থিয়েটার থেকে তঁার যাত্রা শুরু। এক এক করে সিঁড়ি উঠে চলচ্চিত্রে। তবু বাংলা থিয়েটার নিয়ে তঁার অভিমত প্রণিধানযোগ্য। যা শুনলেন লোপামুদ্রা ভৌমিক

শুরু থিয়েটারে। পরে একটা সিনেমা এবং একটা সিরিয়াল লাইম লাইটে নিয়ে এল। তারপর কি থিয়েটার পিছনে চলে গেল?‌
রজতাভ দত্ত: ‌১৯৯০ থেকে ’‌৯৩ পর্যন্ত চাকরি করেছি। এরপর ওয়ান ওয়াল, বোর্ড থিয়েটার, জুনিয়র আর্টিস্টের কাজ করেছি। সিনেমায় ব্রেক ১৯৯৬ সালে তপন সিংহর ‘‌আজব গাঁয়ের আজব কথা’‌। যে ছবির কথা বলা হচ্ছে, সেটা ‘‌পারমিতার একদিন’‌। ২০০০ সালে। আর সিরিয়ালটা ‘‌এক আকাশের নীচে’‌। সেটা ২০০২। দুটো আলাদা আলাদা সময়ে। এর মধ্যে ‘‌তৃষ্ণা’‌, ‘‌আশা’‌, ‘‌রাজেশ্বরী’‌, ‘‌মহাপ্রভু’‌র মতো অজস্র সিরিয়াল করেছি। আলফা বাংলায় বেশ কয়েকটা ধারাবাহিক করেছি। সুতরাং একইসঙ্গে একটা সিরিয়াল এবং একটা সিনেমা আমাকে লাইম লাইটে আনল, এটা ঠিক নয়। ২০০২ থেকে জনপ্রিয় নাটক ‘‌উইঙ্কল টুইঙ্কল’‌–এ চুটিয়ে অভিনয় করেছি। টানা প্রায় ১৪ বছর চলেছিল। ১২৭টা শো হয়েছিল। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত ২২টা থিয়েটার করেছি। তাই থিয়েটার পেছনের সারিতে, এটা একেবারেই ঠিক নয়। 
 পারমিতার একদিন–এর পর তখনকার নাচাগানা নির্ভর রিমেক ছবির কমেডি ও ভিলেন চরিত্র হয়ে গেলেন। এটা এনজয় করতেন নাকি প্রতিভার অপচয় বলে ভাবতেন?‌ 
রজতাভ: একেবারেই অপচয় ভাবতাম না। কারণ, রিমেক ছবিতে কাজ করার সময় অসংখ্য টেলিফিল্ম হত। যেগুলো এখনকার অন্যধারার ছবির সমকক্ষ। বহু বড় পরিচালক ছবিগুলো টেলিভিশনের জন্যই বানাতেন। কারণ, বড় ছবির জন্য সেগুলোর বাজার ছিল না। ৩০টার মতো টেলিফিল্মে রকমারি কেন্দ্রীয় চরিত্র করেছি। এখন নতুন ধারার ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র কিন্তু তখনই আমি করে ফেলেছি। তাই প্রতিভার অপচয়ের প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া কমার্শিয়াল ছবিতে অভিনয়ের তাগিদ সব অভিনেতারই থাকে। এই ধরনের ছবি পুরস্কার এনে দেয় না ঠিকই। কিন্তু জনপ্রিয়তা দেয়। 
 বাংলা সিনেমায় এখন তো অন্যধারাই মূলধারা। এই ধারার ছবিতে আপনাকে সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?‌ 
রজতাভ: গত ছ–বছরে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দু‌টো কাজ করেছি। মৈনাক ভৌমিকের সঙ্গে ছবি করেছি। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের তিনটে ছবিতে কাজ করেছি। পাভেলের ‘‌রসগোল্লা’‌য় কাজ করেছি। তবে এখন আমার যা বয়স এবং চেহারা, তাতে অন্যধারার ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে মানাবে না। তাই মূল চরিত্রের পাশে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাচ্ছি। এটা তো আমার কাছে খুবই আনন্দের। তাছাড়া আমি বাংলাদেশেও প্রচুর ছবি করি। বলিউডে অভিনয় করেছি। ওয়েব সিরিজের মূল চরিত্রে অভিনয় করেছি। আর কী চাই!‌
 অন্যধারার ছবি কি সর্বজনীন হতে পেরেছে?‌
