অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: ‘‌জীবনভর মেঘনাদ’‌। এই শিরোনামে শ্যামবাজার মুখেমুখি পাঁচদিনের নাট্যৎসব করল আকাদেমি আর গিরিশ মঞ্চে। ২ জুন আকাদেমিতে ছিল ‘‌সারাদিন মেঘনাদ’‌। সকাল, বিকেল, সন্ধ্যায় তিন-‌তিনটি নাটক মঞ্চস্থ হল মেঘনাদ ভট্টাচার্যর পরিচালনায়, ‘‌দামিনী হে’‌, ‘‌ভালো লোক’‌ আর ‘‌দায়বদ্ধ’‌। যেখানে প্রধান ভূমিকাতেও তিনি। ওইদিন শেষ নাটক ছিল ‘‌দায়বদ্ধ’‌, যা গত ২৮ বছর ধরে সমান জনপ্রিয়। এদিনও ৬৯৪তম শো ছিল হাউসফুল। পরের দিন আকাদেমিতেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় এই প্রথম অভিনয় করলেন মেঘনাদ, ‘‌সব জান্তা’‌ নাটকে। বিলু দত্তর উদ্যোগে ‘‌শ্যামবাজার মুখোমুখি’‌-‌র ২৩ বছরের জন্মোৎসবে দর্শক যেন নতুন করে আবিষ্কার করলেন মেঘনাদ ভট্টাচার্যকে। আর একবার ‘‌দায়বদ্ধ’‌ দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে পরের দিন আমরা মেঘনাদ ভট্টাচার্যর মুখোমুখি, তাঁর বাইপাস সংলগ্ন চার তলার ফ্ল্যাটে।
• ৬৯৪তম শো-‌তেও ‘‌দায়বদ্ধ’‌ আকাদেমিতে হাউসফুল। ২৮ বছর ধরে এই জনপ্রিয়তা তো বিস্ময়কর।
•• আমি বাংলা নাটকের দর্শকদের কাছে কৃতজ্ঞ এই ভালবাসার জন্যে। কিন্তু, আমি একটা কথা জানতে চাই। সত্যি কথা।
• হ্যাঁ, বলুন।
•• তুমি তো ‘‌দায়বদ্ধ’‌ আগেও দেখেছ। এদিনও দেখলে। আচ্ছা, ‘‌দায়বদ্ধ’‌র জান আছে তো?‌
• কেন একথা জিজ্ঞেস করছেন?‌ নাটক হাউসফুল। হাততালি আর উচ্ছ্বাসের আঁচ তো আপনিও পেয়েছেন?‌
•• তা পেয়েছি, কিন্তু যারা আগে ‘‌দায়বদ্ধ’‌ দেখেছেন, আমার চেনা-‌শোনা হলে আমি জিজ্ঞেস করি, এখনও এ নাটকের জান আছে কী না!‌
• কেন জিজ্ঞেস করেন?‌
•• আসলে, দীর্ঘদিন ধরে একটা নাটক অভিনীত হতে থাকলে অনেক সময় মেকানিক্যাল হয়ে যায়। ক্লিশে হয়ে যায়। থিয়েটারে তো দর্শকের সঙ্গে অভিনেতাদের এনার্জির আদান-‌প্রদান হয়। সেই দেওয়া-‌নেওয়াটা সমানতালে হওয়া দরকার। বারবার অভিনয় করতে করতে যদি অভিনেতাদের এনার্জি কমে যায়, তাহলে নাটকের জান থাকে না। একই কথা, একই সংলাপ বারবার বলতে বলতে অভিনেতাদের এনার্জি কমে যেতে পারে। সেজন্যেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, জান আছে তো?‌
• অবশ্যই জান আছে ‘‌দায়বদ্ধ’‌য়। কিন্তু সেই জান-‌টা, সেই এনার্জিটা, আপনি, এই নাটকের প্রধান চরিত্র ‘‌গগন’‌ হয়ে কীভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন?‌
•• এই নাটকে আমি আর কাজের মেয়ের অভিনেত্রী ২৮ বছর ধরে একই আছি। আমি আর সন্ধ্যা। বাকি সব চরিত্রের শিল্পীই বদল হয়েছে। সীতা চরিত্র আগে বেবি সরকার করতেন, এখন করছেন রুণা মুখার্জি। এখন যে আমাদের মেয়ে ‘‌ঝিনুক’‌ করছে, সেই রিমঝিম তো ষষ্ঠ ঝিনুক। ‘‌ঝিনুক’‌ আগে করেছে মৌসুমী সাহা, স্বাগতা মুখার্জি, পিয়ালি মিত্র, ইন্দ্রজিতা চক্রবর্তী, তুহিনা চক্রবর্তী। ১৮ বছরে তো সবারই বয়স বাড়ছে, কিন্তু ঝিনুকের তো বয়স বাড়েনি। ফলে শিল্পীও পাল্টেছে। তাতে একটা সুবিধে হয়, যে নতুন করে চরিত্রটা করছে, সে তো নতুন নাটকেই অভিনয় করছে। তার এনার্জির অভাব হবে না।
