আজকালের প্রতিবেদন
‌আপাতত স্থিতিশীল করোনায় আক্রান্ত অমিতাভ বচ্চন এবং তাঁর পুত্র অভিষেক। কিন্তু বচ্চন পরিবারের উদ্বেগ বাড়িয়ে কোভিড পরীক্ষার পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে অভিষেকের স্ত্রী ঐশ্বর্য এবং তাঁদের কন্যা আরাধ্যার। অমিতাভর স্ত্রী জয়া বচ্চন এবং তঁাদের কন্যা শ্বেতা, শ্বেতার পুত্র অগস্ত্য ও কন্যা নব্যা নভেলি অবশ্য কোভিড নেগেটিভ। 
শনিবার অমিতাভ–অভিষেকের করোনা ধরা পড়ার পর জয়া, ঐশ্বর্য এবং আরাধ্যার র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট হয়। তাতে রিপোর্ট নেগেটিভ আসে। পরে লালারস পরীক্ষায় রবিবার মা–মেয়ের রিপোর্ট পজিটিভ আসে। তবে জয়ার লালারস পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভই এসেছে। ঐশ্বর্য–আরাধ্যার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর এদিন দুপুরে টুইট করে জানান মহারাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাজেশ টোপে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি আবার টুইটটি মুছে দেন। তৈরি হয় ধোঁয়াশা। এর পর বৃহন্মুম্বই পুরসভা সরকারিভাবে মা–মেয়ের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথা জানায়। পাশাপাশিই বলা হয়, অমিতাভ এবং অভিষেক হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও ৪৬ বছরের ঐশ্বর্য এবং ৮ বছরের আরাধ্যার চিকিৎসা বাড়িতেই হবে। মা–মেয়ে দু’জনেই উপসর্গহীন। 
অমিতাভরা আক্রান্ত হওয়ার পর মুম্বইয়ে বচ্চন পরিবারের চারটি বাংলো ‘প্রতীক্ষা’, ‘জলসা’, ‘জনক’ এবং ‘বৎস’ পুরোপুরি ‘সিল’ করে দিয়েছে পুরসভা। সেগুলিকে কন্টেনমেন্ট জোন ঘোষণা করে জীবাণুমুক্ত করার কাজও হয়েছে। পুরসভার তরফে বলা হয়েছে, অমিতাভর সংস্পর্শে আসা ৩০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের কোভিড পরীক্ষা করা হয়েছে। সকলকেই কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, সারা দেশের মধ্যে মহারাষ্ট্রেই করোনা পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। কিন্তু গোটা দেশকে চমকে দিয়েছে বচ্চন পরিবারের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর। 
করোনা হানা দিয়েছে অভিনেতা অনুপম খেরের পরিবারেও। অনুপম নিজে সংক্রমণের শিকার না হলেও তাঁর মা দুলারি, ভাই রাজু, ভ্রাতৃবধূ এবং ভাইঝি করোনায় আক্রান্ত। অনুপমের মা–কে কোকিলাবেন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। রবিবার টুইটারে এক ভিডিওবার্তায় প্রবীণ অভিনেতা বলেন, ‘মায়ের ‌খিদে কমে গিয়েছিল। অসুস্থ বোধ করছিলেন। শনিবার পরীক্ষায় মৃদু করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে মায়ের শরীরে। সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। আপাতত তিনি স্থিতিশীল।’‌ অনুপম আপাতত বাড়িতেই কোয়ারেন্টিনে। অনুরাগীদের কাছে তাঁর অনুরোধ, ‘সবাই পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের দিকে খেয়াল রাখুন। সামান্যতম সমস্যা চোখে পড়লেই চিকিৎসা করান। পরামর্শ নিন চিকিৎসকের।’‌
ঘটনাচক্রে, বান্দ্রায় অভিনেত্রী রেখার বাংলো ‘সি ‌স্প্রিং’‌ শনিবারই ‘সিল‌’ করেছে পুরসভা। বাংলোর ২ নিরাপত্তারক্ষীর মধ্যে একজন করোনায় আক্রান্ত। বাংলোটিকে কন্টেনমেন্ট জোনের আওতায় এনেছে পুরসভা। তবে রেখা করোনায় আক্রানত এমনকিছু শোনা যায়নি। 
শনিবার রাতে হেমা মালিনীরও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়, শ্বাসকষ্ট নিয়ে নাকি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ‘ড্রিমগার্ল’। ফেসবুকে রানি মুখার্জির নামে একটি ভুয়ো পেজ থেকে হেমা আর রানির ছবি শেয়ার করে লেখা হয়, ‘‌কিছুক্ষণ আগেই আমার নাচের শিক্ষাগুরুকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হাসপাতালে। ধর্মেন্দ্রজি, দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে হেমাজির জন্য সবাইকে প্রার্থনা করার আন্তরিক অনুরোধ জানিয়েছেন।’ পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার পর হেমার মেয়ে এষা টুইট করে জানান, ‘‌মায়ের সম্বন্ধে যা শুনছেন পুরোটাই ভুয়ো। একদম সুস্থ মা। বাড়িতেই আছেন। কোথাও ভর্তি হননি।’‌
