সম্রাট মুখোপাধ্যায়: পদ্মাবত। পরিচালনা:‌ সঞ্জয় লীলা বনশালি। অভিনয়ে:‌ রণবীর সিংহ, দীপিকা পাড়ুকোন, শাহিদ কাপুর, অদিতি রাও হায়দারি, জিম সর্ব, রাজা মুরাদ।
বীরগাথা নয়। সঞ্জয় লীলা বনশালির ‘‌পদ্মাবত’‌ ছবিটি আসলে এক ‘‌গ্ল্যামারাইজড’‌ আত্মাহুতিগাথা। যাকে আজকের ভাষায় গণ–‌আত্মহত্যা বলা যায়। আর সে সময়ের প্রথা মেনে বললে ‘‌জহরব্রত’‌ বা ‘‌সতী–হওয়া’‌ বলা যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর গল্প শোনাতে গিয়ে কার্যত মেয়েদের সতী হয়ে নিজেদের ‘‌ইজ্জত’‌ বাঁচানোর প্রথাকে মহিমান্বিত করেছেন সঞ্জয় লীলা বনশালি!‌
তাঁর তাবৎ ছবির ধারাবাহিকতা মেনে এ ‌ছবিও দারুণরকম ‘‌ডিজাইনারস আইটেম’‌। তাঁর ছবির প্রতিটি ফ্রেম রঙে, কল্কায়, সপরিকল্পিত সজ্জায় যেন রাজা রবি ভার্মার ছবি ‘‌ডিজিটালাইজড’‌ সংস্করণ। তাঁর ছবিতে চরম বেদনার মুহূর্তও আসে রঙে–‌রসে চূড়ান্ত ‘‌এলিভেটেড’‌ হয়ে। এ ‌ছবিও তাই। হর্ষ–‌বিষাদ–‌রণ–‌শৃঙ্গার সর্বত্রই সেই ‘‌ক্যালেন্ডারলুক’‌ পর্ব পেরিয়ে যখন ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌ বা চূড়ান্ত মুহূর্ত আসে, তখনও শব্দে– দৃশ্যে তাকে মহিমান্বিত করেই গড়েন সঞ্জয়!‌ আর বুঝে বা না–‌বুঝে এ ‌ছবি ঢুকে পড়ে পরোক্ষে সতী–‌প্রথাকে মহিমান্বিত করার মতো আপত্তিকর জায়গায়!‌
প্রায় ১৫ মিনিট ধরে দেখানো হয় মেবারের শত শত রমণী মিছিল করে এগিয়ে চলেছে অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেবে বলে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে পদ্মাবতী। কোন পদ্মাবতী?‌ না সেই পদ্মাবতী, যাকে ছবির শুরুতে দেখানো হল তিরন্দাজিতে অদ্ভুত পারঙ্গমা হিসেবে। মেবারের রানা রাওল রতন সিংহের সঙ্গে তার পরিচয়টাই হল শিকারে গিয়ে। পদ্মাবতীর রূপের সঙ্গে বীরত্বও রতন সিংহকে মুগ্ধ করল। অথচ তারপর যখন মেবারের রানি পদ্মাবতী, তখন একবারের জন্যও অস্ত্র ধরতে দেখা গেল না তাকে!‌ না, ভুল লিখলাম, অস্ত্র একবার ধরলেন তিনি, আর তা ধরলেন রাজপুত–‌প্রথা মেনে স্বামীর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার সময়!‌ তাহলে, নারীর একমাত্র কাজ কি স্বামীর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া, বনশালি?‌ এমন–কি নিজেকে রক্ষা করতেও অস্ত্র ধরা নয়?‌
