অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুটি ভেঙে গেছে তাঁদের ৮টি ছবির ‘‌নিবেদক’‌ অতনু রায়চৌধুরির। এই খবরটা চলচ্চিত্র মহলে বেশ কিছুদিন ধরেই ঘুরছিল। এবার নতুন খবর। নিবেদক হিসেবে অতনু রায়চৌধুরি নতুন জুটি বাঁধলেন বাংলা ধারাবাহিকের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনীকার, পরিচালক লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। এবং ঘোষিত হল তাদের নতুন ছবির নাম। ‘‌সাঁঝবাতি’‌। এই ছবির‌ শিল্পী তালিকাতেও নতুন জুটির চমক। সেই জুটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং দেব-‌এর। সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় ও পাওলি দাম।
জুটির ভাঙা-‌গড়া
অতনু রায়চৌধুরি গড়িয়াহাটের কাছে যে বাড়িতে থাকেন, সেটার নম্বর ‘‌৭৪’‌। কিন্তু এই বাড়িটিকে ‘‌সাড়ে চুয়াত্তর’‌ বলে ডাকতেই ভালবাসেন তিনি। বললেন, শুনেছি, এই বাড়িতেই বিখ্যাত ‘‌সাড়ে চুয়াত্তর’‌ ছবির পরিকল্পনা হয়েছিল। অনেকটা শুটিং-‌ও হয়েছিল এখানে। যখন সেই পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি হল, আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম, বাড়ির নম্বর হোক সাড়ে চুয়াত্তর। কিন্তু হয়নি। তবে, এই বাড়িটাকে ‘‌সাড়ে চুয়াত্তর’‌ বলে ভাবতে এবং ডাকতে ভাল লাগে আমার। বললেন অতনু।
এই কথাতেই প্রমাণ সিনেমার সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত থাকতে ভালবাসেন তিনি। তবে সিনেমার সঙ্গে তাঁর জুটি সেই বালক বয়স থেকে। তাঁর দাদু রমেন্দ্রকুমার রায়চৌধুরি তৈরি করেছিলেন ‘‌বারুইপুর শো হাউস’‌। বারুইপুরের মানুষ তাঁরা। এই সিনেমা হল পরে চালিয়েছেন তাঁর বাবা তরুণ রায়চৌধুরি। এখানে বালক বয়সে ‘‌ব্ল্যাকার’‌দের মোকাবিলাও করতে হয়েছে। ফলে, অতনু রায়চৌধুরি যখন বলেন, ‘‌সিনেমার সঙ্গে আমার জুটি সেই ছোট্ট থেকে’‌, তখন অবিশ্বাসের আর কোনও কারণ থাকে না।


কিন্তু শিবপ্রসাদ, নন্দিতা রায়ের সঙ্গে আপনার জুটি তো একটার পর একটা হিট দিয়েছে। সেই জুটি ভাঙল কেন?‌
অতনু রায়চৌধুরি বলেন, মতের মিল হচ্ছিল না বলেই জুটি ভেঙে গেল।
তারপর বললেন, সেই ‘‌মুক্তধারা’‌ থেকে শুরু। তারপর ‘‌অলীক সুখ’‌, ‘‌রামধনু’‌, ‘‌বেলেশেষে’‌, ‘‌প্রাক্তন’‌, ‘‌পোস্ত’‌ ‘‌প্রজাপতি বিস্কুট’‌, ‘‌হামি’‌তে আমিই ছিলাম নিবেদনে। এবার লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে তৈরি করব ‘‌সাঁঝবাতি’‌। হ্যঁা, নিবেদক হিসেবে এটা আমার ৯ নম্বর ছবি।
শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নন্দিতা রায় জুটির ফ্রন্ট ম্যান যেমন শিবপ্রসাদ, তেমনি লীনা গঙ্গোপাধ্যায় হলেন লীনা ও শৈবাল ব্যানার্জি জুটির ‘‌মুখ’‌। শিবপ্রসাদদের মতো লীনারাও যুগ্মভাবেই ধারাবাহিক ও সিনেমা পরিচালনা করেন। বাংলা ধারাবাহিকের ‘‌সম্রাজ্ঞী’‌ আখ্যা দেওয়া হয় লীনাকে। গত বছর লীনা-‌শৈবালের পরিচালনায় তাদের প্রথম বড়পর্দার ছবি ‘‌মাটি’‌ মুক্তি পায়। কিন্তু লীনা-‌শৈবালের ধারাবাহিক যে জনপ্রিয়তা পায়, ‘‌মাটি’‌ বক্স অফিসে সেই জনপ্রিয়তা পায়নি।
তবুও, কেন লীনা, শৈবালকেই বেছে নিলেন?‌
অতনুবাবুর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘‌মাটি’‌ কিন্তু আমি নন্দনে হাউসফুল অবস্থায় দেখেছি। ছবিটা ভাল। কিন্তু আমার মনে হয় সঠিক প্রচার আর বিপননের অভাবেই যতটা বক্স অফিস সাফল্য পাওয়া উচিত ছিল, সেটা ‘‌মাটি’‌ পায়নি।
প্রশ্ন করি, শিবপ্রসাদ-‌নন্দিতা রায় বছরের পর বছর যেভাবে বক্স অফিস সাফল্য পেয়েছেন, সেটাকে ধরা তো বেশ বড়-‌সড় প্রতিযোগিতা?‌
অতনু রায়চৌধুরি বললেন, প্রথমত আমি কোনও প্রতিযোগিতায় যাচ্ছি না।

