কলকাতায় প্রথম ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফি ফেস্টিভ্যাল। আপনিই তার অন্যতম উদ্যোক্তা। কীভাবে মাথায় এল বিষয়টা?‌
মধুছন্দা সেন: আমার ‘মায়া আর্ট স্পেস’ই এই বিপুল কর্মকান্ডের নেপথ্যে। দীর্ঘ ছ–বছর ধরে রাজডাঙায় মায়া আর্টসের স্টুডিওতে ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি ডে–তে ছোট আকারে প্রদর্শনী হয়ে আসছে। ছ–বছরে মায়ার সেই প্রদর্শনী বিপুল জনপ্রিয়তা ছঁুয়ে ফেলেছে। সেই সূত্র ধরেই মাথায় বেশ কিছুদিন ধরে একটা বড় ক্যানভাসে এই প্রদর্শনী করার চিন্তাটা ঘুরঘুর করছিল। ভাবছিলাম, ভারতের সব বড় রাজ্যেই তো এ ধরনের প্রদর্শনী হয়। কলকাতায় কেন নয়?‌ এই ভাবনা থেকেই গত বছর ফেস্টিভ্যাল করব ভেবেছিলাম। কিন্তু সেটা হয়ে উঠল না। এর মধ্যেই আগস্টে মায়া আর্টসে বাৎসরিক প্রদর্শনীটা হল। তারপর গত নভেম্বরে এই ফেস্টিভ্যালের জন্য সিরিয়াসলি ঝাঁপালাম। মায়া আর্টসের সদস্যদের নিয়ে মিটিং করে কীভাবে কী করা যায় সব ঠিক করলাম। সেই হিসেবে মাত্র তিন মাসের মধ্যে এতবড় একটা ফেস্টিভ্যালের আয়োজন হয়েছে। 
 দেশের বাইরে থেকেও প্রচুর নামী আলোকচিত্রী যোগ দিয়েছিলেন। কীভাবে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হল?‌
মধুছন্দা: আসলে যখন এই ফেস্টিভ্যালটা করব বলে ভাবলাম, তখন এটা প্রায় একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যখন দেশের বাইরের চেনাপরিচিত কিছু ফটোগ্রাফারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করলাম, দেখলাম সবাই প্রায় ‘হ্যাঁ’ বলছেন। উৎসাহ বেড়ে গেল। বিভিন্ন দেশের নামী ফটোগ্রাফারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করলাম। ৪০টা দেশের প্রথম সারির ফটোগ্রাফাররা আমাদের উদ্যোগের সঙ্গে থাকার বিষয়ে সম্মতি জানালেন।
 ফেস্টিভ্যালে মোট ১০টা ভেন্যু। এতগুলো জায়গা, এতজন লোক— সব একসঙ্গে সামলালেন কীভাবে?‌
মধুছন্দা: সামলানোর কথা না ভেবে প্রথমেই গ্যালারি বুক করা শুরু করি। প্রথমে আইসিসিআর–এর চারটে গ্যালারি বুক করে দিয়েছিলাম। তারপর একে একে গগনেন্দ্র প্রদর্শশালা, নন্দন ও তথ্যকেন্দ্র, জেম সিনেমা, জাদুঘরের কলকাতা গ্যালারি, ইমামি সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি, অলকা জালান ফাউন্ডেশন, ভিক্টোরিয়া, হ্যারিংটন স্ট্রিট আর্টিস্ট সেন্টার বুক করি। যদি ভেন্যু হিসেবে দেখি তবে ১০টা। কিন্তু গ্যালারি হিসেবে ভাবলে ১৬–১৭টা হয়ে গেছিল। একটা সময় তো খুব ভয় পেতে শুরু করেছিলাম। ভাবছিলাম, সত্যিই করা সম্ভব‌? তারপর দেখলাম সবই হয়ে গেল। 
 দেশি এবং বিদেশি মিলিয়ে মোট কতজন ফটোগ্রাফারের ছবি ছিল ফেস্টিভ্যালে?‌
মধুছন্দা: প্রায় ৩০০ জন। আর ছবি ছিল প্রায় ১৭০০ থেকে ১৮০০। এই ফেস্টিভ্যালে নামী ফটোগ্রাফারদের সঙ্গে অংশ নিয়েছিল স্কুলপড়ুয়ারাও। সারা ভারত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুলের ছেলেমেয়েদের তোলা নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা করা হয়েছিল। তার থেকে ৫০টি ছবি বেছে নিয়ে সেগুলির মধ্যে সেরা ২০টি ছবিকে প্রখ্যাত ফটোগ্রাফারদের কাজের সঙ্গে একই পংক্তিতে স্থান দেওয়া হল। সবথেকে আশ্চর্যের কথা, এই ফেস্টিভ্যালে সবথেকে বেশি ভিড় করেছিলেন স্কুলের ছেলেমেয়ে এবং তাদের অভিভাবকরা। ছিল ওপেন কনফারেন্স। যে ওপেন কনফারেন্সে সারা পৃথিবীর মানুষ অবাধে অংশ নিয়েছিলেন। 
