সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ‘‌‌সত্যজিৎবাবু ‘‌নায়ক’‌–‌এ অদিতির চরিত্রে শর্মিলাকে নয়, আমাকেই প্রথমে বেছেছিলেন। আমি ‘‌না’‌ বলায় পরে শর্মিলাকে নেন তিনি’‌,‌ জানালেন অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়, ‘‌নায়ক’‌ তৈরি হওয়ার অর্ধ‌শতক পার হয়ে এসে। জানালেন, ‘‌‌আমায় চরিত্রটা শুনিয়ে মানিকবাবু বলেছিলেন, ‌এ ‌চরিত্রে তোমাকেই ভাবছি।’‌‌
দুর্লভ–‌তথ্যের পুনরুদ্ধার বোধহয় একেই বলে। সম্প্রতি খোঁজ পাওয়া গেল একটি জনপ্রিয় সিনেমা–‌সাহিত্য পত্রিকার এক অধুনা–‌দুষ্প্রাপ্য‌ সংখ্যায় একটি খবরের। ‘‌নবকল্লোল’‌ নামের এই পত্রিকায় সিনেমা–‌সংক্রান্ত খবরগুলি লিখতেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। ‘‌শ্রীগুপ্ত’‌ ‌ছদ্মনামের আড়ালে। সেই দুর্লভ সংখ্যাটিতে (‌১৩৭২ বঙ্গাব্দের অর্থাৎ ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের আষাঢ় সংখ্যা এটি)‌ দেখা যাচ্ছে ‘‌টুকরো খবর’‌–‌এ‌র ভেতর শ্রীগুপ্ত  একটি ছবির আগাম খবর দিচ্ছেন এইভাবে, ‘‌সত্যজিৎ রায়ের ‘‌নায়ক’–‌‌এ উত্তমকুমারের বিপরীতে তিনটি প্রধান নারী চরিত্রে থাকবেন মাধবী মুখোপাধ্যায়, সুমিতা সান্যাল এবং ভারতী দেবী।’‌‌
ব্যস, এটুকুই খবরটি। কিন্তু এটুকু পড়েই নড়েচড়ে বসতে হল ৫৪ বছর পরে!‌ কারণ একটি নাম। মাধবী মুখোপাধ্যায় (‌পরবর্তীতে অভিনেতা নির্মলকুমারের সঙ্গে বিবাহ–‌সূত্রে চক্রবর্তী)‌। মুক্তির এক বছর আগে বেরোনো খবর অনুযায়ী ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া এ ‌ছবি পরিচালনা করেন সত্যজিৎ রায়। নাম ভূমিকায় থাকেন যথারীতি উত্তমকুমার। খবরে থাকা দুই অভিনেত্রী সুমিতা সান্যাল এবং ভারতী দেবীও দু‌টি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র করেন ছবিতে। প্রথমজন এক সিনেমা অভিনেত্রীর চরিত্রে। দ্বিতীয়জন ট্রেনের এক সহযাত্রিণীর চরিত্রে। সবাই আছেন। শুধু মাধবী নেই!‌ কেন?‌
৫৪ বছর আগে প্রকাশিত এই খবরের সূত্র ধরে যোগাযোগ করা হয় স্বয়ং মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি মনে করতে পারেন এ প্রসঙ্গ।  এবং ‌পত্র–‌পত্রিকায় বেরোনো এ ‌ছবির আগাম খবরের কথা‌ও। মাধবীদেবী বললেন, ‘‌হ্যাঁ, তখন বেশ কিছু কাগজে বেরিয়ে গিয়েছিল যে আমিই ‘‌নায়ক’‌ ছবির নায়িকা হিসাবে থাকছি। সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে চতুর্থবার কাজ করতে চলেছি।’‌
