সম্রাট মুখোপাধ্যায়: খুব একটা খুশি মনে নেননি সিদ্ধান্তটা, যখন উত্তমকুমার শুনেছিলেন এবার তাঁর লিপে গান গাইতে আসছেন মান্না দে। ছবির নাম ‘‌শঙ্খবেলা’‌। সালটা ১৯৬৬। উত্তম–‌হেমন্ত জুটি আর আগের মতো অটুট অবস্থায় নেই, তা পত্রপত্রিকা মারফত জেনে গেছে সবাই। শ্যামল মিত্র গান গাইছেন উত্তমের গলায়। বড় হিটও দিয়েছেন ‘‌দেয়ানেয়া’‌–‌য়। তবু এবার ‘‌এন্ট্রি নিলেন মান্না দে। বিশেষত এ ছবির সুরকার সুধীন দাশগুপ্তের উদ্যোগে।
সুধীনবাবুর আসলে মান্না দে–‌র ওপরে একটা বাড়তি দুর্বলতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল ‘‌ডাক হরকরা’‌ ছবির জন্য। ওই ছবিতে আসলে সুধীনবাবুর সুরে তরুণ গায়ক মান্না দে ‘‌ওগো তোমার শেষ বিচারের আশায়’‌ গানটি এমন দরদ দিয়ে গেয়েছিলেন যে, তা শুনে স্বয়ং গীতিকার সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কেঁদে ফেলেছিলেন।
প্রযোজক–‌পরিবেশকদের তরফে দাবি ছিল, ‘‌প্লে ব্যাক’‌টা শ্যামল মিত্রই করুন এ ছবিতে। কিন্তু সুধীনবাবু গোঁ ধরে থাকেন। সেই সময় মান্না দে–‌ও মুম্বইতে থাকেন। সুধীন দাশগুপ্ত হাজির হলেন সেখানে। সেই প্রবাসেই গান রেকর্ড হল। এতে অন্য একটা সুবিধাও হল। এই ছবিতে মান্না দে–‌র সঙ্গে ‘‌ডুয়েট’‌ করার কথা লতা মঙ্গেশকরের। মুম্বইতে রেকর্ড হওয়ায় দুজনে এক সঙ্গে হতে পারলেন দ্রুত। গানটি হল ‘‌কে প্রথম কাছে এসেছি’‌। বাংলা রোমান্টিক ডুয়েটের যে কোনও সমৃদ্ধ সঙ্কলনে যে গান হেঁটে হেঁটে ঢুকে পড়বে।
গান রেকর্ডিংয়ের আগে একটু সমস্যা হয়েছিল। লতার সঙ্গে যেদিন কথা বলা হল, পরদিন গান রেকর্ড করা হবে বলে, জানা গেল, পরের দিন নৌশাদ সাহাবের সুরে রেকর্ডিং আছে তাঁর। একটাই পথ আছে আর। সকাল ১১টায় নৌশাদের রেকর্ডিং শুরু। তার আগে লতাকে গানটা করিয়ে যদি ছেড়ে দেওয়া যায়। উদ্যোগী হলেন স্বয়ং মান্না দে। নিজে লতার বাড়ি গিয়ে বোঝালেন। নিজের সব কাজ ছেড়ে সকাল সাতটায় স্টুডিওয় ঢুকলেন, যাতে লতার সময় নষ্ট না হয়। আর এত হ্যাপা নিয়েছিলেন মান্না দে একটাই কারণে, উত্তমকুমারের লিপে তাঁকে গাইতেই হবে। এ তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন।
এর আগে উত্তমের দুটি ছবিতে গান গেয়েছেন মান্না দে। ‘‌গলি থেকে রাজপথ’‌ ও ‘‌লালপাথর’‌। কিন্তু সে তৃষ্ণা মেটেনি। উত্তমকে ভুল বোঝানোর লোকের কিন্তু অভাব ছিল না। তাঁরা উত্তমকে উস্কেছিলেন নিজের গলায় মান্না দে–‌কে গাওয়ানোর ব্যাপারে আপত্তি করতে। মান্না দে–‌র জোয়াড়ি–‌পূর্ণ রাগপ্রধান ভাঁজা গলা তাঁর গলার সঙ্গে কতটা খাপ খাপে তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন উত্তম। কিন্তু তাঁর ‘‌প্রফেশনালিজম’‌ তাঁকে আটকেছিল কোনও পছন্দ জানানোর ব্যাপারে।
ভাগ্যিস জানাননি। জানালে ‘‌আমি আগন্তুক আমি বার্তা দিলাম’‌ এমন ঘোষণা করতে পারতেন কি মান্না দে? ‘‌প্লেব্যাক’‌–‌এর নতুন ‘‌প্রিন্স’‌।
বেশিদিন স্থায়ী