 ফটোগ্রাফি সংক্রান্ত ফিল্মও তো ছিল ফেস্টিভ্যালে?‌
মধুছন্দা: হ্যাঁ। প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার রঘু রাইয়ের মেয়ে অবনী রাই তাঁর বাবাকে নিয়ে একটা ছবি তৈরি করেছেন— ‘‌রঘু রাই: অ্যান আনফ্রেম্‌ড পোট্রেট’। সেটার স্ক্রিনিং হল ফটোগ্রাফি ফেস্টিভ্যালে। বিখ্যাত ফটোগ্রাফার একাশি তাঁর ফিল্ম আমাদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফেস্টিভ্যালে তাঁর ছবিটিও দেখান হয়েছে। ছিল সুনীল দত্তর ছবি, নিমাই ঘোষের তোলা ছবি। এসেছিলেন কোলেজ কোকম্যান। তাঁর ছবিও ফেস্টিভ্যালে দেখানো হয়েছে। তিনি বক্তৃতাও করেছেন। ফটোগ্রাফি ও ফটোগ্রাফার সম্পর্কিত একগুচ্ছ ছবি দেখানো হয়েছে ফেস্টিভ্যালে। পর্বতারোহী সত্যরূপ সিদ্ধান্তের একটা ছবিও দেখানো হয়েছে। আন্টার্কটিকা গিয়েছিলেন, এমন একজনের ছবিও দেখানো হয়েছে। আমরা সৌভাগ্যবান, বিভিন্ন প্রবীণ ও প্রখ্যাত মানুষের কাজ ফেস্টিভ্যালে তুলে ধরতে পেরেছি। 
 অন্য পেশার মানুষদের তোলা ছবিও তো ছিল?‌ 
মধুছন্দা: নিশ্চয়ই! যোগেন চৌধুরী, গণেশ হালুই, বিকাশ ভট্টাচার্যর মত চিত্রশিল্পীদের তোলা ছবি ছিল। ছিল অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের তোলা ছবি। শান্তনু মৈত্র, গৌতম ঘোষ, কুণাল বসু প্রমুখের ছবিও ছিল। সদ্যপ্রয়াত মৃণাল সেনের তোলা ছবি ছিল। ছিল সত্যজিৎ রায়, সন্দীপ রায়ের তোলা ছবি। বিদেশি প্রখ্যাত ফটোগ্রাফারদের কাজ তো প্রচুর ছিলই। একটা ‘ওয়াইল্ড লাইফ সেকশন’ করা হয়েছিল। যেসব ফোটোগ্রাফার বন্যপ্রাণ নিয়ে কাজ করেন তাঁদের ছবি সেখানে ছিল। ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ থেকে প্রায় ১০০টি ছবি পাঠানো হয়েছিল আমাদের ফেস্টিভ্যালে। 
 এতবড় একটা উৎসবে উৎসাহ কেমন দেখলেন?‌
মধুছন্দা: আমি অভিভূত। এত ভিড় হয়েছে, যে ভাবা যায় না! বিশেষত আইসিসিআর, ভিক্টোরিয়া এবং নন্দনে। ফোটোগ্রাফির সঙ্গে ইনস্টলেশনের মেলবন্ধনে জেম সিনেমায় একটা একদম অন্য ধরনের প্রদর্শনী ছিল। নেপথ্যে কৌন্তেয় সিন্‌হা এবং সুশান্ত পাল। রক্তমাংসের মানুষদের এনে ফ্রেমবন্দি করা হয়েছিল। মজার ব্যাপার। মোটামুটি ফোটোগ্রাফির সব ধারাকেই ধরতে চেয়েছি।
 আদকাল তো মোবাইল ফটোগ্রাফি তুমুল জনপ্রিয়। ফেস্টিভ্যালে সেটা স্থান পেয়েছিল?‌
মধুছন্দা: নাহ্‌। আসলে মোবাইল ফটোগ্রাফি কতটা গ্রহণযোগ্য এবং তাকে আদৌ আলোকচিত্র শিল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে ‘‌মোবাইল ফটোগ্রাফি কি আসল ফটোগ্রাফিকে ধ্বংস করছে‌?‌’ শিরোনামে একটা আলোচনা ছিল। 
 এতবড় ফেস্টিভ্যাল। প্রায় গোটা পৃথিবীকে এক জায়গায় জড়ো করা। রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন কতটা সাহায্য করেছেন মধুছন্দা সেনকে?‌
মধুছন্দা: ‘‌মন্ত্রী’‌ হিসেবে কোনও সুবিধে তিনি করে দেননি। আমি সেটা চাইওনি। এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগ। সরকারি সুবিধে পাব বলে আশাও করিনি। তবে ইন্দ্রনীল সেন স্বামী হিসেবে অবশ্যই পাশে থেকেছেন। মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন। 

জনপ্রিয়

Back To Top