এর আগে সত্যজিৎবাবুর ‘‌কাপুরুষ’‌ ছবির কাজ সবে শেষ করেছেন তিনি। তখনই তাঁকে ‘‌নায়ক’‌ ছবি ও তার চরিত্রের কথা বলেন সত্যজিৎ। ‘‌কাপুরুষ’‌ ছবিটি ‘‌মহাপুরুষ’‌–‌এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তি পায় ১৯৬৫–‌তে। আর এটিই হয় সত্যজি‌ৎ ও মাধবীর একসঙ্গে করা শেষ কাজ। পরপর তিন বছরে উপর্যুপরি তিনটি উল্লেখযোগ্য কাজ একসঙ্গে করার পরে। জুটির সূচনা–‌ছবি ‘‌মহানগর’‌ (‌১৯৬৩)‌, চারুলতা (‌১৯৬৪)‌ আর ‘‌কাপুরুষ’‌। প্রথম দুটি বার্লিনে এবং পরেরটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়। স্বাভাবিকভাবেই গড়ে ওঠে এক সফল জুটি। এক পরিচালক ও এক অভিনেত্রীর। এর আগে বাংলা ছবির এমন সফল দুই পরিচালক–‌অভিনেত্রী জুটি যে দু‌টি ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছিল সেই হরিদাস ভট্টাচার্য–‌কানন দেবী এবং অসিত সেন–‌সুচিত্রা সেন জুটিতে বক্স অফিস সাফল্য এলেও, এমন বিশ্বজোড়া খ্যাতি ও স্বীকৃতি আসেনি। সুপ্রিয়া দেবী–‌ঋত্বিক ঘটকের জুটিও ছিল মাত্র দু‌টি ছবির। সর্বোচ্চ সাফল্যের এই জুটি যখন উপর্যুপরি চতুর্থ ছবির দিকে এগিয়ে চলেছে, তথনই ভাঙন কেন?‌
স্পষ্ট স্বরে মাধবী দেবী জানালেন, ‘‌না, ততদিনে আসলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি আর একসঙ্গে কাজ করব না। এমন কিছু কথাবার্তা আর জটিলতা আমাদের সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল, সেগুলো পার হয়ে একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে অসুবিধা হবে বুঝতে পারছিলাম। আমি কোনও অশান্তি চাইনি। বিতর্ক চাইনি। নিজেই সরে এসেছিলাম। এত বছর পরে আর সে সব অস্বস্তিকর কথা মনে করতে চাই না। অনেকেই জানেন সে সব।’‌
• ‘‌নায়ক’‌–‌এ আপনার কাজ করতে চলার খবর প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল পত্র–‌পত্রিকায়?‌
মাধবী:‌ হ্যাঁ। কিছু কিছু জায়গায় বেরিয়ে গিয়েছিল। আসলে সেভাবেই প্রাথমিক ঘোষণাটা ছিল। অনেকের মতো ঢুলুদা (‌অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়)‌, সেবাদা (‌সেবাব্রত গুপ্ত)‌ এঁরাও জানতেন। খবর করেছিলেন।
• আপনার কি মূল নারী চরিত্রটাই করার কথা ছিল?‌
মাধবী:‌ হ্যাঁ, ওই সাংবাদিকের (‌অদিতি)‌ চরিত্রটাই। যেটা পরে শর্মিলা করে।
• উত্তমকুমারের সঙ্গে ‘‌শঙ্খবেলা’‌ আপনার প্রথম ছবি। কিন্তু ‘‌নায়ক’‌ করলে তো.‌.‌.‌।
মাধবী:‌ হ্যাঁ। ‘‌নায়ক’‌ আগে মুক্তি পায়। ফলে ওটাই  প্রথম ছবি হত। 
• ‘‌নায়ক’‌ও তো পরে ‘‌বার্লিন’‌–‌এ ‘‌স্পেশ্যাল জুরি অ্যাওয়ার্ড’‌ পায়। পরে আক্ষেপ হয়নি কখনও এ ‌ছবি ছেড়ে দেওয়ার জন্য?‌
