সম্রাট মুখোপাধ্যায়- এত দিন আমেরিকান মোশন পিকচার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড মানে ছিল কোডাক থিয়েটারের লাল কার্পেটে ডিজাইনার পোশাকের প্রায় অশালীন দেখানেপনা আর উপস্থাপকের চটুল রসিকতা। এত দিন অস্কার–‌ভাষণ মানে ছিল হাতে–‌গোনা কিছু ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ বাদ দিলে আবেগতাড়িত উচ্ছ্বাস আর ধন্যবাদে নুয়ে পড়া। সেই সব কিছু বদলে গেল এবারের এই ৯০তম অস্কার পুরস্কারের আসর থেকে। বদলে দিলেন জীবনে দ্বিতীয়বার সেরা অভিনেত্রীর অস্কার পুরস্কার নিতে–‌ওঠা ফ্রান্সেস ম্যাকডরমন্ড। শুরুতেই অবশ্য ‘‌বিধিসম্মত সতর্কীকরণ’‌ দিয়েছিলেন যে তঁার অনেক কিছু বলার আছে। কাজেই হয়তো একটু উথলে উঠতে পারেন, বাকিরা যেন সামলে নেন!‌ এর পরই ফ্রান্সেস হাতে ধরা অস্কার–মূর্তিটি ঠকাস করে নামিয়ে রাখেন মঞ্চের ওপর। সামনে বসা অন্য অভিনেত্রীরা, যঁারা এবার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারের মনোনয়ন পেয়েছেন, তঁাদের উদ্দেশে বলেন, ‘‌তোমরা সবাই উঠে দঁাড়াও’‌। পরের মন্তব্য সরাসরি মেরিল স্ট্রিপের নাম ধরে— ‘‌মেরিল, তুমি দঁাড়াও। তোমাকে দেখে বাকিরাও দঁাড়াবে!‌’‌ অবশ্যই। এর আগে মেরিল স্ট্রিপও বহুবার পুরস্কারের মঞ্চে প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। কখনও নারী অধিকারের পক্ষে, কখনও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভব্যতার বিরুদ্ধে। সবাই উঠে দঁাড়াতে এবার ফ্রান্সেস ম্যাকডরমন্ড বাকি অতিথিদের উদ্দেশে বলেন, ‘‌এঁদের দিকে তাকিয়ে দেখুন ভদ্রমহোদয় এবং ভদ্রমহিলাগণ। আমরা, আজ যারা এখানে এসেছি, তারা কিন্তু পার্টি করতে আসিনি। ভাল ভাল খাবারের লোভেও আসিনি। আমরা এসেছি, কারণ আমরা কাজ করতে চাই। আমাদের সবারই কিছু না কিছু বলার আছে। সেই কথাগুলো বলার জন্য আমাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। কাজেই আশা করব, আজকের পর থেকে আপনারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আপনাদের অফিসে আমাদের ডাকবেন, অথবা নিজেরাই আসবেন আমাদের দপ্তরে। অনেক কাজ করার আছে আমাদের।’‌
এমন চঁাছাছোলা ভাষায় চলচ্চিত্র শিল্পের মোদ্দা কথাটা আর কেউ বলেছেন বলে কারও খেয়াল পড়ছে না। এর আগেও স্যামুয়েল জ্যাকসন, ডেনজেল ওয়াশিংটন, মেরিল স্ট্রিপ–রা প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন, কিন্তু গ্ল্যামার–মুগ্ধ হলিউডকেও এমনভাবে কেউ নাড়া দেননি, যেমনটা ফ্রান্সেস ম্যাকডরমন্ড দিলেন। যে ছবির জন্য ফ্রান্সেস সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেলেন, সেই ‘‌থ্রি বিলবোর্ডস আউটসাইড এবিং, মিসৌরি’ ছবিতেও তঁার চরিত্রটি এক প্রতিবাদী নারীর। এক নাছোড়বান্দা মায়ের, যিনি তাঁর ধর্ষিত নিহত মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়েও না পেয়ে এক অদ্ভুত পথ বেছে নিয়েছেন। এবিং শহরের সীমানায় তিনটি বড় বিলবোর্ড ভাড়া নিয়ে ঘোষণা করেছেন মেয়ের মৃত্যু আর তার বিচার না পাওয়া আর শহরের শেরিফের অপদার্থতার কথা। নানা চাপেও এ ‌তিনটি বোর্ড প্রত্যাহার করতে নারাজ সেই মা মিলড্রেড। এদিনের আসরে ম্যাকডরমন্ডের নারীবাদী আচরণ আর চমক–‌লাগানো ঘটনা ঘটিয়ে দেওয়া যেন তার ওই চরিত্রায়ণেরই আরেক ‘‌অফ দ্য স্ক্রিন’‌ প্রকাশ। 
