খুব একটা উত্তেজিত হন না। ‘থিয়েটারের শান্তিগোপাল’ বিশেষণ শুনে ধারালো জবাবও দিলেন শান্তভাবেই। অভিনেতাকে প্রশ্ন করেছিলেন লোপামুদ্রা ভৌমিক।

 ‌শুধুই অভিনেতা। নির্দেশনায় গেলেন না কেন?‌
দেবশঙ্কর হালদার: অভিনেতা হব বলেই থিয়েটারে এসেছিলাম। কিন্তু অভিনয় করতে গেলে নির্দেশনাও যে জানতে হয়, সেটা জানা ছিল না। অভিনেতার ঠিকঠাক কাজে মনোনিবেশ করতে অনেকটা সময় লাগে। তার চেয়েও বেশি সময় লাগে নির্দেশকের। কারণ, তিনি পুরোটা ধারণ করেন। আমার মত একজন পেশাদার, সর্বক্ষণের অভিনেতার কাছে অভিনয়টাই প্রথম প্রাধান্য। অভিনয় নিয়ে চিন্তাভাবনা, অভিনয়ের প্রকাশ, মঞ্চে গিয়ে দর্শকদের সঙ্গে মোকাবিলা আমাকে যতটা টানে, নির্দেশনা ততটা নয়। ঘটনাচক্রে অনেকেই নির্দেশক বনে যান। আমিও হয়ত কখনও বনে যাব।  তবে ছোটদের নাটকে নির্দেশনার কাজ করেছি। ছোটদের থিয়েটারকে পাত্তা দেওয়া হয় না বলে সেটা অনেকেরই অজানা। 
 ‌এখন একই অভিনেতা বিভিন্ন দলে অভিনয় করছেন। এটা গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনকে কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল করেছে?‌
দেবশঙ্কর: গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন বলে আদৌ কিছু আছে কিনা জানি না। আমরা কিছু নাট্যনির্মাণ করি, তার উপস্থাপন করি, সেগুলো কিছুদিন চলে, দর্শকের মনোরঞ্জন করে, কিছু চিন্তার জন্ম দেয়। ব্যস্‌। আবার একটা নতুন নাটক আসে। আমার উৎকর্ষ বৃদ্ধির ফলেই আমি বিভিন্ন দলে বিভিন্ন চরিত্রে একসঙ্গে অভিনয় করছি। এতে আমার উপকার হয়েছে। নাট্যদলগুলোর উপকার হয়েছে কিনা তারা বলতে পারবে। ফ্রিল্যান্স অভিনেতাদের জন্য নাট্যজগতের ক্ষতি হলে আমি কি আর এতদিন টিকতাম?‌ 
 ‌বিভিন্ন নাট্যদলের ভিন্নতাকে লালন করেন কীভাবে?‌ 
দেবশঙ্কর: ওটাই তো মজা। অচেনা–অজানা জায়গায় গিয়ে আবিষ্কার আর প্রয়োগ নিজেকে প্রকাশের একটা উৎকৃষ্ট উপায়। আমি এটায় আনন্দ পাই। আসলে আত্মীকরণটা দু’‌তরফেই। তাঁরা আমায় মেনে নেন। আমিও তাঁদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিই। 
 ‌বায়ো–নাটকের অন্যতম অভিনেতা আপনি। বিবেকানন্দ, শিশির ভাদুড়ী, দেবব্রত বিশ্বাস, ঔরঙ্গজেব.‌.‌.‌। মেলান কীভাবে?‌
দেবশঙ্কর: এঁদের সম্পর্কে মানুষের একটা সম্যক ধারণা আছে। সেই জ্ঞানটাকেই নিজের ভেতরে লালন করি। বাকিটা নিজের মনের মাধুরী মেশানো। এভাবেই চরিত্রের গভীরে ডুবে যাওয়া। অভিনয় তো নকলনবিশি নয়। বাইরের চেহারায় মিলুক বা না মিলুক, ভেতরের মানুষটাকে সত্য করে তোলাই আমার কাজ। 
 ‌আপনাকে ‘‌থিয়েটারের শান্তিগোপাল’‌ বলা হয়। মানেন?‌
