অদিতি রায়: • ‘শেষ থেকে শুরু‌’‌ শুরু হয়ে, শেষ হল, এবার মুক্তি। ‌আপনার অভিনীত চরিত্রটা কেমন?‌
•• (স্বভাবসুলভ হেসে‌)‌ আমার চরিত্রের নাম ‘পূজারিণী‌’‌। চরিত্রটায় অনেকগুলো শেড যেমন আছে, তেমনই বিভিন্ন সময়ের ফ্রেমে দেখানো হয়েছে। সে বিদেশে যায় গবেষণার কাজে, একটি ছেলের সঙ্গে পরিচয় ও পরিণয়। ধীরে ধীরে চরিত্রটা পরিণত হয়ে ওঠে। এই চরিত্রটায় ঢুকতে আমার বেশ ভাল লেগেছে। এর আগে জিৎ-‌এর সঙ্গে যতগুলো কাজ করেছি, তার প্রায় সবকটাতেই আমি শুধুই ‘হ্যাপি গো লাকি‌’‌ চরিত্রে ছিলাম। এটাতে পূজারিণী উচ্ছ্বল, কিন্তু গভীর।
• অনেকটা আপনার মতোই কি?
•• (‌হেসে)‌ এটুকু বলতে পারি, পূজারিণীর সঙ্গে অনেকটাই সংযোগ অনুভব করেছি। বলতে পারেন আমারই এক্সটেনশন। আপাতদৃষ্টিতে যাকে চঞ্চলা মনে হলেও, অন্তরে গভীর। চারপাশটা বুঝে, পরিস্থিতির সঙ্গে ডিল করার মতো পরিণত ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব তার আছে। আমিও তো ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছি অনেকটাই।
• যে ধরণের ছবিতে আপনাকে সাধারণত দেখা যেত, সেটা থেকে ভেঙে বেরিয়েছিলেন ‘‌হেমলক সোসাইটি’‌-‌তে। তখন তো বয়স অনেক কম ছিল। আজ হলে কি চরিত্রটার ইন্টারপ্রিটেশন অন্যরকম হত?‌
•• অবশ্যই। অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক পরিণত করেছে। সেই সময়ের কোয়েল, আর আজকের কোয়েল, অনেকটাই বদলে গেছে। জীবন আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আজ হলে ‘হেমলক সোসাইটির‌’‌-‌এর ‘মেঘনা‌’‌ হয়ত আরও বহুমাত্রিক হতে পারত, আরও সূক্ষ্ম হতে পারত।
• আপনি কি এখন পারফরমেন্স ওরিয়েন্টেড ছবিই বেশি করতে চান?‌
•• অবশ্যই। এটা আমার বহুদিনের খিদে বলতে পারেন। সৌভাগ্যক্রমে এখন সেরকম বেশ কিছু সুযোগ আমি পাচ্ছি। পরিচালক-‌প্রযোজকদের ধন্যবাদ, ফাইনালি আমাকে এ ধরণের চরিত্রেও ভাবা হচ্ছে (‌হাসি)‌। ‘শেষ থেকে শুরু‌’‌র পূজারিণী যেমন পাওয়ারফুল, তেমনই শৌকর্য ঘোষালের ‘রক্তরহস্য‌’‌র স্বর্ণজা। আসলে অন্যের কাছে শুধু নয়, নিজের কাছেও নিজেকে প্রমাণ করা জরুরি। কৌশিক গাঙ্গুলিও তাঁর ‘ছায়া ও ছবি‌’‌-‌তে আমাকে সে সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এখন তো প্রচুর নতুন পরিচালক এসেছেন ইন্ডাস্ট্রিতে, তাঁদের সঙ্গেও কাজ করতে চাই। একটা বয়স ও সময়ের পর, দর্শকের প্রতিও তো দায়বদ্ধতা থাকে।
• নারী-‌কেন্দ্রিক ছবিতে তো সে সুযোগ অনেক বেশি থাকে.‌.‌.‌
•• না না, নারী-‌কেন্দ্রিক ছবিই করব, এমনটা আমি বলছিনা। আমার চরিত্রটা শক্তিশালী ও প্রাসঙ্গিক হতে হবে। ছবিতে আমারও যেন কিছু অবদান থাকে। আমি এর আগেও যে যে চরিত্রে অভিনয় করেছি, প্রত্যেকেরই সেই ছবিতে কোনও না কোনও অবদান ছিল। শুধুই সেজেগুজে নাচ-‌গান করিনি কখনও। আমি কোয়ান্টিটি নয়, কোয়ালিটিতে বিশ্বাস করি চিরদিনই। 