মাধবী:‌ না, হয়নি (‌দৃঢ়প্রতিজ্ঞ লাগল মাধবীর স্বর)‌। কারণ, সিদ্ধান্তটা তো আমারই ছিল। এবং সে পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তটা পারিপার্শ্বিক বিচারে ঠিকই ছিল। ফলে আপশোস হবে কেন?‌ (‌একটু থেমে)‌ তার পরেও তো উনি আরও দু’‌বার বলেছিলেন ওনার ছবিতে কাজ করার জন্য। ‌দু’‌বারই ‘‌না’‌ বলেছিলাম। 
• তাই নাকি!‌ ‘‌নায়ক’‌–‌এর পরেই?‌ কোন কোন ছবিতে?‌
মাধবী:‌ না। ঠিক ‘‌নায়ক’‌–‌এর পরেই নয়।  উনিও জানতেন ব্যক্তিগত সম্পর্কের যে অবনতি ওই সময়টায় হয়েছে তাতে আমি আর তখন কাজ করব না। কিছু বছর পরে ‘‌অশনি সংকেত’‌ করার সময় বলেন। গঙ্গাচরণের স্ত্রীর চরিত্র। উল্টোদিকে সৌমিত্রই ছিল। এটা ‘‌নায়ক’‌–‌এর আরও বছর ছ’‌সাত পরের কথা। কিন্তু এবারও আমি ‘‌না’‌ বলি। চরিত্রটি বাংলাদেশের ববিতা করে।
• আর তৃতীয়বার?‌
মাধবী:‌ এটা আরও পরে। আটের দশকের মাঝখানে। তখন ‘‌ঘরে ‌বাইরে’‌ করবেন ভাবছেন। বিমলা চরিত্রে আমাকেই ভেবেছিলেন উনি। আগের দু’‌বার উনিই সরাসরি বলেছিলেন। একবার মুখোমুখি। পরেরবার ফোনে। দু’‌বারই ‘‌না’‌ বলেছি বলে তৃতীয়বার আর নিজে আমায় বলেননি। বলেছিলেন ওনার এবং আমার দু’‌জনেরই ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক সেবাব্রত গুপ্তকে দিয়ে। সেবাদাকে বলেছিলেন শুনেছি, ‘‌ঘরে ‌বাইরে’‌ করব ভাবছি, আপনি কথা বলে মাধবীকে রাজি করান।‌
• প্রায় দু’‌দশক পরেও আর কাজ করেননি?‌
মাধবী:‌ না। মনে হয়েছিল ‘‌আবার কেন’‌। না–‌‌ই বলেছিলাম সেবাদাকে। পরে দেখি ওই চরিত্রটা স্বাতীলেখা (‌সেনগুপ্ত)‌ করেছে। 
• এগুলো নিয়ে এখন কিছু ভাবেন?‌
মাধবী:‌ না। কী আর ভাবব?‌ সে সব দিন তো চলে গেছে। আমি না করায় তো আর ওনার ছবি আটকায়নি। উনি ওনার মতো ছবি করেছেন। আমি আমার মতো ছবি করেছি। ‌.‌.‌.‌. (‌একটু হেসে)‌ এত বছর পরে এসব কথা যে কেউ আবার তুললেন, জিজ্ঞাসা করলেন, সেটা ভেবেই একটু আশ্চর্য হচ্ছি!‌
একটা জিনিস লক্ষ্য করার মতো। যে তিনটি ছবিতে মাধবীকে ভেবেছিলেন সত্যজিৎ এবং পাননি, সেই তিনটি ছবিতেই কিন্তু তিনি বিকল্প অভিনেত্রী হিসাবে  কাউকে টালিগঞ্জ থেকে নেননি। কখনও নিয়েছেন বম্বেতে হিন্দি ছবিতে তখন তুমুল ব্যস্ত শর্মিলাকে। কখনও বাংলাদেশ থেকে এনেছেন ববিতাকে। আবার কখনও পর্দা থেকে সরে গিয়ে মঞ্চ থেকে তুলে এনেছেন স্বাতীলেখাকে। 
এসব ইতিহাস। এবং ইতিহাসের কম আলোকিত অংশ। সত্যি একটা ছোট্ট হারানো খবরের টুকরো থেকে কত কী–‌ই যে উঠে আসে!‌

ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top