• কিন্তু ‘‌গগন’ চরিত্রে ২৮ বছর ধরে কীভাবে জান বাঁচিয়ে রেখেছেন মেঘনাদ ভট্টাচার্য?‌
•• আসলে, একটা সত্যি কথা বলি, এই লরির ড্রাইভার গগনের সঙ্গে আমার এত মিল, গগনের বক্তব্যের সঙ্গে, কথার সঙ্গে আমি এতটাই সহমত যে, মঞ্চে অভিনয় করতে করতে আমি ‘‌গগন’‌ হয়ে যাই। গগনের সবক’‌টা অনুভূতি আমার অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে আমি সোচ্চারে গগনের কথা আমার নিজের কথা হিসেবে বলতে পারি। এটাই মঞ্চে গগনকে জীবন্ত রেখেছে। ওই গগন আসলে আমি।
• এত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও ‘‌দায়বদ্ধ’ নিয়ে কিন্তু সমালোচনা কম হয়নি।
•• খুবই সমালোচনা হয়েছে। তথাকথিত বিদগ্ধ লোকজন বলেছেন, খুবই আবেগতাড়িত একটা নাটক ‘‌দায়বদ্ধ’। আসলে সেই ২৮ বছর আগে, ১৯৯১ সালে, ‘‌সায়ক’‌ একটা নতুন দল। সেই নতুন দলে একটা নাটক বিজ্ঞাপন দেওয়ার একদিনের মধ্যে হাউসফুল হয়ে যাচ্ছে, এই ব্যাখ্যাটা ছিল না তথাকথিত ‘‌বিদগ্ধ’‌ নাট্যবোদ্ধাদের। কেন দর্শক এভাবে নিচ্ছে নাটকটাকে?‌ তারা বলতে শুরু করলেন, এক্সটেনশন অফ পেশাদার রঙ্গালয়। এই বলাটা কিন্তু পেশাদার রঙ্গালয়কে ছোট করে বলা হত। এইসব‌‌‌ সমালোচকরা ছিলেন উন্নসিক। তাঁরা ভাবতেন, ব্রেখট, ইবসেনের নাটক না করে কোনও গ্রুপ থিয়েটার জাতে উঠতে পারে না। পেশাদার থিয়েটার বিমল মিত্র নিয়ে নাটক করে, আশাপূর্ণ দেবীর লেখা নিয়ে নাটক করে, ফলে তারা পাতে দেবার যোগ্য নয়!‌ কী আশ্চর্য যুক্তি!‌ আমরাও কি ভাবতে পেরেছিলাম, ‘‌দায়বদ্ধ’‌ এমন জনপ্রিয় হবে?‌ কিন্তু গুটিকয় শো-‌কলড্‌ বিদগ্ধ নাট্যবোদ্ধার সমালোচনা দর্শকদের মধ্যে কোনও ছাপ ফেলেনি। তাঁরা উজাড় করে ভালবেসেছেন ‘‌দায়বদ্ধ’‌কে।
• এর কারণটা কী, ভেবে দেখেছেন?‌
•• আসলে, থিয়েটার থেকে মানুষ একটা কনসেপ্ট নিয়ে বাড়ি ফেরে। দায়বদ্ধ-‌র কনসেপ্ট হল পিতৃত্ব। এই নাটক পিতৃত্বের সংজ্ঞা পাল্টে দেয়। শুধু জন্ম দিলেই পিতা হওয়া যায় না। গগন জানে, লরিটা যখন আমি চালাই, লরিটা আমার। তেমনি, মেয়েটাকে যখন আমি মানুষ করেছি, তখন মেয়েটা আমার। এই যে গভীর মানবিক মূল্যবোধ, এটাই স্পর্শ করেছে দর্শকদের।
• কিন্তু গুটিকয়েক তথাকথিত বিদগ্ধ নাট্যবোদ্ধাকে বাদ দিলে, কাগজে-‌পত্রে তো প্রশংসিতই হয়েছিল দায়বদ্ধ?‌