তা না হলে, এতজন বীর রমণী ছবি জুড়ে যাবতীয় হুঙ্কারের পরেও, এমন–কি চূড়ান্ত দিনেও অস্ত্র হাতে তুলে নিল না!‌ আত্মাহুতি দিয়ে নিজের ‘‌পবিত্রতা’‌ রক্ষা করল!‌ আর মধ্যযুগের সেই চরম অমানবিক প্রথাকে সিনেমার ফ্রেমে মহিমান্বিত করল একবিংশ শতাব্দীর এই সিনেমা ‘‌পদ্মাবত’‌!‌ যেখানে জহরব্রত পালন করতে চলা নারীদের পেছনে সাউন্ডট্র‌্যাক জুড়ে সংস্কৃত শ্লোক, সতীদের জয়গান আর তুমুল ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক!‌ না ভয়ের নয়!‌ মহিমা আর প্রশান্তির মিউজিক!‌ প্রতিটি নারীমুখ কী প্রশান্তিময়, কী নিরুদ্বিগ্ন!‌ একটা আর্তনাদ পর্যন্ত নেই!‌ দুঃখিত, বনশালি মহোদয়, আপনার এই হাইটেক, ডিজিটালাইজড্‌ সতী–‌উপাখ্যানটি কোনও সুস্থ বুদ্ধির মানুষই মেনে নিতে পারবেন না। মনে হবে আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ধর্মান্ধ এক কুসংস্কারকে এ ‌ছবি বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ধর্মান্ধতার ‘‌বদবু’‌ অবশ্য গোটা ছবিরই গা জুড়ে। এ ‌ছবির কাহিনীর ভেতর মহাকাব্যিক কিছু গুণ ছিল। মাঝে–‌মাঝে মনেও হচ্ছিল বনশালি যেন ঢুকতে চাইছেন আধুনিক এক রামায়ণ বা ‘‌ইলিয়াড’‌–‌এর এপিকাল ধাঁচার ভেতরে। সেই আদিম নারীহরণের চেষ্টা আর তার সঙ্গে ক্ষমতা–‌বিস্তারের এক সঙ্ঘাতময় রসায়ন। দিল্লির বাদশাহ আলাউদ্দিন খিলজি (‌ইতিহাস বলে যার রাজত্বকাল ছিল ১২৯৬ থেকে ১৩১৬ খ্রিস্টাব্দ)‌ শুধুমাত্র রূপের বর্ণনা শুনেই আকৃষ্ট হন রানি পদ্মাবতীর প্রতি। পদ্মাবতী (‌এ ‌চরিত্রটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন আছে, মনে করা হয় এ ‌চরিত্রের জন্ম ১৫৪০ সালে লিখিত হওয়া ‘‌পদ্মাবত’‌ কাব্য থেকে, যে কাব্য লিখেছিলেন মালিক মহম্মদ জয়সী আর পরবর্তিকালে নানা গল্পগাথা আর সিনেমায় এ চরিত্র ছড়িয়ে পড়ে জনপ্রিয় হয়েছে)‌ শ্রীলঙ্কার মেয়ে, তার বীরত্বে আকৃষ্ট হয়ে তাকে বিবাহ করে মেবারে এনেছে রতন সিংহ। এরপর মেবারের টুকটাক আভ্যন্তরীণ গল্প, যেমন রাজার প্রথম স্ত্রীর অসূয়া, বিকৃতকাম রাজগুরুর উঁকিঝুঁকি, রাজার দুই বীর সহযোদ্ধার পরিচয় ইত্যাদি মামুলি তেমনভাবে–না–জমা কিছু এপিসোড পেরিয়ে গল্প চলে যাচ্ছে মূল সঙ্ঘাতে। যে কোনও মূল্যে রানি পদ্মাবতীকে নিজের হারেমে চায় আলাউদ্দিন। ফলে প্রথমে রতন সিংহকে হুমকি চিঠি, এবং এর পরপরই মেবারের বাইরে বিশাল সৈন্য নিয়ে অবরোধ, ফল না হওয়ায় বন্ধু সেজে মেবারের আতিথ্যগ্রহণ এবং তারপর পাল্টা আতিথ্যের ছদ্মবেশে রতন সিংহকে অপহরণ করে দিল্লি নিয়ে গিয়ে পণবন্দি করে রাখা। রতন সিংহকে ছাড়াতে অতঃপর পদ্মাবতীর দিল্লি যাত্রা। পরপর ধাপ মেনে এরা এসেছে।