• এখন বাংলা ছবিতে নায়িকাদের অভিনয়ের সুযোগ কি অনেক বেশি থাকছেনা?‌ এটা তো বাংলা ছবিতে একধরণের পরিবর্তনের ইঙ্গিত গত কয়েকবছর ধরেই?‌
•• হ্যাঁ, বেশ কয়েকবছর ধরেই এই বদল দেখা যাচ্ছে। তবে শুধু নায়িকা কেন?‌ নায়কদেরও অভিনয়ের সুযোগ বেড়েছে। দর্শক এখন নতুন বিষয়, ভাল অভিনয় দেখতে আগ্রহী। সেই কারণেই অন্যধারার ছবি করার উৎসাহ বা ভরসা পাচ্ছেন প্রযোজক, পরিচালকরা। তাই ভাল ছবি করতে চাই, নারী-‌কেন্দ্রিক শুধু না। আমি ওই ধরণের নারীবাদে বিশ্বাস করিনা। আমি মনে করি এই সমাজে পুরুষ এবং নারী, উভয়েরই সহাবস্থান জরুরি। আমার জীবনেও পুরুষদের প্রভাব আছে, সে আমার বাবা হোক বা আমার স্বামী। আমি অসম্ভব সম্মান করি আমার জীবনের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পুরুষকে। আসলে সিনেমা তো আমাদের সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। আমাদের সমাজে যেভাবে মেয়েদের দাপট বেড়েছে, যেভাবে সব বিষয়েই শীর্ষে থাকছে তারা, ছবিতেও তার প্রতিফলন থাকবেই।
• বিবাহিতা নায়িকাদের দর্শক গ্রহণ করেন না, এই ধারণাও তো বদলেছে.‌.‌.‌
•• আমার মনে আছে, আমি তখন প্রচুর ছবিতে কাজ করছি। সেই সময় যখন বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম এবং সেটা জানালাম, তখন অনেকেই বলেছিলেন, বক্সঅফিসে ক্ষতি হবে। আমি বলেছিলাম, আমার কাছে সবথেকে বড় উদাহরণ সুচিত্রা সেন, যিনি মা হওয়ার পর ছবিতে কাজ করতে এসেছিলেন। তিনি শুধু বাংলা ছবি নয়, ভারতীয় ছবির ‘‌এপিটাম’‌। তাঁকে ছাড়া ভারতীয় সিনেমা অসম্পূর্ণ। আমার বিয়ের পর প্রথম মুক্তি পেয়েছিল ‘‌রংবাজ’‌। সেটা সেই বছরের ব্লকবাস্টার। আমি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করি পরিশ্রম আর সততায়। এর কোনও বিকল্প নেই।
• সিনেমার নায়িকা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা, তাঁরা বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তার ওপর কোয়েল মল্লিক তো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছেন, মল্লিক পরিবারের একমাত্র আদরের মেয়ে, বাবা রঞ্জিত মল্লিক, বিয়ের পর ‘সুরিন্দর ফিল্মস‌’‌-‌এর মালকিন, তাঁকে কোনও স্ট্রাগল করতেই হয়নি। তারপরও কি হতাশা ছুঁয়ে যায়না?‌
