সঙ্কর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়  নামটা শুনলেই আজও এক বৈঠকী মেজাজের ঝাকড়া চুলের সদাহাস্য এক শিপীর চেহারা ভেসে আসে। ছোটবেলা থেকেই কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় ও সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের তালিমে বড় হলেও, সান্নিধ্য পেয়েছিলেন ভীষ্মদেব চট্টাপাধ্যায়, চিন্ময় লাহিড়ি, বেগম আখতারের মত শিল্পীদের। উস্তাদ আবদুল করীম খাঁ, উস্তাদ বড়েগুলাম আলি খাঁ, উস্তাদ আমীর খাঁ, জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। এঁদের প্রত্যেকের প্রভাব থাকলেও তৈরি করতে পেরেছিলেন এ ব্যাতিক্রমী গায়কী। সেই গায়কী আজও অনন্য। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সব ধারার গানের প্রতিই ছিল আলাদা মমত্ত্ব, আধুনিক থেকে রাগপ্রধান, ভাটিয়ালী, কীর্তন, শ্যামাসঙ্গীত থেকে ছবির গান সবেতেই ছিল অনায়াস বিচরণ। এই তালিকায় কি গজল গানকে রাখা যায়?‌ কারণ মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ মাধুর্য্যেই ছিল এক গজল গায়কীর ছোঁয়া। 
এ বিষয়ে কিছু বলতে গেলে চলে যেতে হবে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের শিল্পী হয়ে ওঠার জীবনে। ১৯৪৯ সালে যখন প্রথম রেকর্ড বের হয় তখন তাঁর বয়স মাত্র ২০। একান্নবর্তী পরিবারে সব কাকাদের সঙ্গে থাকতেন টালিগঞ্জের বাঙালপাড়ায়—সেই বাড়ির আকর্ষণীয় জায়গা হচ্ছে বাইরের গানের ঘর। যেখানে হারমোনিয়াম, তবলা, খোল, পাখোয়াজ সব সময় থাকত। যেখানে গান গাইতেন কাকাদের সঙ্গে মানবেন্দ্রও। আসতেন গীতিকার বন্ধু অবনি সাহা, ফনি সরকার। আসতেন আবদুল সাত্তার। থাকতেন টিপু সুলতান মসজিদে। তিনি গজল লিখতেন আর তাতে সুর দিতেন মানবেন্দ্র। সঙ্গে থাকতেন কাকার ছাত্রছাত্রী, বন্ধু সুকুমার মিত্র। এমন অনেক গজল গান খাতাতে থেকে গেছে। 
সেই সময় তিনি তালাত মামুদের গজলের ভক্ত ছিলেন। সেই সময় তাঁর বেশ কিছু জনপ্রিয় গজল অনুষ্ঠানে গাইতেন মানবেন্দ্র। এমনই কিছু গজল ‘‌সুক্রিয়া ম্যায় প্যায়র তেরা’‌, ‘‌তসবীর মেরি দিল’,‌ ‘‌মেরা প্যায়ার মুঝে লোটা দে’‌। ৫০–‌এর দশকের মধ্যভাগে তাঁর এই রোমান্টিক গলার জন্য লোকে কলকাতার তলাত বলতেন। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে সেই সময় এইচএমভি যে ভারসন রেকর্ড বের করত, তালাত মামুদের গানগুলি বের হতো মানবেন্দ্র কণ্ঠে। আজও সেইসব গান শুনলে অবাক হতে হয়। যেমন ‘‌জনতে হ্যায় জিসকেলিয়ে’, ‘‌হামসে না আয়া গয়া’‌,‘‌দে কবিরা রোঁয়ে’‌। 
একটা সময় মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় আকাশবাণীর গীত গজলের নিয়মিত গায়ক ছিলেন। সেই সময় আকাশবাণীর গীত-‌গজলের নিয়মিত গায়ক ছিলেন দীপচাঁদ মিঠোরিয়া। তাঁর অনেক লবজ’‌তে (‌কথা)‌, মানবেন্দ্র সুর দিয়ে আকাশবাণীর অনুষ্ঠান করেছেন। তার কিছু দৃষ্টান্ত তাঁর নিজের হাতের লেখায় গানের খাতায় পাওয়া যায়। মেহেদি হাসানের গানের দারুণ তারিফ করতেন শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মেহেদি হাসানের প্রথম লং প্লেইং রেকর্ড–‌এর ‘‌পাত্তা পাত্তা বুটা বুটা’‌ সহ বেশ কিছু গান নিয়মিত শুনতেন সেই সময়। সমসাময়িক মেহদি হাসান কী চোখে দেখতেন মানবেন্দ্রকে?‌ বাংলাদেশের সুরকার শিল্পী সেলিম গোলাম অসরাফ বলেছেন, ‘‌তখন আমি করাচি রেডিওতে চাকরি করি। সালটা ১৯৬৮। আমায় একদিন মেহেদি হাসান বলেছিলেন— বাঙ্গালকা ফানকারকো (‌শিল্পী।)‌ বিলকুল ক্লাসিকেল বেইজ নেহি হ্যায়। এই কথা শুনেই আমি ঢাকা থেকে ডাক যোগে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের রেকর্ড আনাই। করাচিতে দেবু ভট্টাচার্য দাদার বাসায় পাকিস্তানের প্রখ্যাত চারজন শিল্পী এবং উপমহাদেশের গর্ব—উস্তাদ মেহেদি হাসান, এস বি জন, মাসুদ রানা এবং আইরিন পারভিনকে আমার প্রিয় শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গান শুনে হতভম্ব হয়ে যেতে দেখেছি।