সিনেমাটা আমার‌ প্যাশন, আমার ভালবাসা। আমার পেশা কিন্তু ওকালতি। অন্যদিকে, দর্শকদের নাড়ির স্পন্দন শিবু যেমন বোঝে, বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে আর কেউ ততটা বোঝেনা। মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শক কী চায়, সেটা এখন সবচেয়ে ভাল জানে শিবু। এটা অস্বীকারের জায়গা নেই। কিন্তু, আমার মনে হয়েছে, লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বছরের পর বছর দর্শকদের চাহিদা মাথায় রেখে রুচিসম্মত জনপ্রিয় ধারাবাহিক উপহার দিচ্ছেন। ‘‌মাটি’‌ও দারুণ ছবি। আমি চাই, রুচিসম্মত ছবি তৈরি করতে, যা, পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে দেখতে পারবে। নিবেদক হিসেবে আগের ৮টা ছবিতে আমি যে চেষ্টা করেছি, ৯ নম্বর ছবি ‘‌সাঁঝবাতি’‌তেও সেই চেষ্টাই করব।‌
এ ছবি মাটি হবে না
‘‌নিবেদক’‌ অতনু রায়চৌধুরির সঙ্গে নতুন জুটি-‌বাঁধা পরিচালক লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, সাঁঝবাতি কিন্তু মাটি হবে না। মাটিতে একটা অন্য এক্সপেরিমেন্ট করেছিলাম। সাঁঝবাতি কিন্তু সবার ভাললাগার ছবি হয়ে উঠবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। হ্যঁা, আমরা, মানে আমি আর শৈবাল মিলেই এই ছবি পরিচালনা করব। আমরা একসঙ্গেই কাজ করি।
হ্যঁা, সিনেমার শিবপ্রসাদ-‌নন্দিতা রায়ের ধারাবাহিক সাম্রাজ্যে মতো লীনা-‌শৈবাল জুটিও খুবই জনপ্রিয়।
নিজেদের প্রোডাকশন হাউস থাকতেও অতনু রায়চৌধুরির প্রযোজনায় ছবি করছেন কেন?‌
লীনা বললেন, ঠিকই, আমরা ভেবেওছিলাম আমাদের প্রোডাকশন হাউস থেকেই আমাদের ছবি করব। কিন্তু অতনুবাবু এই প্রস্তাবটা দিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে মনে হল, তিনি খুব সোজাসুজি কথা বলেন এবং সিনেমার বিপননটা দারুণ বোঝেন। ছবির কাহিনী এবং পরিচালনার ক্ষেত্রেও উনি পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়েছেন আমাদের। তাই আমরাও আগ্রহী হয়ে উঠি এই কাজটা নিয়ে।
লীনা মনে করেন, তাঁদের ‘‌মাটি’‌ একটা নির্দিষ্ট দর্শকদের জন্যেই তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু, সাঁঝবাতি আর একটু পপুলার ভাবনার ছবি এবং পারিবারিক—বললেন লীনা।
সৌমিত্র-‌দেব জুটি
অতনু রায়চৌধুরি এবং লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, এই প্রথম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং দেবকে বাংলা ছবিতে একসঙ্গে পাওয়াটা অবশ্যই একটা বড় ব্যাপার। এবং দুজনেই বললেন, ছবির গল্প কিন্তু দেব-‌কে ‘‌ডিমান্ড’‌ করছে বলেই দেবকে নেওয়া হয়েছে। এবং দেব খুবই আগ্রহী এই ছবি নিয়ে।
ছবির গল্প নিয়ে এখনই মুখ খুলতে চান না প্রযোজক বা পরিচালক। শুধু লীনা জানালেন, একটা মফস্‌সল শহর থেকে কলকাতায় আসে দেবের চরিত্র। তারপর একটা ঘটনায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেবের সংযোগ তৈরি হয়। পাওলি দাম এবং অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় থাকছেন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। কিন্তু তাঁদের চরিত্র সম্পর্কে এখনই কিছু বলতে নারাজ লীনা।
ছবির শুটিং শুরু হবে মে মাস নাগাদ। ‘‌সাঁঝবাতি’‌র মুক্তি ডিসেম্বরে, বড় দিনে, জানিয়ে দিলেন প্রযোজক।
ছবির ‘‌নিবেদক’ তো আপনি। প্রযোজকও তো?‌
অতনুবাবুকে প্রশ্নটা করতেই তিনি বললেন, আমি বরাবরের মতোই এছবির নিবেদক। হ্যঁা, প্রযোজনা সংস্থাও আমার। এই প্রযোজনা সংস্থার‌ নাম—‘‌বেঙ্গল টকিজ’‌।
নিজেদের সিনেমা হলে বাংলা ছবি দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা, বাংলা ছবিকে গভীরভাবে ভালবাসা একজন মানুষের প্রযোজনা সংস্থার নামটা যে যথার্থ হয়ে উঠেছে, সন্দেহ নেই। এখন বেঙ্গল টকিজের প্রথম ছবি ‘‌সাঁঝবাতি’‌ কতটা আলো ছড়ায় দর্শকদের মধ্যে, আপাতত সেটারই অপেক্ষা।

জনপ্রিয়

Back To Top