হাওড়ায় জন্ম, কর্ম টালিগঞ্জে। প্রতিভাবান অভিনেতা তিনি ছিলেনই। সঙ্গে এখন রাজনীতির যোগ। জীবন, যৌবন, ধনমান নিয়ে প্রশ্ন করেছেন অদিতি রায়

‌ হাওড়া থেকে ‘ভিঞ্চিদা‌’‌ পর্যন্ত পৌঁছতে কত সময় লাগল আর কোথায় কোথায় স্টপ দিতে হল?
রুদ্রনীল ঘোষ: হাওড়া থেকে সিনেমা বা থিয়েটার দেখতে রবীন্দ্রসদন চত্বরে পৌঁছতে সময় লাগত পৌনে ২ ঘণ্টা। কারণ, হাওড়া স্টেশন হয়ে আসতে হত। দ্বিতীয় হুগলি সেতু দিয়ে শুধু বড়লোকদের গাড়ি যেত!‌ আর ‘ভিঞ্চিদা‌’‌ অবধি পৌঁছতে ১৯৯৮ থেকে ২০১৯ লাগল!‌ ‌মাঝখানে ‘চ্যাপলিন‌’‌ একটা গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজ ছিল। সেটা ঘটেছিল ২০১২–‌তে।
‌ এখন তো দ্বিতীয় হুগলি সেতু গাড়িতেই পেরোন?‌
রুদ্রনীল: কোনওদিন রিক্সায় ফিরতে হবে কিনা কে জানে!‌ আমি প্রচুর পেতে দেখেছি। হারাতেও দেখেছি। যোগ্যতার থেকে বেশি চেয়ে ফেললে দর্শকই প্রধান বিচারক। কাজেই নিজের শিল্পে সৎ থাকতেই হবে। দোকান সাজিয়ে বসে আছি। আমি দশকর্মা ভাণ্ডার। সব ধরনের মাল আছে আমার দোকানে।
‌ কী কী হার্ডল টপকাতে হয়েছে রুদ্রনীল ঘোষকে?‌
রুদ্রনীল: ওপরতলায় কোনও যোগাযোগ ছিল না আমার। যখন ইন্ডাস্ট্রিতে আসি, তখন ছোটপর্দার অভিনেতারা ছোট অভিনেতা, বড়পর্দার অভিনেতারা বড় অভিনেতা— এই শ্রেণিবিভেদটা ভীষণ রকম ছিল। গায়ের রঙ কালো হলে তো কথাই নেই!‌ তাদের চাকরবাকর বা খারাপ লোকের চরিত্র ছাড়া অন্য কোনও ভূমিকায় মেনে নেওয়া হত না। কোনও ‘ভদ্রলোক‌’‌‌–এর গায়ের রঙ কী করে শ্যামলা হবে?‌ নায়ক মানেই তো ফর্সা এবং লম্বা!‌ এটাই ছিল ইন্ডাস্ট্রির মানসিকতা। তাই আমাকে ‘‌অ–ভদ্রলোক’‌–এর চরিত্রেই ভাবা হত। কিন্তু দর্শক শ্যামলা রঙের, সাড়ে ৫ ফুট উচ্চতার এই ছেলেটিকে পছন্দ করে ফেললেন। একটু একটু করে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে এই বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে। হাইট নিয়েও ফাইট করতে হয়েছে (হাসি‌)‌‌।
‌ ‘১ নং মেসবাড়ি‌’‌ ধারাবাহিকে কৌতুকাভিনেতা হিসেবেই তো প্রথম জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন?‌
রুদ্রনীল: হ্যাঁ। কিন্তু তাতে একটা মুশকিলও হয়েছিল। আমাকে ‘কমেডিয়ান‌’‌ তকমা লাগিয়ে বারবার ওই জোনটাতেই ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। আমিও বারবার ডজ করে বেরিয়ে গেছি আমার বুদ্ধি বা কলম প্রয়োগ করে। একটা মেন্টাল ব্লক রয়েছে এই ইন্ডাস্ট্রির। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় ‘‌কাহানি’‌ না করলে এই ইন্ডাস্ট্রি বুঝতেই পারত না তিনি কতবড় অভিনেতা! এজন্য এখনও মিস করি বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে। যিনি সাধারণ মানুষের মতো দেখতে অভিনেতাদের নিয়ে ভাবতেন। আর দর্শক আমার মতো ‘‌দেখতে’‌ অভিনেতাদের যে কোনও চরিত্রে পছন্দ করে ফেললে তাকে আড়চোখে দেখার একটা প্রবণতাও এই ইন্ডাস্ট্রির আছে।
‌ সেজন্য রাগ হয় না?‌ আপনাকে ঘিরে বিতর্কও তো আছে। সেগুলোই বা হ্যান্ডল করেন কীভাবে?‌