বছর ঘুরতে না ঘুরতে তো ‘‌অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’‌। অনিল বাগচির সুরে কবিগান, হাফ আখড়াই গান। উত্তমের পক্ষেও এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ এতদিন মূলত রোমান্টিক গানে লিপ দিয়ে হিট করিয়েছেন তিনি। এবার পুরাতনি। তার সঙ্গে সাহেবি উচ্চারণের জের থেকে গেছে তা বোঝানোর মতো বিশ্বস্ত অভিব্যক্তি আনতে হল উত্তমকে এবার। তা না হলে ‘‌আমি যামিনী তুমি শশী হে’‌, ‘‌শুন হে অ্যান্টনি তোমায়’‌ বা ‘‌জয় যোগীন্দ্র মহামায়া’‌ তৈরি হয় না পর্দায় ও পর্দার নেপথ্যে। আর ঠিক এর এক বছর পরে ১৯৬৯–‌এ ‘‌চৌরঙ্গী’‌। সেখানে মান্না–‌উত্তমের জুটিতে একটাই গান, আর সেটাই মুখে মুখে ঘুরল। অসীমা মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘‌বড় একা লাগে’‌। এরপর ১৯৬৯–‌এ আসবে ‘‌চিরদিনের’‌।‌ ১৯৭০–‌এ আসবে ‘‌নিশিপদ্ম’‌। ১৯৭১–‌এ ‘‌ছদ্মবেশী’‌। ১৯৭২–‌এ একদম ‘‌হ্যাটট্রিক’‌— ‘‌স্ত্রী’‌, ‘‌আলো আমার আলো’‌, ‘‌হার মানা হার’‌। ৭৩টা একটু নড়বড়ে। ৭৪–‌এ ‘‌মৌচাক’‌। আর ৭৫–‌এ তো ‘‌ম্যাগনাম ওপার্স’। নচিকেতা ঘোষের সুরে খোদ ‘‌সন্ন্যাসী রাজা’‌ অর্থাৎ ছয়ের দশকের মধ্যভাগ থেকে সাতের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বছর পিছু কমপক্ষে একটা করে বড় হিট। এই জুটির। সময়ের নিরিখে এ‌কটানা চলায় কিন্তু উত্তম–‌মান্না জুটি বেশি ‘‌স্টেডি’‌। আর বাণিজ্যের নিরিখে হয়ত সমান–‌সমান উত্তম–‌হেমন্ত জুটির সঙ্গে।
নেট প্র‌্যাকটিস
তখন উত্তমও ছবির কাজে বোম্বেতে থাকেন। একদিন পথে মান্না দে–‌র সঙ্গে তাঁর দেখা। মান্না দেখলেন উত্তমের সঙ্গে একটা টেপ রেকর্ডার। সেটা কেন সঙ্গে জানতে চাওয়ায় উত্তম বললেন ওতে মান্না দে–‌রই সদ্য রেকর্ড করা একটি গান আছে, যেটিতে কিছুদিন পরেই শুটিংয়ে লিপ দিতে হবে উত্তমকে। তাই গানটি বারবার অবসর মতো শুনছেন পথ চলার ফাঁকে আর কী কী এক্সপ্রেশন দেবেন, গানের কোন ফাঁকে তা বসাবেন ভাবছেন। মান্না দে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন উত্তমের এই নিষ্ঠা দেখে।
আর উত্তম কতটা সশ্রদ্ধ ছিলেন মান্না দে–‌র প্রতি। একটি উদাহরণই যথেষ্ট। মান্না দে যখন গান রেকর্ডিং করতেন, তা দেখতে রেকর্ডিং স্টুডিওয় পৌঁছে যেতেন উত্তম। বসে বসে দেখতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বলতেন, মান্না দে গানের ভেতর খুব ভাল অ্যাক্টিং করেন। সেটা দেখা না থাকলে, এ সব গানে লিপ মেলানো অসম্ভব।
এক খাঁচা, দুই বাঘ
ছবির নাম ‘‌স্ত্রী’‌। এ ছবিতে সৌমিত্রর গলায় গান গেয়েছিলেন হেমন্ত। আর উত্তমের গলায় মান্না দে। কোনওটাই বেমানান লাগেনি। দুটোই হিট করেছিল। আর এমন এক্সপেরিমেন্ট বোধহয় সুরকার নচিকেতা ঘোষই পারতেন!‌ ‘‌সন্ন্যাসী ‌রাজা’‌–‌তে যেমন তিনি মান্না ও হেমন্ত দুজনকেই একসঙ্গে রেখেছিলেন।   ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top