পরিস্থিতি যা ছিল, তাতে অস্কারে এবারে সেরা ছবি হবে ‘‌থ্রি বিলবোর্ডস.‌.‌.‌’‌ এমনটাই ভেবেছিলেন অনেকে। কারণ এ ‌ছবি এর আগে ‘‌বাফ্‌টা’‌ এবং ‘‌গোল্ডেন গ্লোব’‌ দুই বড় আসরেই পুরস্কৃত হয়েছে সেরা ছবি হিসেবে। কিন্তু অস্কারে সেরা হল ‘‌দ্য শেপ অফ ওয়াটার’, যার পরিচালক ডেল টোরো পেলেন সেরা পরিচালকের পুরস্কার। তবে সেরা অভিনয়ের চারটি অস্কারই মিলে গেল বাফ্‌টা এবং গোল্ডেন গ্লোবের পছন্দের সঙ্গে। সেরা অভিনেতা গ্যারি ওল্ডম্যান (‌উইনস্টন চার্চিলের জীবন‌ভিত্তিক ছবি ‘‌ডার্কেস্ট আওয়ার’‌–‌এর জন্য)‌, সেরা অভিনেত্রী  ফ্রান্সেস ম্যাকডরমন্ড, সেরা সহ–‌অভিনেতা হলেন স্যাম রকওয়েল (‌‘‌থ্রি বিলবোর্ডস.‌.‌.‌’‌)‌ আর সেরা সহ–‌অভিনেত্রী হলেন অ্যালিসন জেনি (‌‌‘‌আই, টনিয়া’‌)।
‘‌দ্য শেপ অফ ওয়াটার’‌ পুরস্কার পেল মোট ৪টি। সেরা ছবি, সেরা পরিচালকের পাশাপাশি সেরা ওরিজিনাল স্কোর  আর সেরা প্রোডাকশন ডিজাইন। অভিনয় বিভাগে ওই দুই পুরস্কার ছাড়া ‘‌থ্রি বিলবোর্ডস‌’‌ আর কোনও সেরার সম্মান পায়নি। বরং তাকে ছাপিয়ে গেছে ‘‌ডানকার্ক’‌। ক্রিস্টোফার নোলানের এই ‘‌ওয়ার মুভি’‌ এবারের আসরে বিশেষ সুবিধে করতে পারবে না, এমনটাই ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ‘‌ডানকার্ক’‌ পেয়েছে ৩টি অস্কার। সেরা শব্দ–সম্পাদনা, শব্দ–মিশ্রণ আর চলচ্চিত্র সম্পাদনা— ‌এই তিন কারিগরি বিভাগে ‘‌ডানকার্ক’‌–‌এর জয়জয়কার। ভিস্যুয়াল এফেক্ট আর চিত্রগ্রহণ— এই দুই দৃশ্য–‌কারিগরি বিভাগে যেমন ‘‌ব্লেড রানার ২০৪৯’‌ ছবির, এবারের অস্কার আসরে আর এক কালো ঘোড়া ছিল কৃষ্ণাঙ্গ পরিচালক জর্ডন পিলের ‘‌গেট আউট’‌। ভয়ের ছবির মোড়কে বর্ণবিদ্বেষের বাস্তবতা নিয়ে হাড়–কঁাপানো ছবি। জর্ডন জিতলে তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পরিচালক হতেন। কিন্তু ঘটনাটা ঘটল না। জর্ডন পুরস্কার পেলেন সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যের জন্য। ‘‌অ্যাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লে’‌র জন্য সেরার পুরস্কার পেলেন বর্ষীয়ান জেমস আইভরি, ৮৯ বছর বয়সে। আর সেই সূত্রে অস্কার ইতিহাসে জেমসই হলেন প্রবীণতম পুরস্কার‌প্রাপক। ৩০ বছর পর জেমস আবার এই পুরস্কার পেলেন।
আর একটা ব্যাপারে নজির গড়ল এদিন লস অ্যাঞ্জেলসের এই আসর। সাধারণত সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার দিতে আসেন গত বছরের সেরা অভিনেতা। গত বারের সেরা অভিনেতা কেসি অ্যাফ্লেক নারী নিগ্রহের ঘটনায় অভিযুক্ত। তাই তাঁকে এ ‌সুযোগ দেওয়া হল না। বদলে দিলেন দুই অভিনেত্রী জোডি ফস্টার আর জেনিফার লরেন্স। ডলবি থিয়েটারে অস্কার আসর জুড়ে এবার নারীশক্তিরই জয়জয়কার।

সেরা অভিনেতা গ্যারি ওল্ডম্যান। ছবি: এপি

জনপ্রিয়

Back To Top