রুদ্রনীল: আগে রাগ হত। এখন হয় না (হাসি‌)‌। রাগ তো এক ধরণের এনার্জি। সেটাকে আমি অন্যদিকে ডাইভার্ট করার কৌশল জেনে গেছি। আমার কাজে ১০০ শতাংশ এনার্জি দিয়ে সেটাকে চ্যানেলাইজ করি। এটাই তো শিল্পের মজা। আমি রেগে গিয়ে কাউকে কামড়ে দিলাম, সেটার মধ্যে তো শিল্প নেই। রাষ্ট্র কামড়ানোকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করলে তখন না হয় ভাবা যাবে (‌হাসি)! কী জানেন, যোগ্যতা এবং স্ট্র‌্যাটেজি মিলিয়েই তৈরি হয় সাকসেস স্টোরি। যস্মিন দেশে যদাচার। আমাকে খাপ খাওয়াতেও জানতে হবে। আর বিতর্ক সামলাতে ‌কিচ্ছু করি না।‌ ঝগড়া করব কার সঙ্গে?‌ গোটা দুনিয়ায় এই একটা যুদ্ধ, যার কোনও ফলাফল নেই। পরমব্রত, কাঞ্চন, সৃজিত, যিশু— এদের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারি। কারণ এরা আমার বন্ধু।
‌ আপনার আর পরমব্রতর সমীকরণটা কী বলুন তো?‌ বিশেষ কোনও নারীকে নিয়ে আপনারা নাকি দ্বন্দ্বযুদ্ধে?
রুদ্রনীল: (‌হাসতে হাসতে)‌‌ এটা আসলে আমাদের দোষ নয়। এটা মেয়েটির সমস্যা। তার বিভিন্ন ধরণের মেধা দরকার। তার যেমন আমার দোকানের লোকাল বিদ্যাপতি দরকার, তেমনই পরমের দোকানের শেলী-‌কিট্‌স দরকার। মেয়েটি আসলে ন্যাশনাল লাইব্রেরি হয়ে ওঠার চেষ্টা করে।‌
‌ সলমন খানের মতো এলিজেব্‌ল ব্যাচেলর থাকতে চান?‌
রুদ্রনীল: আমার সংগ্রামজীবনের এক এবং অদ্বিতীয় বন্ধু রাজ চক্রবর্তী কখনও বলে, লজ্জা করে না? ৪০–‌টা প্রেম করে বেড়াচ্ছিস! বিয়ে কর। থিতু হ’‌। আবার একবছর পর বলে, শোন, আর যা–ই করিস, বিয়ে করিস না!‌ ওর সঙ্গে দু’বছর কথা বন্ধ ছিল। তখন ও খুব সাজুগুজু করত (খিক খিক হাসি)। এখন নিজে বিয়ে করার পর থেকে রোজ আমাকে বলছে বিয়ে করতে। আমি অপেক্ষা করছি, কবে বলবে— একদম বিয়ে করবি না‌!‌ আর আমি সলমন খানের মতো অতো সৎ এবং সাহসী নই। যে মদ‌–টদ খেয়ে নিষ্পাপ, সরল শিশুর মতো হরিণ মেরে ফেলছে। ফুটপাথে গাড়ি তুলে দিচ্ছে বা প্রেমিকার বাড়ির সামনে গিয়ে চেঁচিয়ে বলছে, নেমে আয় টুকটুকি, নইলে তোর কান ছিঁড়ে দেব!‌ গত ৪/‌৫ বছর ধরে খেয়াল করেছি, সন্ধের পর থেকেই একা থাকতে ইচ্ছে করে। মাঝেমধ্যে কাছের বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিয়েটিভ আড্ডা হয়, যেখানে সৃজিত হয়ত গোদার হয়ে গেল। আমিও আল‌ পাচিনো হয়ে গেলাম। যিশু এসে হয়ত বলল, ও অ্যান্টনি হপকিন্স‌। মাঝখানে কৌশিক গাঙ্গুলি এসে বললেন, সব মায়া। ওঁকে লালন হতে হবে।‌ এসবের মাঝেও আমি দুম করে একা হয়ে যাই। এর মধ্যে বিয়ে করে একটা মেয়ের জীবন দুর্বিসহ করে কী লাভ‌‌। দিনের শেষে তার সঙ্গে সাংসারিক গল্প‌গাছা আপাতত আমার পোষাবে না।
‌ ভোটে দাঁড়ালেন না কেন?‌
রুদ্রনীল: ভোট সমাজসেবা নয়। এটা একটা রাজনৈতিক কৌশল। একটা রাজনৈতিক দল সেই স্ট্র‌্যাটেজি থেকেই ঠিক করে, কাকে কোথায় ভোটের টিকিট দেবে। আমি দীর্ঘদিন বামপন্থী রাজনীতি করে এসেছি। বামপন্থা নিয়ে আমার কোনও বিরোধিতা নেই। বামপন্থা যে কোনও রাজনৈতিক দলের থাকতে পারে। এটা সিপিআইএমের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। আর সত্যি বলতে কী, গত একবছর ধরে যে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে আমাদের দেশে, সেটা আমাকে খুব পীড়া দিচ্ছে। যে কোনও রাজনৈতিক দল শুধু ক্ষমতাদখলের লড়াই চালাচ্ছে, এটাও আমাকে খুব ব্যথিত করে। তাই নির্বাচনে লড়ার কোনও ইচ্ছেই আমার নেই।

জনপ্রিয়

Back To Top