•• হ্যাঁ, খুবই প্রশংসিত হয়েছিল। সমরেশ মজুমদার দেশ-‌এ লিখেছিলেন, তাঁর দেখা শ্রেষ্ঠ পাঁচটি নাটকের একটা ‘‌দায়বদ্ধ’‌। বিভাসদা (‌বিভাস চক্রবর্তী)‌ যথেষ্ট প্রশংসা করে রিভিউ লিখেছিলেন। আর, দর্শকদের উচ্ছ্বাস তো আজও টের পাই। ভারতবর্ষের সব কটা শহরে করেছি ‘‌দায়বদ্ধ’‌। আমেরিকায় ১৮টা শহরে এই নাটক অভিনীত হয়েছে। একই রকম প্রতিক্রিয়া দর্শকদের।
• এই নাটক থেকেই নাট্যকার চন্দন সেন আর পরিচালক মেঘনাদ ভট্টাচার্যর জুটি অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেল?‌
•• ‘‌দায়বদ্ধ’‌ আমাদের জুটিটাকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দিল। আসলে, এই নাটকে কনসেপ্ট, স্ক্রিপ্ট, পরিচালনা, অভিনয়—সবকিছুরই একটা দুর্দান্ত মেলবন্ধন ঘটেছিল। এটা কীভাবে হয় কেউ-‌ই জানে না। তবে, তার আগেও আমরা চন্দন সেনের নাটক করেছি। ১৯৭৯ সালে ‘‌দুই হুজুরের গপ্পো’‌ দিয়ে শুরু। এই নাটকের ৩৫৪টা শো হয়েছে, পরিচালক হিসেবে এটাই আমার প্রথম সফল কাজ বলা যায়। সায়ক-‌এ এটা আমার দ্বিতীয় পরিচালনা।
• প্রথম নাটক কী ছিল?‌
•• ‘‌নরমেধ’‌।
• নাটকটা কি চলেনি?‌
•• একেবারেই চলেনি। পাঁচটা শো হয়েছিল। আসলে, হাতে কলমে প্রথম কাজ। অনেক খামতি ছিল।
• ‘‌দায়বদ্ধ’‌-‌র পরেই করেন ‘‌বাসভূমি’‌। সেটাও তো বেশ সফল।
•• হ্যাঁ, ২৮৩টা শো হয়েছিল। তারপর অমৃতা প্রীতমের গল্প নিয়ে চন্দনদার নাটক ‘‌কর্ণাবতী’‌। সেটাও দেড়শ-‌র ওপর শো হয়েছে। আসলে, ‘‌দায়বদ্ধ’‌, ‘‌বাসভূমি’ আর ‘‌কর্ণাবতী’—‌এই ট্রিলজি সায়ককে বিরাট জায়গা দিয়েছে দর্শকদের কাছে।
• এই তিন নাটককে ট্রিলজি ভাবার কারণ কি নারীরাই এর চালিকাশক্তি?‌
•• হ্যঁা, তিনটি নাটকে তিন নারীর‌‌ নিজস্বতার জায়গা আছে। তাদের আইডেন্টিটি বা আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার কথাই নাটকের মূল বার্তা। ‘‌দায়বদ্ধ’‌-‌য় সীতা, ‘‌বাসভূমি’‌তে হৈমন্তী, ‘‌কর্ণাবতী’‌র কুসুম্বি সেই তিন আত্মপরিচয় খুঁজে নেওয়া নারী। আর একটা বিরাট জিনিসও আবিষ্কার করেছি এই তিনটি নাটক থেকে।
• কী সেই আবিষ্কার?‌
•• মহিলাদের ভাল না লাগলে কোনও নাটক চলে না। সিনেমাও তাই। মেয়েদের যদি ভাল লাগে, তাহলে তাঁরা আরও দশজন দর্শক নিয়ে আসবেন। বরটাকে তো আগে দেখাবেন।
• সায়ক-‌এর আগে কোন নাট্যদলে ছিলেন?‌
•• ‘‌শিল্প ও শিল্পী’‌। এখানে গৌর ভদ্র ছিলেন ডিরেক্টর। এই দলে অভিনয় করতেন বুদ্ধবাবু (‌প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য)‌। বুদ্ধবাবুর লেখা ‘‌বিজয়ের অপেক্ষায়’‌ নাটকে এখানে আমি প্রথম অভিনয় করি। মোহিতদার (‌মোহিত চট্টোপাধ্যায়)‌ ‘‌বাজপাখি’ নাটকে বুদ্ধবাবু অভিনয় করতেন। ভাল অভিনয় করতেন উনি। ‘‌শিল্প ও শিল্পী’‌ এবং ‘‌সন্ধিক্ষণ’‌ ছিল আমার সিরিয়াস নাটকের হাতেখড়ির জায়গা। এখানে গৌর ভদ্রের কাছে আমি থিয়েটারের ব্যাক স্টেজের কাজ, কুলিগিরি শিখি ৬৮ থেকে ৭৩ পর্যন্ত, ৫ বছর।