রজতাভ: এখনও পর্যন্ত আমার প্রায় ১৮০টা ছবি মুক্তি পেয়েছে। তার মধ্যে ৬০ ভাগ ছবিতে কমেডি ও ভিলেন চরিত্রে অভিনয়। বাকি ৪০ ভাগ অন্যধারার ছবিতে সিরিয়াস চরিত্রে। জনপ্রিয়তা দিয়েছে কিন্তু ওই ৬০ ভাগ ছবি। অন্যধারার ছবির বাজার বা মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়াটা এখনও খুব সীমিত। বহু মানুষই ওই ধরনের ছবি দেখে উঠতে পারেন না। একটা অন্যধারার ছবি খুব বেশি হলে ৩০টা হল–এ হাউসফুল হয়। আর বাণিজ্যিক ছবি ভাল ব্যবসা করলে ১৫০ হল–এ হাউসফুল যায়। সুতরাং ১৫০টা হলে ৩ সপ্তাহ হাউসফুল চলাটা ৩০টা হলে ৩ সপ্তাহে শনি, রবিবারের তুলনায় অনেক বেশি। সে যতই অন্যধারার ছবির বিদেশে স্ক্রিনিং হোক না কেন। দর্শক আনুকূল্য পাচ্ছে কিন্তু বাণিজ্যিক ছবিই। বাংলা ছবির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এখন ‘‌শোলে’‌র মতো একটা ছবি খুব দরকার। 
 তাহলে কি বলেছেন যে অন্যধারার ছবি দর্শক নিচ্ছেন না?‌
রজতাভ: একেবারেই তা বলছি না। এখন অন্যধারার একটা–দু’‌টো বাদ দিয়ে কোনওটাই মাথার ওপর দিয়ে যাওয়ার ছবি নয়। হয়তো গল্পে অনুভূতিগুলোকে চড়া মেলোড্রামায় দেখানো হচ্ছে না।  এখনকার অন্যধারার ছবিগুলো অনেকটাই তপন সিংহ, অজয় করের কাজের অনুরূপ। কিন্তু সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল সেনকে ছঁুতে পারছে না এখনকার বাংলা ছবি। যেখানে শিল্পও থাকবে আবার তা বাণিজ্যিক ছবির প্রয়োজনীয়তাও মেটাবে। 
 হিন্দি ছবিতেও তো ইদানীং আপনাকে দেখা যাচ্ছে না?‌
রজতাভ: খানচারেক হিন্দি ছবি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। একটা হিন্দি ছবির জন্য অভিনেতাকে কলকাতা থেকে নিয়ে যেতে প্রযোজক, পরিচালককে অনেক হ্যাপা পোহাতে হয়। প্লেনে করে নিয়ে যাওয়া, মুম্বইতে রাখা— সবমিলিয়ে বেশ বড় দায়িত্ব। আমাকে যখন তাঁরা এখনও নিয়ে যাচ্ছেন, নিশ্চয় প্রয়োজন ছিল এবং আছে বলেই। প্রচুর বিভিন্ন ধরণের কাজ করেছি, করছি। হা–হুতাশের কোনও জায়গা নেই। 
 বেশি জনপ্রিয়তা কি আপনাকে মীরাক্কেল এনে দিয়েছে?‌
রজতাভ: জনপ্রিয়তা তো মাপা যায় না। সেটা অনেককিছুর ওপর নির্ভরশীল। ব্যানার, দর্শকানুকুল্য, প্রয়োজনীয়তা এমন অনেক কিছু। আমি সব কাজেই আমার সবটুকু নিংড়ে দিই। তার মধ্যে কোনওটা হয়ত তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। কিন্তু কোনওটা কোনওটার সঙ্গে তুলনায় আসে না।
 ‘‌উইঙ্কল টুইঙ্কল’‌ থেকে ‘‌তুঘলক’‌— থিয়েটার বদলেছে?‌
রজতাভ: তখনও ভাল নাটক হত। এখনও হচ্ছে। তবে এখন সব নাটক দেখা হয়ে ওঠে না। বন্ধুবান্ধব, থিয়েটারকর্মীদের কাছ থেকে যা শুনি তাতে আমার ধারণা, ইদানীং মফস্বলের দলগুলো অত্যন্ত ভাল প্রযোজনা উপহার দিচ্ছে। কিন্তু কলকাতা থেকে দূরে থাকায় সেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। আমার থিয়েটারপ্রেমী কিছু বন্ধুবান্ধব চেষ্টা করছে, মফস্বলের ভাল দলগুলোকে কলকাতায় এনে একটা উৎসব করানোর। থিয়েটারটা সব অভিনেতাই তুলে রাখে ভালবাসার নিরিখে। সেখানে সে নিজেকে নিংড়ে দিতে চায়। কলকাতার থিয়েটারে এখন যে ফ্রিল্যান্স অভিনেতা–নির্দেশকের ছড়াছড়ি, তাতে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে থিয়েটারেরই। থিয়েটার একটা দীর্ঘকালীন ঘষামাজার শিল্প। পর্যাপ্ত সময় না নিয়ে কিছু একটা নামিয়ে দিলে তার শিল্পে ঘা তো লাগবেই।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top