কিন্তু মজার কথা, প্রচুর প্রত্যাশা জাগিয়েও এই পর্বে পদ্মাবতী তলোয়ার ধরেনি। তার সঙ্গে থাকা রাজপুতানিরাও দেখা গেছে ছদ্মবেশে আসলে পুরুষ। রতন সিংহ আর পদ্মাবতী গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে এসেছে আলাউদ্দিনের প্রথমা স্ত্রীর (‌অদিতি রাও হায়দারি)‌ সহায়তায়। যদিও, তার আগে, সঞ্জয় লীলা বনশালির সিনেমার ‘‌মেলোড্রামা’‌ মেনে রতন সিংহ আলাউদ্দিনের শয়নকক্ষে ঢুকে মস্ত মস্ত সংলাপ বলে এসেছে। অহেতুক। আসলে এটাই এ ‌ছবির সবচেয়ে বড় সমস্যা, ছবি জুড়ে অহেতুক একাধিক গর্জন, অথচ আসল সময়ে যা বর্ষণহীন। যদি–বা ধরে নেওয়া যায়, এসব ‘‌লার্জার দ্যান লাইফ’‌ ব্যাপারস্যাপার দিয়ে একটা মহাকাব্যিক পরিবেশ তৈরি করছেন বনশালি, শেষটায় গোটাটাই পড়ে যায় জলে, থুড়ি আগুনে!‌
আসলে, মহাকাব্যও নয়, ঠিকঠাক ‘‌মেলোড্রামা’‌ও নয়, সঞ্জয় লীলা বনশালি এবার যেটি বানিয়েছেন তা একটি ছেলেমানুষি রূপকথা। শুধু সেখানে থাকা ‘‌নির্দোষ’‌ রাক্ষস–‌খোক্কসের  এখানে ধর্মীয় একটি মোড়ক পেয়েছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী রাজা আলাউদ্দিন গোটাটাই কালো। সারাক্ষণই যে শুধু নারীচিন্তায় মগ্ন। নাহলে প্রবল মাংসভোজন অথবা, ইসলমি পতাকা হাতে উত্তেজক বক্তৃতা ইত্যাদিই তার নিত্যকর্ম। অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদীরা ঠিক যেভাবে মুসলমান রাজত্বকে দেখাতে চায়, তার অবিকল প্রতিরূপ এই ছবি। আলাউদ্দিন কুটিল, বিশ্বাসঘাতক, উভকামী— এমন একপেশে চরিত্রায়নের পাশে ঢাকা পড়ে গেছে তার ঐতিহাসিক রূপটি। অন্যদিকে রাজপুত জগৎটি গোটাটাই আলোকিত। মহত্ত্বে ভরা। পশুবলি দেওয়ার নৃশংস প্রথাও সেখানে ‘‌পবিত্র’‌!‌ আলাউদ্দিনের জগৎটি গোটাটাই কালোয়–‌অন্ধকারে আর রতন সিং–‌পদ্মাবতীর জগৎটি গোটাটাই ঝলমলে আলোয় ‘‌শুট’‌ করা। পরিচালক এ ‌ছবিতে এতটাই মোটা দাগে উদ্দেশ্যমূলক!‌ কেন যে হিন্দুত্ববাদীরা এ ‌ছবিকে আক্রমণ করলেন বোঝা গেল না!‌ ভুল বুঝে কি?‌ নাকি গভীরতর কোনও উদ্দেশ্য চরিতার্থে?‌
রণবীর সিংহকে আলাউদ্দিনের চরিত্রে লেগেছে রাক্ষসের মতো আর দীপিকা পাড়ুকোনকে লেগেছে ক্যালেন্ডারের দেবীর মতো। এমন ‘‌কার্ডবোর্ড’মার্কা চরিত্রের কাছে পরিচালকের আর কিছু দাবিও ছিল না অবশ্য। দুজনের মধ্যে পড়ে বেচারা শাহিদ কাপুর ‘‌শহিদ’‌ হয়েছেন রতন সিংহ চরিত্রে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top