শনিবার অমিতাভ এবং অভিষেকের কোভিড–১৯ পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ আসে৷ রাত ১০টা নাগাদ তাঁরা মৃদু উপসর্গ নিয়ে নানাবতী হাসপাতালে ভর্তি হন। রাত ১০টা ৪২ মিনিটে অমিতাভ নিজেই টুইট করে জানান, তিনি করোনায় আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। প্রশাসনকেও খবর দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে পরামর্শ, ‘‌গত ১০ দিনে আমার সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা দয়া করে করোনা পরীক্ষা করিয়ে নিন।’ রাত ১১টা ৫৭ মিনিটে অভিষেকও টুইট করে তাঁর করোনায় আক্রান্ত হওয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথা জানান। রাতেই গোটা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সপুত্র অমিতাভর অসুস্থতার খবর। তৈরি হয় ব্যাপক উদ্বেগ। দীর্ঘ ৩৭ বছর আগে ১৯৮২ সালে ‘কুলি’ ছবির সেটে অ্যাকশন দৃশ্য করতে গিয়ে পুনিত ইসারের ঘুসি খেয়ে পড়ে যেতে যেতে এক দুর্ঘটনায় জখম হয়েছিলেন অমিতাভ। প্রথমদিকে বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নিলেও পরে ক্রমশ পরিস্থিতি ঘোরাল হতে থাকে। শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ থামানো না যাওয়ায় প্রাণসংশয় হয়ে পড়ে বলিউডের সুপারস্টারের। মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হন অমিতাভ। কিন্তু তখন থেকে তাঁর শরীরে একাধিক রোগ বাসা বেঁধেছে বলে তিনি নিজেই একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। এমনিতেই অমিতাভর অ্যাজমা আছে। ২০০০ সালে তাঁর দেহে যক্ষ্ণার লক্ষণও ধরা পড়েছিল। যদিও তিনি সেই রোগ থেকে মুক্ত। যে দীর্ঘস্থায়ী রোগটি তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে, তা হল ‘মায়াস্থেনিয়া গ্রেভিস’। সেই প্রেক্ষিতে ‘স্থিতিশীল’ হলেও করোনায় আক্রান্ত অমিতাভকে নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। কারণ, তখন তিনি ছিলেন চল্লিশের যুবক। এখন সাতাত্তরের বৃদ্ধ। করোনাশাস্ত্রের পরিভাষায় অমিতাভর দেহে একাধিক ‘কো–মর্বিডিটি’ রয়েছে। 

 

অমিতাভর অসুস্থতার খবর পেয়ে শনিবার রাতেই ঘোর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তিনি সরাসরি ফোন করেন জয়াকে। জয়া তাঁকে জানান, অমিতাভ হাসপাতালে ভর্তি হলেও স্থিতিশীল আছেন। রাতেই অমিতাভর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে টুইট করেন মমতা। তার পর থেকেই অবিরাম টুইটে অমিতাভর আরোগ্যকামনা শুরু হয়। বলিউডের সহকর্মীরা তো বটেই, আমজনতার শুভেচ্ছায় উপচে পড়েছে সুপারস্টারের টুইটার হ্যান্ডল। তাঁদের মধ্যে যেমন আছেন লতা মঙ্গেশকর, তেমনই আছেন শচীন তেন্ডুলকার, অক্ষয়কুমাররা। 
হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছে, এদিন হালকা জ্বর ও সামান্য শ্বাসকষ্ট ছিল অমিতাভর। কিন্তু তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল। ঘটনাচক্রে, অমিতাভ এবং অভিষেকের দ্বিতীয় কোভিড পরীক্ষার রিপোর্টও পজিটিভ এসেছে। অমিতাভর চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন ডাঃ আনসারি। যিনি করোনার চিকিৎসায় বিশেষ দক্ষ বলেই পরিচিত। গড়া হয়েছে ৭ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল। ২৪ ঘণ্টা চলছে কড়া নজরদারি। বর্ষীয়ান অভিনেতাকে রাখা হয়েছে আইসোলেশন ওয়ার্ডে। ডাঃ আনসারি জানিয়েছেন, অসুস্থ হলেও অমিতাভ স্থিতিশীল। সর্বক্ষণ তাঁর শরীর সংক্রান্ত বিবিধ বিষয় নজরে রাখা হচ্ছে। প্রাতরাশে টোস্ট এবং ফলের রস খেয়েছেন তিনি। 
হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে, অমিতাভর শরীর সংক্রান্ত কোনও রুটিন বুলেটিন প্রকাশ করা হবে না। তবে সাম্প্রতিক অতীত বলছে, অমিতাভ নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর শরীর সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সরবরাহ করেন। যেমন শনিবার রাতেই তিনি হাসপাতাল থেকে এক ভিডিওবার্তা রেকর্ড করেছেন। যেখানে তিনি চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রণাম জানিয়েছেন। ভিডিওতে যা শোনা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে অমিতাভর ব্যারিটোন অমলিন। দিনতিনেক আগেই অমিতাভ টুইটারে ‘গুজর যায়েগা’ শীর্ষক একটি কবিতা আবৃত্তি করে পোস্ট করেছিলেন। যাতে তিনি অভয় দিয়ে বলেছিলেন, এই সঙ্কটের সময় কেটে যাবে। ঘটনাচক্রে, তিনিই এখন করোনায় সঙ্কটাপন্ন। 
হাসপাতাল সূত্রের খবর, আগের থেকে ভাল আছেন অভিষেক। মনে করা হচ্ছে, অভিষেকের থেকেই সংক্রমিত হয়েছেন অমিতাভ। বলা হচ্ছে, মুম্বইয়ের আন্ধেরিতে ‘‌সাউন্ড এন্ড ভিশন’ ডাবিং স্টুডিও থেকে অভিষেক নিজে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন। ওয়েব সিরিজ ‘‌ব্রিদ: ইনটু দ্য শ্যাডোজ’‌–এর জন্য বেশ কয়েকদিন ওই স্টুডিওতে ডাবিংয়ের কাজ করেছিলেন জুনিয়র বচ্চন। বস্তুত, গত ২৬ জুন একটি চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে ওই ডাবিংয়ের কথা বলেওছিলেন অভিষেক। সেখানে তিনি মাস্ক সরিয়ে ডাব করার কথা বলেছিলেন। কারণ, সিরিজটিতে ‘সিঙ্ক সাউন্ড’ ব্যবহার করা হয়েছিল। অভিষেক সেখানে অভিনয় করেছেন মনোবিদ অবিনাশ সাবরওয়ালের চরিত্রে। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কাজ করতে গিয়ে নার্ভাস হইনি। কারণ, সবরকম সাবধানতা নিয়েই কাজ শুরু করেছিলাম সকলে। মাস্ক সরিয়ে ডাব করতে হয়েছে। কারণ, সিরিজে সিঙ্ক সাউন্ড ব্যবহার করা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কাজ হয়েছে। আমি বরং আমার বাবা–মায়ের জন্য চিন্তিত। কারণ, তাঁদের একজনের বয়স ৭৭ বছর। অন্যজনের ৭২।’ গত শুক্রবার সিরিজটি অ্যামাজনে মুক্তি পেয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ৩ কোটি দর্শক সিরিজটি ‘স্ট্রিম’ করেছেন। টুইটারে এক বিবৃতি পোস্ট করে তাঁদের ধন্যবাদও দিয়েছিলেন অভিষেক। অভিষেক কোভিড পজিটিভ জানার পর ডাবিং স্টুডিওটিও বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। 
শনিবার অমিতাভরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর রবিবার সকালেই বৃহন্মুম্বই পুরসভার একটি দল হাজির হয় জুহুর ভি এম মেহতা রোডে অমিতাভর ১০,০০০ বর্গফুটের বাংলো ‘‌জলসা’‌য়। গত তিন দশক ধরে প্রতি রবিবার নিয়ম করে খুলে যেত এই বাংলোর দরজা। সামান্য উঁচু পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বলিউডের ‘জীবন্ত কিংবদন্তি’‌ হাত নেড়ে দেখা দিতেন ভক্তদের। এই রবিবারও খুলল। তবে পুরসভার কর্মীদের সাফাই অভিযানের জন্য। গোটা বাংলোটি জীবাণুমুক্ত  করা হয়েছে। ছিলেন কয়েকজন চিকিৎসকও। এর পরই ‘সিল’ করে দেওয়া হয় বাংলোটি। বাইরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ‘‌কন্টেনমেন্ট জোন’‌ বোর্ড৷ ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয় আশপাশের এলাকা৷ স্যানিটাইজ করার পর ‘সিল’ করে দেওয়া হয়েছে বিগ বি–র অন্য তিনটি বাংলো‌ও। চারটি বাংলোর সমস্ত কর্মীকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। তাঁদেরও করোনা পরীক্ষা হয়েছে।  
অমিতাভর সুস্থতা কামনায় দেশজুড়ে পুজোপাঠ শুরু হয়ে গিয়েছে। কলকাতাও পিছিয়ে নেই। হোমযজ্ঞ হয়েছে উত্তর কলকাতায়। হাতিবাগানের ৩০০ বছরের বেশি প্রাচীন শনিমন্দির এবং কৃষ্ণরাম বোস স্ট্রিটের ৩০০ বছরের পুরনো শিবমন্দিরে যজ্ঞ হয়েছে এদিন। স্থানীয় বাসিন্দারাই ছিলেন যজ্ঞের উদ্যোক্তা। টানা দু’‌ঘণ্টা চলে প্রার্থনা।

জনপ্রিয়

Back To Top