•• (প্রবল হাসতে শুরু করলেন প্রশ্ন শুনতে শুনতেই‌)‌ একটা বিষয় তো মানতেই হবে, আমার ছবিতে আসার পথটা খুব সুগম ছিল, কোনওরকম স্ট্রাগল সত্যিই করতে হয়নি। অডিশন দিতে হয়নি, পরিচালকদের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয়নি। সেটা অবশ্যই আমার বাবার কারণে। কিন্তু তারপর, টিকে থাকার লড়াইটা তো লড়তে হয়েছে!‌ পরিশ্রম আর সিনসিয়ারিটি দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে!‌ সেটাও বেশ কঠিনই ছিল!‌ আর একটা ব্যাপারও আছে। আমি কোনওদিনই উচ্চাকাঙ্খী নই। আমার কাছে মুম্বইয়ের ছবির প্রস্তাবও এসেছিল। আমি করতে চাইনি, কারণ কিছু দৃশ্যে বা কিছু বিষয়ে আমার আপত্তি ছিল। হিন্দি ছবি করতে হবেই বলে, কলকাতায় যে শর্তে কাজ করি, সেটা মুম্বই গিয়ে ভুলে যাব, সেটা তো হয়না!‌ আমি যদি কোনও কাজ না-‌ও পাই, তাতেও যে ভয়ঙ্কর হতাশায় ভুগব তা-‌ও নয়। বিয়ের পরে শুধু নয়, বিয়ের আগেও এমন হয়েছে যে, সারা বছরে হয়ত আমার একটা ছবি মুক্তি পেয়েছে, আমি হতাশাগ্রস্ত হইনি। আমাকে যেন তেন প্রকারেণ কাজ পেতেই হবে, বছরে ৪/‌৫-‌টা রিলিজ থাকতেই হবে, এমন তাড়না আমার নেই। 
• এক সময় তো বাংলার ১ নম্বর নায়িকা বলা হত আপনাকে.‌.‌.‌
• আমি এই র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বাস করিনা। আমি ইঁদুরদৌড়ে সামিল হতে চাইনা। মেয়ে হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে, বা পেশাদার হিসেবে আমি আমার ১০০ শতাংশ দিতে চাই, ব্যাস। আমি জানি আমি একজন দায়িত্বশীল মানুষ।
• আপনার এই মূল্যবোধ কি পরিবার থেকে অর্জিত?‌
•• আমার জীবন দর্শন, আমার মূল্যবোধ সবই আমার পরিবার, আমার বাবা-‌মায়ের থেকেই পাওয়া। শুটিং না থাকলে বাবা-‌মায়ের সঙ্গে সময় কাটানো, মল্লিক বাড়িতে যাওয়া, ঠাকুমা যতদিন ছিলেন তাঁর সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটানো, পরিবারের সঙ্গে আড্ডা, আমাদের বিশাল পরিবারের এক একটা ঘরে কোনও বৌদির সঙ্গে আচার খাওয়া, আমার বরাবরের অভ্যাস। বিয়ের পরও সেটা বদলায়নি। মা মাঝে মাঝে ফোন করে জিজ্ঞেস করলেন হয়ত, শোন রানের (‌নিশপাল সিং রানে)‌ জন্য কী পাঠাব বলতো?‌ ও কি শুক্তো খাবে?‌ (‌হাসতে হাসতে)‌ আমি তখন মা-‌কে বলি, আমি কি সংলাপ মুখস্থ করব, নাকি তোমার জামাইয়ের শুক্তোর কথা ভাবব?‌ এটাই তো আমার জীবন, এটাই তো আমি।
• এইরকম বাঙালি মূল্যবোধ বা সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা মেয়েটা বিয়ে করে পাঞ্জাবি পরিবারে গিয়ে কোনওরকম কালচারাল গ্যাপ অনুভব করেনি?‌
•• আমার সঙ্গে রানের বন্ধুত্ব ১৫ বছরের। তারপর বিয়ে। আমাদের বন্ডিং মারাত্মক রকমের জোরালো। ওর মা-‌বাবার সঙ্গেও বিয়ের অনেক আগে থেকেই চেনা-‌জানা, বাড়িতে আসা-‌যাওয়া। কোনও ফারাক টের পাইনি। তফাৎ একটাই, রানের বাবা-‌মাকে আঙ্কল-‌আন্টি না ডেকে এখন বাবা-মা-‌ই বলি!‌ 
(কথা শেষ করেই সিগনেচার হাসিটা হাসতে শুরু করলেন কোয়েল‌)‌   
 ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top