জিৎ গাঙ্গুলি:‌ এটা আমার অনেক বছরের স্বপ্ন। বাবা–মা–ইন্দ্রাণীরও স্বপ্ন। খালি মনে হতো, গানবাজনা কি শুধু ফিল্মের জন্যই হবে?‌ সেটা তো একটা বদ্ধ পরিবেশ। বাঁধা গতে কাজ। গান সেটা থেকে বেরোতে পারবে না?‌ যেমন আমি প্রচুর ভালো সোলো গান তৈরি করেছি। কিন্তু সেগুলো ফিল্মে দিয়ে দিয়েছি। তখন প্রতিবার মনে হয়েছে, ব্যক্তিগত মিউজিকটা ফিল্ম মিউজিকের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। আগে লাকি আলি, পলাশ সেন, সোনু নিগমরা কত অ্যালবাম করেছেন। তারপর নন–ফিল্ম অ্যালবাম বন্ধই হয়ে গেল। এখন অবশ্য আবার হচ্ছে। তার মাধ্যম হল ইউটিউব। এটা একটা দারুণ প্ল্যাটফর্ম। এবার ভালো ভালো মিউজিক হবে। সকলে নিজের মতো করে সাজাবে। যেমন আমার ৮টা গানের অ্যালবাম। কিন্তু প্রথম গানটাই (বরসাত) বিশাল হিট করে গেল। 
‌‌ ‌হিন্দি–বাংলা মিলিয়ে কতগুলো ছবিতে সুর দেওয়া হল?‌
জিৎ:‌ ১০০–র ওপর তো বটেই। তবে প্রচুর জনপ্রিয় সিরিয়ালও আছে। 
‌‌ ‌বলিউডে ‘‌স্ট্রাগল’‌টা কেমন?‌ শুধু কার্লটন কিটোর কাছে গিটারে জ্যাজ শিখে মুম্বই পৌঁছে গেলেই হয়ে যায়?
জিৎ:‌ একটা সময়ে শুধুই জ্যাজ শিখতাম। স্যার (কার্লটন কিটো) বলেছিলেন আমেরিকায় পাঠাবেন। বাবার একটা সাঙ্ঘাতিক দুর্ঘটনার জন্য সেটা আর হয়ে ওঠেনি। তখন থেকে আমাকে প্রচুর লড়তে হয়েছে। এই লাইনটায় অবশ্য সকলকেই লড়তে হয়। নাম হয়ে গেলে লড়াইটা আরও বেশি। কারণ, সাফল্যটা ধরে রাখতে হয়। সেটা খুব সাঙ্ঘাতিক!‌ তার চেয়ে স্ট্রাগলিং পিরিয়ডটা বেটার। তখন তো কারও কোনও প্রত্যাশা থাকে না। 
‌‌ ‌বলিউড বলেই কি নামটা ‘‌চন্দ্রজিৎ’‌ থেকে পাল্টে ‘‌জিৎ’‌ হয়ে গেল?‌
জিৎ:‌ না–না। নামটা বিকৃত হতো। কেউ ‘‌চরণজিৎ’‌ বলত। কেউ ‘‌চন্দরজিৎ’‌ বলত। এক বন্ধু ‘‌জিৎ’‌ নামটা দিল। সেটাই চালু হয়ে গেল। 
‌‌ ‌নিজের সুর–করা সবচেয়ে প্রিয় গান?‌
জিৎ:‌ সব গানই আমার সন্তানের মতো। তবে বাংলায় ‘‌একলা আকাশ’‌, ‘‌ভোলা যায় না’‌। আর হিন্দিতে ‘‌মুসকুরা নে কি বজা তুম হো’‌, ‘‌হমারি আধুরি কহানি’‌ বা ‘‌সুনো না সংগে মর–মর’‌ নিজের খুব ভালো লাগে।
‌‌ ‌এখন হিন্দি আর বাংলায় সেরা গায়ক–গায়িকা কারা?‌
জিৎ:‌‌ এখন তো এমন অবস্থা, যার প্রথম গান হিট করে যাচ্ছে, তাকে আর সেকেন্ড গানে পাওয়া যাচ্ছে না!‌ আসলে মুম্বইয়ে তো মিউজিক ডিরেক্টররা গায়ক–গায়িকা বাছেন না। সিঙ্গাররা সব বিভিন্ন কোম্পানি থেকে আসে। তার মধ্যেও কয়েকজন ভালো গাইছে। বেস্ট বলে আমি কাউকেই মানি না। তবে সোনু নিগম আমার অল–টাইম ফেভারিট। বাংলায় নতুনদের সকলের গলাই ভালো লাগে। তবে ওদের আরও সময় দিতে হবে। তবে সৃষ্টির দিক দিয়ে বাংলা গান হিন্দির চেয়ে অনেক এগিয়ে। হিন্দিতে এখন আবার পুরনো গান নিয়ে কাজ হচ্ছে। যেন নতুন কিছু করার ক্ষমতা নেই। বাংলায় কিন্তু নতুন নতুন কাজ হচ্ছে। 
‌‌ ‌বাংলা গানে ‘‌তুমি’‌র বদলে ‘‌তুই’‌ ডেকে রোমান্স—এটা কি ভালো?‌
জিৎ:‌‌ এটা কিন্তু আমিই চালু করেছিলাম। এখন অনেক কলেজপড়ুয়ারা বন্ধুদের বিয়ে করে। তারা সেই ‘‌তুই’‌–এই রয়ে যায়। সেটা কিন্তু খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে। আর আমার তো মনে হয়, ‘তুই’ ডাকার মধ্যে একটা বাড়তি আন্তরিকতা আছে। আমি আর আমার স্ত্রী চন্দ্রাণীও তো নিজেদের মধ্যে ‘‌তুই–তোকারি’‌ই করি। 
‌‌ ‌সকলকে ফেলে মুকেশ ভাটকে কেন ‘‌গডফাদার’ বলেন‌?