দেবশঙ্কর: কিছু ইন্টেলেকচুয়াল লোকের রসিকতা। শান্তিগোপাল একসময় এ ধরণের বহু চরিত্র করতেন। যাঁরা এসব বলেন, তাঁরা একটু তথ্যনির্ভর হলে দেখবেন আমি এ ধরণের যত চরিত্র করেছি, তার চেয়েও অনেক বেশি নানা রকমের চরিত্রে অভিনয় করেছি। সেগুলো অনেক বেশি জনপ্রিয়। এসব বলে একটা নতুন কিছু বলার স্বাদ পাওয়া যায় আর কি!‌ শব্দচয়নে সাবধানী হলে বোধহয় ভাল।
 ‌‘‌একালের শম্ভু মিত্র’‌ বললে কতটা গর্বিত বা লজ্জিত হন?‌
দেবশঙ্কর: যথেষ্ট লজ্জিত হই। যাঁরা এই তকমা দিয়েছেন, তাঁরা হয়তো আমায় সম্মান এবং মর্যাদাই দিতে চেয়েছেন। কিন্তু সেটা তুলনা টেনে না বলাই ভাল। আর শম্ভু মিত্র থিয়েটারের এমন প্রণম্য, এতটা বিপুল প্রতিভাধর, অসীম যোগ্যতাসম্পন্ন সদর্থে বাঙালি, যে তাঁকে প্রণাম করা ছাড়া সত্যি আর কিছু করা চলে না।
 ‌এখন তো থিয়েটারে প্রচুর গ্রান্ট। অর্থের এই প্রতুলতা থিয়েটারের কতটা উন্নতি করেছে?‌
দেবশঙ্কর: সবাই গ্রান্ট পায় না। আজও অনেকেই গয়না বেচে, জমিজমা বিক্রি করে থিয়েটার করে। আগেও গ্রান্ট ছিল। কিন্তু এত সহজ সুযোগ ছিল না। থিয়েটারের অর্থনীতি দেখলে বোঝা যাবে গ্রান্ট পেয়েও অনেক বড় বা মাঝারি দল খরচ সামলাতে পারছে না। যাঁরা ফাঁকি দেন, টাকা মারেন তাঁদের কথা আলাদা। টাকা আসা তো ভাল। কিন্তু তা দিয়ে কী তৈরি হচ্ছে সেটা দেখা দরকার। 
 ‌বর্তমান যুগে থিয়েটার কতটা আম–জনতার?‌
দেবশঙ্কর:
মারাত্মক বড়লোক নয়, খেয়ে–পরে, বুদ্ধিবিবেচনা নিয়ে যাঁরা বেঁচে থাকেন, তাঁদের জন্য নাগরিক থিয়েটারের মধ্যেই আমরা বিরাজ করেছি এবং করছি। আমরা যে থিয়েটার করি, তা  কোনওদিনই আমজনতার হয়ে উঠতে পারবে না। প্রত্যন্তে গিয়ে আমাদের থিয়েটার চলবে না। কারণ, আমাদের থিয়েটারের ভঙ্গিমা, প্রকাশ কোনওটাই ওইসব অঞ্চলের মানুষদের জন্য নয়। তাঁদের উপযোগী আমরা কিছু করে উঠতে পারিনি। হয়তো করতে চাইওনি। তাদের ভঙ্গিমায় থিয়েটার করতে গেলে আমূল পরিবর্তন করতে হবে। সেই জায়গায় যাত্রা অনেক বেশি সফল। আমাদের নাগরিক থিয়েটার কলকাতা ও কিছু মফঃস্বলেই সীমাবদ্ধ। 
 ‌থিয়েটারের অভিনয়শৈলী সিনেমায় অভিনয়েও ছাপ ফেলে?‌
দেবশঙ্কর: দুটোতেই অভিনয় প্রধান হলেও চাহিদা আলাদা। সেটা বুঝে নিয়ে তবেই অভিনয় করতে হয়। অভিনয়এর কাছে পৌঁছতে হয়। অভিনেতা কখনও পারেন। কখনও পারেন না। ব্যক্তিগতভাবে ছবিতে অভিনয় করার সময় সিনেমা–মাধ্যমের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করি। আমি তো মঞ্চের মানুষ। মঞ্চকে সময় দিয়ে হাতে সময় থাকলে সিনেমা করি। তাই মঞ্চের সঙ্গে আমার যে বন্ধুত্ব, সিনেমার সঙ্গে তা হবে কী করে?‌ 
 ‌বাংলা থিয়েটারের ভবিষ্যৎ কী?‌
দেবশঙ্কর:
থিয়েটার যে বেঁচে আছে, তার থেকে বড় সাফল্য আর কিছু নেই। এই সময়ে দাঁড়িয়েও যে বাংলা থিয়েটার টিকে আছে, এটা অনেক বড় ব্যাপার। থিয়েটার কোনও মহৎ পথের দিশা দিতে পারল কিনা বলতে পারব না। আর আমি অতটা আশাও করি না।

জনপ্রিয়

Back To Top