সম্রাট মুখোপাধ্যায়: সবে দেখানো শেষ হয়েছে ‘‌আলফা’‌। উত্তর কলকাতার ‘‌মিনার’‌–‌এ। দর্শকরা এ’‌‌ছবি দেখে চমকিত। এযেন অন্য এক নাসিরুদ্দিন ইউসুফ। ‘‌একাত্তরের যীশু’‌ বা ‘‌গেরিলা’‌র সেই মুক্তিযুদ্ধ নির্ভর ‘‌ডকুমেন্টেড’‌ কাহিনিচিত্রের পরিচালক নন। বরং এই ‘‌আলফা’‌য় তিনি বারবার বাস্তবতাকে ডিঙিয়ে যান। স্বপ্নে ঢুকে পড়েন। দু’‌দিন আগে ‘‌বিজলী’‌তে দেখানোর সময়ও দর্শকদের একইরকম মুগ্ধ প্রতিক্রিয়া ছিল। এ‌ছবির প্রযোজক এষা ইউসুফ। নাসিরুদ্দিনের কন্যা। বাংলাদেশে এ‌‌ছবি মুক্তি পেয়েছে আগেই। এবার কলকাতায় এল কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে। ‘‌গেরিলা’‌ বানিয়েছিলেন আট বছর আগে। সেবারও সে ছবি নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন স্বয়ং নাসিরুদ্দিন ইউসুফ, বাংলাদেশের সিনেমার সফল পরিচালক, বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চের অন্যতম প্রধান পুরুষ। এবারও এসেছেন ‘‌আলফা’‌ নিয়ে। সকন্যা। ‘‌মিনার’‌–‌এ ছবি দেখা শেষ করে এসে নন্দন চত্বরে ধরা গেল নাসিরভাই ওরফে বাচ্চুভাইকে। একটু আসেই চত্বরের একতারা মঞ্চে তাঁর সংবর্ধনা ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিভাস চক্রবর্তী, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তদের সঙ্গে। তা গ্রহণ করে তখন সবে মঞ্চ থেকে নেমে সবান্ধব আড্ডা দিচ্ছেন।
• কেমন আছেন?‌
••‌ ভালই আছি। (‌হেসে)‌ তবে খুব ভাল তেমনও বলা যাবে না। ওই যে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত একটু আগে মঞ্চে বক্তৃতা করতে উঠে শেষের দিকে বললেন, আচ্ছা, তাহলে খারাপ থাকবেন। কারণ চারপাশে যা চলছে, তাতে উৎফুল্লিত থাকবার মতো কিছু তো নেই। (‌আবার হেসে)‌ তা আমি রুদ্রদার সঙ্গে খানিকটা একমত তো বটেই।
• ‘‌গেরিলা’‌ দেখার পর থেকেই এশহরেও আপনার কিছু ভক্ত তৈরি হয়েছে।
•• সেটা কলকাতায় এলে বুঝতে পারি।
• তাদের অনেকেরই কৌতূহল, আপনার ছবি বানানোর মেজাজ এই তিন নম্বর ছবিতে এসে এত বদলে গেল কী করে?‌
••‌ আসলে, আমি সচেতনভাবেই এই চেষ্টাটা করেছিলাম। চারপাশে ‘‌ভাল’‌ সিনেমা এত কমে যাচ্ছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবার ছবি করলে অন্যরকম একটা ছবি করব, যা আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের গল্প বলবে। দুই বাংলাতেই চালু ছবির মতো ওই ফ্ল্যাটবাড়ির দাম্পত্য–‌প্রেমের গল্প হয়ে উঠবে না সেটা। মাঝে এই যে আট বছরের ‘‌গ্যাপ’‌ সেটাও নিজেকে বদলাতে সাহায্য করেছে।
• এ‌ছবিতে কি সেলিম আল দিনের ‘‌চাকা’‌ নাটকের প্রভাব আছে মৃতদেহটি আসার প্রসঙ্গে। যা থেকে মোরশেদুল ইসলাম একবার একই নামের এক সাড়া ফেলে দেওয়া ছবি করেছিলেন?‌
••‌ ‘‌চাকা’‌ তো আমিই মঞ্চে করেছি। হয়তো মনের কোণে কোথাও সেলিমভাই প্রভাবিত করে থাকতে পারেন।.‌.‌.‌ তবে বহু দর্শক তো বলছেন, এসিনেমাতে নাকি ব্রেখটও আছেন। কাহিনির বয়ন আর বাস্তবতাকে ভাঙায়। (‌হেসে)‌ আসলে কী জানেন, আমি হয়তো নাটকের লোক বলেই এসব কথা ওঠে। দর্শকেরা এই মিলগুলো খুঁজে নেন।
• এ‌ছবির প্লট মাথায় এল কী করে?‌
••‌ ওই যে বললাম, আমি আসলে একটা ‘‌ভাল’‌ সিনেমা যেরকম হয়, তা করতে চাইছিলাম। আর একাজে আমায় দেশ–‌বিদেশের ‘‌মিথোলজি’‌ প্রচুর সাহায্য করেছে। আমি যে রূপকটা চাইছিলাম, আবার তার ভেতরে একটা বড় ক্যানভাসও চাইছিলাম, তা এ‌গল্পটায় ধরতে পেরেছি। এর ভেতর মহরম আছে, আবার হরগৌরীর মিথও আছে। আছে গোদারের ছবিতে দেখা গাধাও।
এসিনেমার কাহিনির কেন্দ্রে আছে এক শিল্পী আলফা। যার নামটাই নাসিরুদ্দিনের কথায় গ্রিক শব্দভাণ্ডার থেকে নেওয়া। সে একজন শিল্পী। ব্যক্তিগত জীবনে অনাথ ও কিছুটা নিঃসঙ্গ আলফা রিকশার গায়ে ছবি আঁকে। সে থাকে জলের ওপরে কাঠকুটো দিয়ে বানানো এক ঘরে। যা তার নির্জনতার প্রতীক। এই ঘরটা বানিয়ে তাকে না দুলিয়ে শুটিং করাটা খুব কঠিন চ্যালেঞ্জের কাজ ছিল, জানালেন নাসিরুদ্দিন। এই ঘরের তলায় জলে ভেসে আসে এক মৃতদেহ, পরিচয়হীন। যার পরিচয় খোঁজার কাজে নামে আলফা। যা যেন বাঙালির নিজস্ব আত্মপরিচয় খোঁজা। নাসিরুদ্দিন এনিয়ে বললেন, লক্ষ্য করে দেখবেন আমি এ’‌মৃতদেহকে লিঙ্গহীন করে দিয়েছি। তা লিঙ্গের সঙ্গে অন্বিত যে ধর্মপরিচয় তাকে যাতে নষ্ট করে।
• এর পরের সিনেমা কিছু ভাবলেন?‌
•• হ্যাঁ, আবার পুরনো ফর্ম্যাটে ফিরে যাব। তবে এবার মুক্তিযুদ্ধ নয়। ভাষা আন্দোলন নিয়ে ছবি করব। যা ছিল বাঙালির মুক্তিচেতনার উৎসে। কমপক্ষে তিন বছর লাগবে এ‌ছবি করতে।
•‌ আর নাটক?‌ সেটা কী করছেন?‌
••‌  এবার নাটকে বরং একটু অন্য ফর্মে যাব। একটা নৃত্যনাট্য করব ভাবছি। বিষয় হবে বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান। সেটা আগামী বছরেই মঞ্চস্থ হবে।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top