তপশ্রী গুপ্ত,বাল্টিমোর: বাংলাদেশের বিটলস বলে ভুবনজোড়া খ্যাতি যাদের, সেই মাইলস ব্যান্ডের বয়স হল ৪০। সেই উপলক্ষে তাদের আমেরিকা অভিযান শুরু হল বাল্টিমোর দিয়ে। ‘‌এটা কাকতালীয় যে বঙ্গ সম্মেলন এই সময় আমাদের ডাক পাঠিয়েছে। এখান থেকেই তাই শুরু করলাম। এবার পরপর আমাদের অনুষ্ঠান আছে মিশিগান, লস অ্যাঞ্জেলেস, আরও অনেক কটা শহরে।’‌ বাল্টিমোরের হোটেলে মধ্যরাতের সাক্ষাৎকারে জানালেন লিড গিটারিস্ট হামিন আহমেদ। পাঁচজনের দল নিয়ে সফর করছেন তাঁরা। পপ রক গানের জন্য তাঁদের ঘিরে বাংলাদেশের বাইরেও এত উন্মাদনা যে টিকিটের দাম আড়াইশো–‌তিনশো ডলার পর্যন্ত ওঠে। সেই জনপ্রিয়তা তাঁরা একদিকে যেমন উপভোগ করেন, তেমনই প্রতি মুহূর্তে নিজেদের ভেঙে গড়ার দায়বদ্ধতা থেকেও সরেন না। এমনকী নিজেদের সুপারহিট গানকেও অন্য মোড়কে পরিবেশনের ঝুঁকি নিতে পিছপা নন মাইলস সদস্যরা।
আসলে জন্মমুহূর্তেই অন্য ব্যান্ডের থেকে আলাদা হয়ে গেছিল মাইলস। সঙ্গীত জগতের দুই দিকপাল কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগম এদের প্রেরণা। তাঁদের দুই পুত্র শাফিন আহমেদ ও হামিন আহমেদ মাইলস ব্যান্ডের দুই স্তম্ভ। দুই ভাইয়ের স্মৃতিতে উজ্জ্বল, প্রথম গিটারটি কিনে এনেছিলেন মা ফিরোজা বেগম, কানাডা থেকে। ১৯৭৯ সালে যখন সবেমাত্র ব্যান্ডের কনসেপ্ট এল ভারতীয় উপমহাদেশে, বাংলাদেশে ডানা মেলল ফিডব্যাক আর মাইলস। প্রথমদিকে বাংলা গান গাইত না মাইলস। তারপর একসময় অনুরাগীদের চাপে আর কলকাতার ‘‌মহীনের ঘোড়াগুলি’‌র অনুপ্রেরণায় বাংলা গান গাওয়া শুরু। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
বাউলের মতো ব্যান্ডও তো শুধু গানবাজনা নয়, একটা যাপন, একটা দর্শন— এই কথা শুনে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন শাফিন আর হামিন। ‘‌ঠিক বলেছেন। এটা অনেকেই ভুলে যায়। একটা ফিলজফি ধরে না চললে কোনও ব্যান্ড বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। পুরনো আমলে যে আলকাপের দল ছিল, এই যে আমাদের বাউল বা ফকিরের দল, এরা সবাই নিজের নিজের দর্শন অনুযায়ী চলে। ইউ হ্যাভ টু লিভ অ্যাকর্ডিং টু দ্যাট ফিলজফি। না হলে গানের কথা, সুর কোনওটাই সৃষ্টি হবে না।’‌ এভাবেই কি সৃষ্টি হয়েছে মাইলস–‌এর তুমুল জনপ্রিয় সব গান— ‘‌নীলা তুমি কি চাও না হারাতে ওই নীলিমায়/‌যেখানে দুটি মন এক হয়ে ছবির মতো জেগে রয়’‌ কিংবা ‘‌প্রতিদিন দেখি অনেক চেনা মুখ/‌ তবু যেন বড় অচেনা’‌?‌ এই প্রশ্নের জবাবে একমত দলের পাঁচ সদস্য— ‘‌আমাদের জীবনযাপনের সঙ্গে মিশে আছে গান, শুধু গান। আমরা পরিবার থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। কিন্তু কী করা যাবে?‌‌ সুরের ভিতর একেবারে ডুব না দিলে গান তৈরি হয় না।’‌ এবার একটা অন্যরকম প্রশ্ন করা গেল হাফ সেঞ্চুরি থেকে দশ বছর দূরে দাঁড়ানো মাইলসকে— সাধারণের ধারণায় ব্যান্ড মানে অন্যরকম জীবনযাপন— বোহেমিয়ান, নানারকম নেশাভাং। কথার মাঝখানে লুফে নিলেন শাফিন— ‘‌ঠিক বলেছেন। নেশা করতে কারও ভাল লাগতেই পারে। নেশা যে কেউ করতে পারে। কিন্তু লাইফটাকে তো পজিটিভ দিক থেকে নিতে হবে। তা নয়তো কোনও ভাল কাজ করা যাবে না‌।’‌
ব্যান্ডের জন্য ফোক গাওয়া যে একটা সহজ অপশন, সোজাসাপটা বললেন হামিন। সঙ্গে এও জানালেন, ওই সোজা পথে হাঁটার লোভ তাঁরা ছেড়ে দিয়েছেন। ‘‌ফোক নিয়ে অনেক সিরিয়াস কাজ হয়ে গেছে। এখন আমরা কিছু করতে গেলে সেটা হবে জোক। অনেকে ফোক ফিউশন করছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়েও অনেক এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে। আমাদের ওসব ভাল লাগে না‌।’‌
এবারের প্রশ্ন তাঁদের প্রতিবেশী বাংলার ব্যান্ড নিয়ে। কলকাতার ব্যান্ডগুলো সম্পর্কে কী ধারণা?‌ শাফিন এক কথায় সেরে ফেলতে চাইলেন— তেমন শোনা হয়নি। হামিন কিন্তু স্পষ্ট বললেন, ‘‌আমি মনে করি গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের মহীনের ঘোড়াগুলির পর বাংলা ব্যান্ড আর খুব একটা এগোতে পারেনি। আসলে মণিদা ছিলেন মাচ অ্যাহেড অফ হিজ টাইম। তাই তাঁকে এখনও ছুঁতে পারেনি কেউ।’‌ তারপরই গলা মিলিয়ে বলে উঠলেন শাফিন, হামিন, জুয়েল, মানাম আর তূর্য— উই আর মাইলস ফ্রম বাংলাদেশ। গানের জাদু কার্পেটে চড়ে যাঁরা পাড়ি দিতে চান অনেক অনেক মাইল।‌

জনপ্রিয়

Back To Top