• আর পরিচালনার কাজ কার কাছ থেকে শিখলেন?‌
•• ব্যাকস্টেজের কাজও তো পরিচালনার প্রথম পাঠ। তারপর আমরা তো ‘‌সায়ক’‌ তৈরি করি। এখানে শিশির বসু ছিলেন পরিচালক। ৭৩ থেকে ৭৮—এই পাঁচ বছর আমি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করি, কাজ শিখি। ১০ বছর শিক্ষানবিশীর পরে ‘‌সায়ক’‌-‌এর পরিচালক। প্রথম নাটক ‘‌নরমেধ’‌ ফ্লপ। দ্বিতীয় ‘‌দুই হুজুরের গপ্পো’‌-‌তে পরিচালক হিসেবে গৃহীত হলাম দর্শকদের কাছে। তারপর ‘‌জ্ঞানবৃক্ষের ফল’‌, ‘‌সোনার মাথাওলা মানুষ’‌, ‘‌যদিও স্বপ্ন’‌ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম ‘‌দায়বদ্ধ’‌ নাটকে। (‌হাসতে হাসতে)‌ সেই দায় ২৮ বছর বাদেও বহন করছি।
• যখন ‘‌সায়ক’‌ শুরু করেন, তখনও বাংলার নাট্যজগতে তিন কিংবদন্তী কাজ করছেন। শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত এবং অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই প্রেক্ষাপটে কী করে সাহস পেলেন নতুন একটা নাট্যদল ‘‌সায়ক’‌ তৈরি করার?‌
•• পঁচিশ-‌ছাব্বিশ বছর বয়সে ওইরকম সাহস থাকে। আসলে, উত্তর কলকাতায় বড় হয়েছি তো। হাতিবাগানের পেশাদার থিয়েটারের পোকা ছিলাম আমি। এমন কোনও পেশাদার থিয়েটার ছিল না, যা আমি দেখিনি। অন্যদিকে অজিতেশদার সব নাটক দেখেছি। শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত দেখেছি।
• পেশাদার এবং গ্রুপ থিয়েটার, দুটো ধারাকে কি মেশানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন?‌
•• একদম তাই। পেশাদার থিয়েটারকে অনেকে, মানে, তথাকথিত বিদগ্ধ নাট্যবোদ্ধারা ছোট করে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু পেশাদার থিয়েটারের দর্শকরা অসাধারণ। সেখানে অ্যাডভোকেটের পাশে মুদির দোকানদার, অধ্যাপকের পাশে গৃহবধূ বসে নাটক দেখছেন। সেখানে অসাধারণ সব অভিনেতা। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, ওখানে ভাল ডিরেক্টরের অভাব। আধুনিক আঙ্গিকে নাটককে উপস্থাপন করার মতো পরিচালকের অভাব ছিল। অথচ, বিশ্বরূপায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘‌ন্যায়মূর্তি’‌ হয়েছে, যা একইসঙ্গে পেশাদার ও আধুনিক। ফলে, পেশাদার রঙ্গালয়ের প্লাস পয়েন্টগুলোকে সঙ্গে রেখে নাটক করার স্বপ্ন দেখেছি আমি। গুটিকয় নাক-‌উঁচু মানুষ নয়, অসংখ্য হৃদয়বান দর্শক-‌ই ছিল আমার লক্ষ্য।
• ‘‌বিজন থিয়েটার’‌ তৈরি করেছিলেন আপনারা। এটাও তো একটা দুঃসাহস?‌
•• কম বয়সে দুঃসাহস থাকে।
• এই দুঃসাহসটা হঠাৎ কীভাবে প্রকাশ পেল?‌ একটা থিয়েটার হল তৈরি করার দুঃসাহস?‌
