সৌগত চক্রবর্তী: ‘‌ঋতুদাকে (‌ঋতুপর্ণ ঘোষ‌)‌ নিয়ে ‘‌আর একটি প্রেমের গল্প’‌ আমার প্রিয় ছবি। সেই ছবি ছিল অনেকটাই আত্মজীবনী মূলক। তাতে কৌশিক গাঙ্গুলির ছবির যে বিশেষত্ব তা ছিল না,’‌ বলছিলেন কৌশিক গাঙ্গুলি। বলছিলেন, ‘‌ততদিনে ১৭টা ছবি করে ফেলেছেন ঋতুদা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা যন্ত্রণায় গুমরে গুমরে উঠছিলেন। তখনই আমি ঋতুদার কাছে গিয়েছিলাম ‘‌আর একটি প্রেমের গল্প’‌ নিয়ে। সেই ছবি বড় সাফল্য পেল। আর তারপরেই ঋতুদা পরপর দুটো ছবি করলেন—‘‌মেমরিজ অন মার্চ’‌ আর ‘‌চিত্রাঙ্গদা’‌। ঋতুদার জীবনধারা বা শারিরীক একটা পরিবর্তনও এল। কিন্তু সে অন্য কথা। আসল কথা হল, রূপান্তরকামীদের অনেক সমস্যার কথাই আমি সেই ছবিতে বলতে পারিনি। কারণ, সেটা ছিল উচ্চবিত্তের ছবি। কৌশিক গাঙ্গুলি যে ধরণের ছবি বানান, প্রান্তিক মানুষের যে গল্প বলেন তা সেখানে ছিল না। যেন একটা পার্ট বলা বাকি ছিল। সেই বাকি অংশটাই বলেছি ‘‌নগরকীর্তন’‌ ছবিতে। এই ছবিতে একটা কষ্টের জায়গা আছে। ‘‌আর একটি প্রেমের গল্প’‌ যদি একটা শ্বেত পাথরের সিঁড়ির কথা হয় তবে সেই সিঁড়ির নিচের অন্ধকারের গল্প হল এই ‘‌নগরকীর্তন’‌।’‌
‘‌আর একটি প্রেমের গল্প’‌র পর ‘‌নগরকীর্তন’‌। কৌশিক গাঙ্গুলি আর একবার ফিরে এলেন রূপান্তরকামীদের গল্প নিয়ে। কিন্তু কীভাবে এই গল্পের বিষয় ভাবনা এল কৌশিকের কাছে?‌ ‘‌গাড়ি যখন জ্যামে আটকে যায় তখন ওঁরা আসেন। জানলায় টোকা মারেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই সুন্দরী। কিন্তু আমরা তখন হয় ঘুমের ভান করে থাকি বা মোবাইলে মন দিই। পাছে দশ টাকা দিতে হয়!‌ একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। রবীন্দ্র সরোবরে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সেই আভা এসে পড়ছে এরকম এক মানুষের গায়ে। একটা অপূর্ব ব্যাকলাইটের সৃষ্টি হয়েছে সেই অতীব সুন্দরীকে ঘিরে। গাড়ি যখন চলে যাচ্ছে তখনও পেছনের জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম ওঁর দিকে। সেখান থেকেই এই ছবির ভাবনা মাথায় আসে।’‌
এই ছবির গল্প বঁাশীবাদক মধু আর পুটিকে ঘিরে। এই পুটিকে সবাই ব্যঙ্গ করে ‘‌ছক্কা’‌ বলে। কিন্তু লুডো খেলতে বসলে তার ছক্কা পড়ে না। পড়ে শুধু পুট। সেখান থেকেই তার নাম ‘‌পরিমল’ থেকে হয়ে যায় পুটি। সেই পুটি আর মধুর মধ্যেই একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। তারই পর্দারূপ ‘‌নগরকীর্তন’‌।
কৌশিক বললেন, ‘‌এটা একটা প্রেমের গল্প। অতি সাধারণ একটা প্রেমের গল্প। যাকে বলে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। সামাজিকভাবে দুজনেই পুরুষ। কিন্তু একজনের মধ্যে নারীসত্তা প্রবল। এদের জীবনটাই কোথায় যেন অসাধারণ হয়ে উঠছে। ‘‌আর একটি প্রেমের গল্প’‌র পর এটাকে বলা যায় অন্যরকম প্রেমের গল্প।’‌
