রাম মিত্র
এই তো সেদিনের কথা!‌ ভারতে তখন খুব একটা বেশি ভাল হোটেল ছিল না। তৎকালীন বোম্বে, আজকের মুম্বই শহরে আমরা সাধারণত জুহু বিচের হলিডে ইন হোটেলে উঠতাম। সেই হলিডে ইন (‌আজকের নোভোটেল, ‌জুহু বিচ)‌ হোটেলটা ছিল বোম্বে ফিল্ম দুনিয়ার মক্কা। সমস্ত নামজাদা ফিল্মস্টারদের ঘন ঘন যাওয়া আসা আর সর্বদা একটা না আর একটা ফিল্ম সেট দেখা যেত। সেই হোটেলের লবিতে তাই বহুবার অমিতাভ বচ্চন,‌ ঋষিজি, আমজাদ খান, নাসিরুদ্দিন শাহ আরও কত চেনা অচেনা শিল্পীদের দেখেছি। লবিতে কোনও দেহরক্ষী বা ভক্তদের ভিড় থাকত না। সকলেই সকলের দিকে তাকিয়ে, একটু হেসে অচেনা, কম নামী, বেশি নামী সকলকে হ্যালো বলে চলে যেতেন।
অনেক বছর আগে একবার দেশ থেকে সুইৎজারল্যান্ডে ফেরার পথে, কলকাতা হয়ে বোম্বে। এয়ার ইন্ডিয়ার প্লেন। সেটা আশির দশকের প্রথম দিক। দেশ ছাড়ার সময় ভারতবর্ষে বিদেশি মুদ্রার হাহাকার চলছিল। তাই দেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ের কথা মাথায় রেখে সব সময় এয়ার ইন্ডিয়ার টিকিট কাটতাম। ভাবতাম, হয়তো এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে একদিন দেশের কলসি ভরবে।
সেই সময় খুব বেশি মানুষের বিদেশ যাবার সুযোগ হত না। এত বেশি এয়ারলাইন্সও ছিল না। ফলে প্লেনগুলো ভর্তি থাকত না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ভারত থেকে ইওরোপ যাবার প্লেনগুলোতে অন্তত প্রতি যাত্রীর জন্য ২ থেকে ৩টি বসার জায়গা খালি থাকত। মানুষ শুয়ে বসে, আড্ডা দিয়ে, ভালমন্দ খেতে খেতেই যে–‌যার গন্তব্যে যেতে পারত। সেবার সন্ধে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এয়ারপোর্টে বসে যখন শেষ রাতে প্লেনে ওঠার সময় এসেছে, স্বাভাবিক ভাবে সকলে খুব ক্লান্ত। কখন যে পুরো তিনটে সিটের জায়গা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই।
হঠাৎ করে আমার পিছনের সিটে শুয়ে থাকা কোনও এক যাত্রীর ঘন ঘন কাশির আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। আর ঘুমোতেই পারলাম না। সমানে ওই খুকখুকে কাশি, আর তার সঙ্গে সিগারেট আর মদের উৎকট গন্ধ। সেই সময় আমি মদ খাওয়া ব্যাপারটা খুব ভাল জানতাম না বলেই গন্ধটা আরও অসহ্য লাগছিল। তবুও শুয়ে বসে একটু ঝিমঝিম ভাবের মধ্যে অনেকটা সময় কেটে গেল। হঠাৎ করে ‘‌স্যর’‌ আওয়াজে পুরোপুরি জেগে উঠলাম। সামনে এক এয়ার হোস্টেস, হাতে গরম রুমাল নিয়ে দাঁড়িয়ে। রাতের নিদ্রা তাড়িয়ে ব্রেকফাস্টের প্রস্তুতি চলছে। ধীরে ধীরে সমস্ত প্লেনটাই আলোয় আলোয় ভরে উঠল। বন্ধ থাকা জানলার ঢাকনা খুলে দিতে সূর্যের আলোও ভিতরে আসছে। আমার কৌতূহল হল দেখতে, আমার পিছনে ওই ভদ্রলোক কে?‌ যাঁর সামান্যতম স্বাস্থ্য সচেতনতা নেই। তার মধ্যে সমস্ত রাত সিগারেট আর হুইস্কি খেয়ে গেলেন?‌ ঘাড়টা ঘুরিয়ে দেখলাম, একজন সুন্দর, ফর্সা বয়স্ক মানুষ, খুব চেনা এক ভদ্রলোক লাল মুখে বসে হাঁপাচ্ছেন। আর মাথাটা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কিছু সময় বাদে ব্রেকফাস্ট সার্ভিস চালু হতেই মুখটা যেন আর অচেনা রইল না। হঠাৎ করে দু’‌তিন জন মানুষ এসে তাঁর পাশে বসলেন। তার মধ্যে একজনকে আমি খুব ভালভাবে চিনতে পারলাম। হিন্দি ছবির জনপ্রিয় তারকা, ঋষি কাপুর। কৌতূহলবশে একটু ঘাড়টা ঘুরিয়েই বসলাম। ওঁদের কথোপকথন শোনার জন্য। এবার বুঝতে পারলাম, আমার সহযাত্রী  আর কেউ না, স্বয়ং রাজ কাপুর। জানতে পারলাম, তিনি পরিবার–‌সহ চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাচ্ছেন।
তারপর ব্রেকফাস্ট শেষ হতে যখন সমস্ত টেবিল পরিষ্কার হয়ে গেল, শুরু হল যেন বলিউডের ফটো শুট। এয়ার হোস্টেসরা এবং সঙ্গে আসা পরিবারের মানুষগুলো যেন ব্যক্তিগত হাওয়াই জাহাজ মনে করে দৌড়োদৌড়ি, হুড়োহুড়ি করে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। অস্বস্তি হয়েছিল। জানি না যে ক’‌জন বিদেশি যাত্রী ছিলেন তাঁরা কী ভাবছেন!‌ কেউই অন্য যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভাবছিলেন না।
ঋষি কাপুরের হঠাৎ মৃত্যু জাগিয়ে দিল এই স্মৃতি। ভারাক্রান্ত বোধ করলাম। ৬৭ বছর সময়ের হিসেবে তো কিছুই নয়। মানুষের হৃদয় জয় করা সেই হাসি মুখখানা মিলিয়ে গেল। চলে গেলেন ঋষি কাপুর। এমন সর্বপ্রিয় মানুষকে ভাল করে বিদায় নেওয়ার সুযোগটা পর্যন্ত দিল না করোনা।

জনপ্রিয়

Back To Top