গান শোনার পর মেহিদি সাহেব বলতে বাধ্য হয়েছিলেন ‘‌ইয়ার ইয়ে ফানকার কো ইতনা আচ্ছে আওয়াজ, এতনা ক্ল্যাসিক্যাল বেইজড ভোকাল, মানবেন্দ্রজি গজল গাতে কিঁউ নেহি?‌ আমি বলেছিলাম মানবেন্দ্রজী সব ধারার গানেই সমান দক্ষ। শিল্পীর গান শুনে পাকিস্তানের চার শিল্পী এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে এঁদের মুখে প্রশংসা শুনে আমি ও দেবুদা আনন্দ অশ্রুতে ভিজেছিলাম। ‌ শুধু তাই নয়, শিল্পীর এই ‘‌মৌসুমী মন’‌ গানটার ইন্টারলিউডে যে তানটা আছে সেটা গাওয়ার জন্য প্রত্যেকে বেশ কয়েকবার প্রাকটিশ করেছিলেন কিন্তু মেহেদি হাসান ছাড়া বাকি সবাই যখন ভুল করেছিলেন তখন আমাদের আনন্দ দ্বিগুণ হয়েছিল। এরও দশ বছর পর ১৯৭৮ সালে এই শহরে রবীন্দ্র সদনে দুই শিল্পীর সাক্ষাত হয়। মেহেদি হাসানের একক আসরে মনবেন্দ্রকে উদ্দেশ করে মেহেদি হাসান বলেন, মানবেন্দ্রজি আপনার গান আমি শুনেছি এবং আমি আপনার গানের গুনমুগ্ধ। দুই শিল্পীর এই পারস্পরিক  ভালবাসা প্রমাণ করে দুজনের মহত্ব। 
গজল আঙ্গিকে বাংলা গান বা নজরুলগীতি রেকর্ড করলেও হিন্দী গানের কোনও রেকর্ড করেননি এটাই পরিতাপের। আকাশবাণীতে প্রচুর গীত ও গজলের অনুষ্ঠান করেছিলেন শিল্পী। আকাশবাণীর অর্কাইভে এমন কিছু থেকে থাকে থাকে তবে সেটা হবে মানবেন্দ্র ভক্তদের কাছে মহার্ঘ। শিল্পী কন্যা মানসী মুখোপাধ্যায় জানালেন বাবা শিল্পী সুরকার হিসেবে সব ধারার গান শুনতেন। নতুন কোনও শিল্পীর গান ভাল লাগলে দারুণ ভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন। প্রথম যখন গুলাম আলির গজলের এল পি ‘‌মস্তানা পিয়ে ঘা’‌–‌এলো, সেদিন গোটা দিনরাত সেই গান মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম। বাবার গানগুলি এতটাই ভাল লেগেছিল ওই রেকর্ড–‌এর একটা গান ‘‌ও কভি মিল যায় তো ক্যায়া কিজিয়ে’‌ একরাতে তুলে পরের দিন মহাজাতি সদনের অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। ওই অনুষ্ঠানে আমিও গিয়েছিলাম। সেদিন বাবার সঙ্গে তবলায় ছিলেন মনীন্দ্র নট্ট। বাবা মঞ্চে উঠেই বললেন, ‘‌কাল সারাদিন একটা রেকর্ড শুনেছি এবং তার মায়াজাল থেকে বের হতে পারিনি। আমার একটা গান এতটাই ভাল লেগেছে আমি গানটা সারা রাতে তুলেছি এবং সেটা দিয়েই আমার আজকের অনুষ্ঠান শুরু করছি। গানটি নতুন গায়ক গুলাম আলীর গাওয়া।’‌ সকলেই খুব অবাক হয়েছিলেন এমন একটা গান দিয়ে শুরু করায়। বাবার সব সময় গজল গানের প্রতি প্যাশন ছিল। বিভিন্ন সয় উর্দুও শিখেছিলেন এই জন্য। বাবা আকাশবাণীতে নিয়মিত গীত ও গজল পরিবেশন করতেন। 
আর একটা অনুষ্ঠানের কথা ভুলব না। বাংলাদেশের ঢাকাতে একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে এক মঞ্চে ভারত থেকে বাবা এবং আরতি মুখোপাধ্যায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, পাকিস্তান থেকে মেহদি হাসান ও গুলাম আলী এবং বাংলাদেশের ফিরোজা বেগম এবং রুনা লায়লা। ছয় শিল্পীর গান একসঙ্গে হয়েছিল। সেখানে বাবা মেহেদি হাসান সাহেব ও গুলাম আলিকে একসঙ্গে গান নিয়ে আলোচনা ও প্র‌্যাকটিস করতে দেখেছি এটা আমার কাছে একটা পরম পাওয়া বলতে পারি। আধুনিক থেকে রাগাশ্রয়ী, নজরুলগীতি থেকে ছায়াছবির গান ছাড়িয়ে পুরাতনী গানের রেকর্ড সিডি আছে। তাঁর গাওয়া গজল গানের রেকর্ড বা সিডি না পাওয়া গেলেও। যারা সেই সব গান শুনেছেন আকাশবাণী বা অনুষ্ঠানে সে গান আজও হৃদয়ের মণিকোঠায় রয়ে গেছে।‌‌‌

 

মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ৯০তম জন্মদিন উপলক্ষে মানসী মুখোপাধ্যায় নতুন করে গাইছেন তাঁর বাবার গান। যন্ত্রানুসঙ্গের নতুন আয়োজনে। সম্প্রতি এই গানের রেকর্ডিং শুরু হল। স্টুডিওতে মানসী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাহুল চট্টোপাধ্যায়, দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়, জয় নন্দী ও প্রত্যুষ বন্দ্যোপাধয়ায়। এই গান ইউটিউবে আপলোড হবে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিনে। ছবি:‌ সঙ্কর্ষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top