•• আসলে, শিশির মঞ্চে আমাদের সায়কের জন্যে একটা ‘‌ডেট’‌ চাইতে গিয়েছিলাম। শিশির মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত এক নামকরা পরিচালক বলেছিলেন, আগে নাটক করতে শেখো, তারপর শিশির মঞ্চ পাবে। ওখান থেকে বেরিয়ে সায়কের বন্ধুদের বললাম, চল একটা থিয়েটার হল তৈরি করি। দুই বন্ধুর বাবা ৫০ হাজার টাকা করে দিলেন। জায়গাটা ছিল খাটাল। ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে লিজ নিলাম আমরা। মাসে মাসে দেড় হাজার টাকা ভাড়া দিতেই দম বেরিয়ে যেত। হল তৈরি করার জন্যে ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে ধরণা দিয়েছি। লিজ-‌এর জমি, তাই কেউ টাকা দিচ্ছিল না। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাঙ্কের মিস্টার পাল করুনাবশত আমাদের লোন দিলেন। শেখরদা (‌শেখর‌ চট্টোপাধ্যায়)‌ প্রথম ৯ বছর এখানে বেস্পতি, শনি, রবি নাটক করলেন ‘‌থিয়েটার ইউনিট’‌ থেকে। এতে আমরা দম পেলাম। বাকি দিনগুলো গ্রুপ থিয়েটারের। অনেক টানাপোড়েন গেছে। চালাতে পারছিলাম না। প্রচুর ধার দেনা হতে থাকে। ২০০৯ পর্যন্ত চালিয়েছি। ২০১৬ থেকে বিজন থিয়েটার অন্য হাতে। আর পারলাম না। ব্যর্থ হয়ে গেলাম।
• কিন্তু উদ্যোগটা তো আন্তরিক এবং দৃষ্টান্তযোগ্য।
•• এই কথাটা বলার জন্যে ধন্যবাদ। চেষ্টাটা জেনুইন ছিল। দুঃসাহসটাও সৎ ছিল। তবে, আলটিমেটলি ব্যর্থ।
• এবারের এই উৎসবেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় প্রথম অভিনয় করছেন ‘‌সবজান্তা’‌য়। কেমন অনুভূতি?‌
•• সৌমিত্রদাকে সেই ছোট থেকে মঞ্চে দেখে আসছি পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবে। এতদিনে কাজ করার সুযোগ হল। অবশ্যই অভিনেতা মেঘনাদ ভট্টাচার্যর এটা একটা বড় প্রাপ্তি।
• আপনি তো ব্রাত্য বসুর পরিচালনাতেও কাজ করেছেন ‘‌কন্যাদান’‌ নাটকে। অসাধারণ প্রোডাকশন ছিল।
•• সত্যিই দারুণ নাটক। দারুণ পরিচালনা ছিল ব্রাত্যর। একসঙ্গে অভিনয়ও করলাম ‘‌কন্যাদান’‌-‌এ।
• অন্য পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার সময় এবং সুযোগ তো কম আপনার?‌
•• হ্যাঁ, সায়কের নিজস্ব প্রযোজনার সব কাজকর্ম তো আমাদের। আমাকে অনেক সময় দিতে হয়। তবে উৎপলদার পরিচালনায় ‘‌চৈতালি রাতের স্বপ্ন’‌ করেছি, বিভাসদার পরিচালনায় ‘‌বলিদান’‌, ‘গাজি সাহেবের কিস্‌সা’‌। শিব মুখার্জির পরিচালনায় ‘‌মহাভারত’‌-‌এ কর্ণ করেছি। ব্রাত্যর ‘‌কন্যাদান’‌ তে আছেই। এবার সৌমিত্রদার পরিচালনায় ‘‌সব জান্তা’‌ করলাম।
• অন্য পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নিজের পরিচালক সত্ত্বা উঁকিঝুঁকি দেয়?‌
•• একদম না। অভিনেতা হিসেবে আমি একজন পরিচালকের কাছে নিঃশর্ত আনুগত্য নিয়ে থাকি।
• বহু নাট্যদলই বলে থাকে, থিয়েটারে এখন লোক হয় না। এটা কতটা সত্যি?‌‌
