁটতেন। কখনও কখনও হোটেলের লবি বা করিডরেও হাঁটতে দেখেছি। অবসর পেলে বই পড়া ছিল গুরুজির খুব প্রিয় শখ। বিভিন্ন দেশের থ্রিলার থেকে কমেডি থেকে নাটক সবই পড়তেন। নানা বিষয় নিয়ে বই যেমন পড়তেন স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ.‌.‌.‌ এবং আরো দশ বারোটা ভাষায় অনর্গল কথা বলা উনি রপ্ত করেন। আর মজার ব্যাপার হল দেশ বিদেশের খবর রাখতেন প্রচুর। কে কোথায় কেমন ছবি বানাচ্ছেন, কে কোথায় কেমন খেলছেন কোন খেলা, কে কেমন গাইছেন, বাজাচ্ছেন, অভিনয় করছেন সব খবর। গুরুজির সঙ্গে গল্প করার মজাই ছিল আলাদা। অসম্ভব মজলিশী মানুষ। এত রকম ইনফরমেশন আর নলেজ ছিল যে যেগুলো শেয়ার করতে ভালবাসতেন। কখনও বাড়িতে খাবার টেবিলে বসে, কখনও এয়ারপোর্টে ফ্লাইটের অপেক্ষা করতে করতে আড্ডা জমিয়ে তোলা গুরুজির জুড়ি মেলা ভার। পণ্ডিত রবিশঙ্কর যে কোনও অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে ছিলেন নির্ভেজাল শো ম্যান। পণ্ডিত রবিশঙ্করের কনসার্ট মানে শুরু থেকে শেষ রেশটুকু পর্যন্ত একটা দৃশ্যশ্রাব্য শিল্প হয়ে উঠত এভাবেই।
সুরের আগুন লাগিয়ে দিলেন সবখানে
গুরুজির, সেতার বা সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় এক্স ফ্যাক্টর ছিল, ভারতীয় রাগসঙ্গীতের ঐতিহ্য, ঘরানা, পরম্পরাকে সসম্ভ্রমে ধরে রেখে বিশ্বদরবারের তাকে সর্বজন সুখশ্রাব্য করে পৌঁছে দেওয়া। যে কোনও রাগের মূল সাবেকি রূপ বজায় রেখেই তাকে তিনি বিশ্বের শ্রোতাদের কাছে করে তুলেছেন মনোজ্ঞ। যখনই কোনও শিল্পীর সঙ্গে যুগলবন্দী বাজিয়েছেন, সে ইহুদি মেনুহিন হোক বা আঁদ্রে প্রেভিন  ‌তাঁদের সকলকেই ভারতীয় মার্গসঙ্গীত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করতেন। কীভাবে ভারতীয় সঙ্গীতকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তার দিকে গুরুজির নজর ছিল প্রখর। সবচেয়ে এক্স ফ্যাক্টর ‌হল এই যে ওঁর বাজনায় যে কোনও ধরনের শ্রোতারই মোহিত হওয়া। আলাপ, জোড়, ঝালা— কোনও অংশেই কনসার্ট দীর্ঘায়িত করতেন না। ফলে পুনরাবৃত্তির একঘেঁয়েমির প্রশ্নই উঠত না। খুব সুন্দর করে এডিট করাটা ওর সেঁতার বাদনের বা অনুষ্ঠান উপস্থাপনার বড় বৈশিষ্ট্য।
অবাক হয়ে শুনি
পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে বছরের পর বছর যখন অনুষ্ঠান করেছেন তখন একটা ডায়েরি মেনটেন করতেন। কোন বছর কোন দেশের কোন শহরের কোন কনসার্টে কী রাগ বাজালেন, কী তাল বাজল— রীতিমতো তালিকা করে লিখে রাখতেন। ফলে এ বছরের রাগ তাল পরের বছর একই স্থানের জলসায় রিপিট হওয়ার প্রশ্নই থাকত না। শ্রোতাদের পরিপূর্ণ বিনোদন দেওয়া, এবং একঘেঁয়ে কোনও কিছু না করার দিকে বিশেষ যত্নশীলতা ছিল গুরুজির।
পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে যখন দেশে দেশে ঘুরে কনসার্ট করেছি, তখন কোথায় কোন কনসার্ট, কী রাগ, কী তাল বাজবে সব আগে থেকে ঠিক করে নিতেন। বাজনাতে তাল আর লয়ের জায়গাটা অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। ইমপ্রোভাইজ করতেন। রিহার্সালের সময় সহশিল্পীদের নিয়ে বসে বাজাতে বাজাতে নতুন নতুন টুকটাক জিনিস উদ্ভাবন করাটা ছিল ওর প্রিয় অভ্যেস।
শঙ্কর সম্মান
ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ও স্বীকৃতিগুলি পাওয়ার পাশাপাশি সারা বিশ্বের নানা প্রবাদপ্রতিম পুরষ্কারে সাজানো রবিরত্ন ভাণ্ডার। সংখ্যাধিক গ্র‌্যামি পুরষ্কার পেয়েছেন জীবনকৃতী সম্মাননাসহ। ২০০২ সালে গুরুজি ওঁর কন্যা অনুষ্কা শংকর, আমি এবং আমার তবলাশিল্পী তন্ময় বসু একসঙ্গে কর্নেগি হলে খাঁটি ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কনসার্ট করি। এই কনসার্ট পরে রেকর্ডিং হয়। এবং সেই রেকর্ডের জন্য গ্র‌্যামি পুরস্কারে ভূষিত হন গুরুজি। গুরুর জীবনের একটি বিশাল সম্মানা ও পুরস্কারের সঙ্গে নিজের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় আমি আজও খুব গর্ব ও গৌরব বোধ করি। পণ্ডিত রবিশঙ্করের শতবর্ষ উদ্‌যাপনে তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টির স্মৃতি নিয়ে, দৈনন্দিন ব্যবহার সামগ্রী নিয়ে, ওঁর ব্যবহৃত নানা সেতার নিয়ে মিউজিয়াম সাজিয়েছে গ্র‌্যামি আকাদেমি। এই মিউজিয়াম সারা বিশ্ব ঘুরে বেড়াবে। গ্র‌্যামি আকাদেমির এই সশ্রদ্ধ নিবেদন ভারতের কাছে একটি বড় সম্মান। সারা বিশ্বেই এই বছরটা রবিশঙ্কর উৎসবের বছর। আশা রাখি ভারতে এবং কলকাতাতে গুরুজি স্মরণে নানা উৎসব আয়োজিত হবে আগামী এক বছর।
ঐশী মহিমায়
এগারো বছর গুরুজির সান্নিধ্যে থাকতে থাকতে বুঝেছি ওঁর সঙ্গে সঙ্গীতের মাধ্যমে ঈশ্বরের সংযোগ হত। বয়সজনিত শারীরিক অসুস্থতা জরাকে পেরিয়ে মৃত্যুর দেড় মাস আগেও ৯৫ বছর বয়সে উনি শেষ অনুষ্ঠানটি করেন। ভাবলে অবাক লাগে। ২০০২ সালে মুম্বইতে সম্মুখানন্দ হলে গুরুজি বাজাতে বসেছেন। বিখ্যাত সব মানুষজন বসে অপেক্ষা করছেন কিংবদন্তী শিল্পীর বাজনা শুনবেন বলে। অডিটোরিয়ামে লতাজী, আশাজী তো ছিলেনই, ছিলেন আরও অনেক প্রবাদপ্রতিম শ্রোতা। সেই সময়টা গুরুজির শরীর ভাল যাচ্ছিল না। যখন উনি মঞ্চে উঠে বাজাতে বসেছেন তখন লক্ষ্য করলাম ওঁর খুব কষ্ট হচ্ছে। চোখে মুখে শারীরিক কষ্ট ফুটে উঠছে। বাজানো শুরু করতেই পারছেন না। অডিটোরিয়ামে অপেক্ষা করছেন বিশাল শ্রোতৃমণ্ডলী। স্তব্ধ অপেক্ষা। উদগ্রীব অপেক্ষা। গুরুজি সেতারটা নামিয়ে রাখলেন। বাজানোর সময় ওঁর সামনে থাকত একটা তারের বাক্স। সেই বাক্সেই রাখা থাকত তাঁর গুরু উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের ছবি।
গুরুজি সেই বাক্স খুলে মিনিটকয়েক তাকিয়ে রইলেন ছবির দিকে ধ্যানস্থ হয়ে। হলের মধ্যে পিন পতনের শব্দ নেই। চার মিনিটের মাথায় সেতার আবার কোলে তুলে নিলেন। এক আশ্চর্য ঐশ্বরিক শক্তিকে সুস্থ বোধ করে বা বাজনা তিনি বাজিয়েছিলেন তা সঙ্গীত রসিকদের কাছে শোনা পণ্ডিত রবিশঙ্করজির অন্যতম সেরা অনুষ্ঠানের স্মৃতি হয়ে রইল।
পার্থিবভাবে পণ্ডিত রবিশঙ্কর আমাদের মধ্যে আর নেই। রয়ে গেল তাঁর অলৌকিক সব সৃষ্টি। কত নতুন রূপ, কত নতুন বন্দিশ। কত মিঠে মিঠে সুর। কত কম্পোজিশন।
পণ্ডিত রবিশঙ্করের জন্মশতবর্ষের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মের সঙ্গীত শিক্ষার্থীদের কাছে এটাই আমার অনুরোধ তাঁরা যেন প্রকৃত সাধক হয়ে উঠতে পারেন। সফল শিল্পীর সবচেয়ে বড় এক্স ফ্যাক্টর ওটাই।‌

পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে বিক্রম ঘোষ 

জনপ্রিয়

Back To Top