জিৎ:‌ ২০০১ সালে মুম্বইয়ে প্রথম ব্রেক পাই। ২০০৪ সালে বাংলায় কাজ করতে আসি। সেটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। তখনই আমার সুর–করা একটা গান মুকেশ ভাট কারও একটা কলার টিউনে শুনে আমায় ফোন করেন। ভেবেছিলাম, কেউ ইয়ার্কি মারছে। পরে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে উনি আর মহেশ ভাট জানতে চান, কীভাবে ওই গানটা বানালাম। আমি বলেছিলাম, জাস্ট হয়ে গেল স্যার। সেদিন ওঁরা আমার কাছে পরপর গান শুনেছিলেন। তারপর আমায় কাজ দেন। সেই ‘‌আশিকি–২’‌ ছবিতে সুর করা। পঞ্চম’‌দা (‌আর ডি বর্মণ)‌, সলিল চৌধুরীর পর আবার আমার সুর করা গান দিয়ে বাংলা গানের হিন্দি হওয়া শুরু হল। সেদিন ঈশ্বরকে বলেছিলাম, যা দিলে, আর কিছুর দরকার নেই। মিউজিকের যে ল্যাঙ্গোয়েজ হয় না, সেটা সেদিন বুঝেছিলাম। 
‌‌ ‌আপনার ছোটবেলা মানেই আর ডি, সলিল চৌধুরী, মদনমোহন। তাঁদের সুরের পাশে এখনকার সুরকে কোথায় রাখবেন?‌
জিৎ:‌ এটা একটা দারুণ প্রশ্ন!‌ ছোটবেলায় বাবা বলতেন, তুমি জ্যাজ–বিটোফেন যা–ই বাজাও, সলিল চৌধুরীর কর্ড বাজাতে পারলে বুঝব তুমি জিনিয়াস!‌ আমি ভাগ্যবান, বেতারে প্রচুর নমস্য শিল্পীর সঙ্গে গিটার বাজিয়েছি। তাঁদের ঘরানা, তাঁদের শিক্ষা আমায় অনেকটা পথ এগিয়ে দিয়েছে। তখন যে সব গান ভাল হতো, তা নয়। কিন্তু তখনকার গানগুলো অনেক বেশি শ্রোতার কাছে পৌঁছোত। কারণ, তখন ১০০টা টিভি চ্যানেল ছিল না!‌ মানুষের কাছে বিনোদনের এত অপশন ছিল না। তাই আমি মনে করি, এখন যারা গান হিট করাচ্ছে, তারা সত্যিকারের ট্যালেন্টেড। পঞ্চম’‌দা, সলিল চৌধুরী, মদনমোহনরা ঈশ্বর ছিলেন। কিন্তু এখন যারা কাজ করছে, তাদের জগৎটা অনেক কঠিন। এটা ঠিক যে, এখনকার কিছু কিছু কম্পোজারের আরও শিক্ষার প্রয়োজন আছে। কিন্তু এখনকার অনেক গানও কালজয়ী হবে। তাদের সেই সময়টা দিতে হবে। আমরা পজেটিভ দিকটা দেখলেই ভালো। ভাল গান হচ্ছে। হতেই থাকবে। 
‌‌ ‌বয়স ৪০। এখনও পর্যন্ত সেরা অ্যাচিভমেন্ট কী?‌
জিৎ:‌ কাজ করছি ১৮ বছর। অ্যাচিভমেন্ট তখনই হবে, যখন ২৫ বছর পর্যন্ত এইভাবে কাজ করতে পারব। আমি এখনও ছাত্র। আমি এখনও শিখি। উত্থান–পতন থাকবে। কিন্তু আমি ভালো কাজ করতে চাই। 
‌‌ ‌প্রীতমের সঙ্গে গোলমালটা কী?‌ একসঙ্গে আবার কাজ করবেন?‌
জিৎ:‌ কোনও গোলমাল নেই। ব্যবসাটা জমেনি। দেয়ার ইজ নো ব্যাড ব্লাড। দেখা হয়। কথাও বলি। একটা জিনিস করতে গিয়ে মতামতে না–মিললে সেটা তো স্বাস্থ্যকর! আমরা তো মাত্র দুটো ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছিলাম। জুটিটা তো তৈরিই হয়নি! ৫০/‌৬০টা ছবিতে একসঙ্গে কাজ করলে না–হয় একটা কথা ছিল। ভবিষ্যতের কথা বলতে পারব না। তবে এই মুহূর্তে একসঙ্গে কাজ করার প্রশ্ন নেই। দু’‌জনেই স্বাধীনভাবে কাজ করছি। ও ওর মতো। আমি আমার মতো। সেটাই ভালো। 

জনপ্রিয়

Back To Top