•• এটা পুরোপুরি সত্যি। যে পরিমান দল বেড়েছে, ভাল প্রযোজনাও বেড়েছে, সেই পরিমান দর্শক বাড়েনি। খুব বেশি হলে এখন ৩০/‌৩৫টা শো হলেই বলা হচ্ছে নাটক সুপারহিট!‌ অথচ ‘‌মাধব মালঞ্চী কইন্যা’‌, ‘‌সাজানো বাগান’‌, ‘‌মারীচ সংবাদ’‌, ‘‌জগন্নাথ’, ‘‌দায়বদ্ধ’‌, ‘‌বাসভূমি’‌ ইত্যাদি কিছু নাটক লাগাতর চলেছে। কিন্তু সেই পরিস্থতি আজ আর নেই। অথচ বেশ কিছু ভাল দল ভাল প্রযোজনা করছে। কিন্তু দর্শক কোথায়?‌ একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রান্ট বা অনুদানের দিকে তাকিয়ে একটার পর একটা দল তৈরি হচ্ছে। এখন যদি কেন্দ্রীয় সরকার বলে গ্রান্ট আর দেব না, তাহলে একটার পর একটা নাট্যদল তো মুখ থুবড়ে পড়বে। এই গ্রান্ট মুখাপেক্ষী হয়ে থাকাটা থিয়েটারের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। পেশাদার রঙ্গালয় আমাদের শিখিয়েছে, নিজের ব্যবস্থা নিজে করো। আমরা পেশাদার থিয়েটারকে গালাগাল দিয়েছি, কিন্তু তাদের ভাল দিকটা শিখিনি। হাতিবাগানে ৮টা থিয়েটার হলে সপ্তাহে ৪৮ হাজার দর্শক আসতেন। সেটা বেড়ে এখন তো ৯৬ হাজার হওয়ার কথা। কিন্তু সারা সপ্তাহে আমাদের থিয়েটারে সব মিলিয়ে ১২ হাজার দর্শকও হচ্ছে না।
• তাহলে বাংলা থিয়েটার কীভাবে এগোবে?‌
•• এভাবে গ্রান্ট মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে বাংলা থিয়েটার বাঁচবে না। এটা ঠিকই, মানুষের এখন বিনোদনের অনেক অপশন। বাড়িতে টিভি আছে, বাইরে শপিং মল। এদিকে হল ভাড়া আর কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে নাটকের দলের পুঁজি শেষ। নিয়মিত থিয়েটার চালানোটাই এখন সঙ্কটের। আমার মনে হয়, থিয়েটারের চলতি ফর্ম্যাট-‌টা পাল্টানো দরকার। চেঞ্জ দরকার। এখন কল শো কমে গেছে। অফিস ক্লাব গুলো আগের মতো নাটকের দলকে ডাকছে না। বাংলা থিয়েটার তো এখন সম্পূর্ণ পরাধীন হয়ে গেছে। শুধু পরমুখাপেক্ষী হয়ে থিয়েটার চলতে পারে না। আমাদের একটা নিজস্ব ‘‌স্পেস’‌ দরকার। চলতি ফর্ম্যাটে চললে, চলতি সিস্টেম-‌এ চললে বাংলা থিয়েটার বাঁচবে না। বাংলা থিয়েটারকে বাঁচানোর জন্য অন্য কোনও পথ চাই। এটা আমাদের সন্ধান করতে হবে। আমাদের থিয়েটারকে স্বনির্ভর হতে হবে। তা না হলে সত্যিই বঁাচবে না‌ আমাদের বাংলা থিয়েটার। আমি নিরাশের দলে নই। এখনও স্বপ্ন দেখি বাংলা থিয়েটারকে বাঁচানোর। পথটা কী, সেটা আমি জানি না। কিন্তু পথটা খুঁজতে চাই।
কথা বলতে বলতে বিষন্ন লাগে মেঘনাদ ভট্টাচার্যকে। এদিনই সন্ধ্যায় আকাদেমিতে তিনি অভিনয় করবেন ‘‌সব জান্তা’‌ নাটকে। কিন্তু বাংলা থিয়েটারকে বাঁচানোর পথটা তাঁর জানা নেই। তবে, আশা ছাড়ছেন না। স্বপ্ন দেখছেন দায়বদ্ধ এক থিয়েটার-‌মানুষ।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘‌সব জান্তা’‌য় পৌলমী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

জনপ্রিয়

Back To Top