ছবিতে পুটির চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঋদ্ধি সেন। শুধু তাই নয়, এই চরিত্রে অভিনয় করে তিনি পেয়েছেন জাতীয় সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি। কীভাবে এই চরিত্রের জন্য ঋদ্ধির কথা মাথায় এল কৌশিকের?‌ ‘‌ঋদ্ধিকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। একজন অত্যন্ত পাওয়ারফুল ও বয়সের তুলনায় ম্যাচিওরড অভিনেতা। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম কীভাবে ঋদ্ধিকে ব্যবহার করা যায়। বাংলা ছবিতে তো জাতীয় সেরা অভিনেতার পুরস্কার খুব কমই এসেছে। আর ও মাত্র ১৯ বছর বয়সেই এই পুরস্কার পেয়ে গেল। ঋদ্ধির‌ আর নতুন করে কী অ্যাচিভ করার আছে জানি না। তবে ওকে বলেছি, জাতীয় পুরস্কারের কথা ভুলে যাও। একদমই মাথায় রেখো না। রাখলে তোমারই ক্ষতি।’‌
কীর্তন হল রাধাকৃষ্ণের ব্যালাড। রাধা আর কৃষ্ণের প্রেমের গান। আর সেই গানে লুকিয়ে থাকে মানুষের প্রাত্যহিক জীবন যন্ত্রণার কথা। এই ‘‌নগরকীর্তন’‌ও সেই কথা বলছে। তবে মধু আর পুটি যেহেতু এই শহরেরই মানুষ, তাই তাদের এই কীর্তনকে নাগরিক কীর্তন বলা যায়। তাই এই ছবিতে কীর্তনের সঙ্গে বাঁশী বাজে না, বাজে ক্ল্যারিওনেট। ছবিতে শুদ্ধ কীর্তনের ব্যবহার হয়েছে আর সেক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন অধ্যাপিকা শান্তা দাস।
 সেই ‘‌শব্দ’ থেকে শুরু করে ‘‌ছায়া ও ছবি’‌ বা ‘‌জ্যেষ্ঠপুত্র’‌। আর এবার ‘‌নগরকীর্তন’‌—চারটি ছবিতেই অন্যতম মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন কৌশিকের অন্যতম‌ প্রিয় অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী। কৌশিকের ভাষায়, ‘‌এই দেশের এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ঋত্বিক। বাংলা ছবিতে ওকে যত ব্যবহার করা হবে, তাতে বাংলা সিনেমাই উপকৃত হবে।’‌ সেই ঋত্বিক এই ছবিতে অভিনয় করেছেন ‘‌মধু’‌র ভূমিকায়। কেমন এই চরিত্র? ঋত্বিক বললেন, ‘‌মধু নবদ্বীপের ছেলে। তার পরিবারে কীর্তনের অনুসঙ্গ আছে। বাবা, মা, দাদা, বৌদি প্রত্যেকেই কীর্তনের সঙ্গে জড়িত। মধু একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টের ডেলিভারি বয়। কীর্তনে বাঁশী বাজায়। এই ছবি এই মধুর প্রেমের গল্প। মধুর যৌন চেতনা হয়ত আলাদা কিন্তু প্রেম তো আলাদা হয় না। প্রেমের অনুভূতি সব জায়গায় এক। যে মানুষ এই সম্পর্ক দেখে নাক সিটকোয়, সেটা আসলে তার সমাজকে দেখার দোষ।’‌
আগেই বলা হয়েছে ছবিতে ‘‌পুটি’‌র‌ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ঋদ্ধি সেন। জানালেন, ‘ছবিতে ঋত্বিকদার সঙ্গে অভিনয় করে বেশ আনন্দ পেয়েছি। দুটো চরিত্রেই বিভিন্ন স্তর আছে। সেই স্তর গুলো একসঙ্গে পেরোতে পেরোতে একটা সুন্দর অনুভূতি তৈরি হয়েছে।’‌ আর ঋত্বিক জানালেন, ‘‌ঋদ্ধি দারুণ অভিনেতা। একজন মানুষের কাছে একজন অভিনেতা একটা পছন্দের মার্কস পায়। কিন্তু সেই অভিনেতা যদি সহঅভিনেতা হয়, তাহলে তার মূল্যায়ণ হয় অন্যরকম। এই ছবিতে পরতে পরতে ওকে পেয়েছি সহঅভিনেতা হিসেবে। আর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকেছি। সব মিলিয়ে পুটি শুধু আমার ভালবাসার মানুষ নয়, সেটে সবারই ভালবাসার মানুষ হয়ে উঠেছিল পুটি।’‌ এই ছবি মুক্তি পাবে ১৫ ফেব্রুয়ারি।‌ ‌

ছবি: বিপ্লব মৈত্র

জনপ্রিয়

Back To Top