আজকাল ওয়েবডেস্ক: ‘‌কত কী করার আছে বাকি’। কিন্তু সময় বোধহয় বড্ড কম। তাই হয়ে উঠল না অনেককিছুই। কিন্তু যেটুকু হল, তাতেই মানুষ মনে রাখবে ‘‌মহীনের ঘোড়াগুলিকে’ আর রঞ্জন ঘোষালকেও।
১৯৭৫–৭৬ থেকেই ‘‌মহীনের ঘোড়াগুলি’‌ সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শিল্পী, লেখক হিরণ মিত্র আর সঙ্গীতশিল্পী, বেহালাবাদক আব্রাহাম মজুমদার। রঞ্জন ঘোষালের মৃত্যু দাগ কেটে দিয়েছে এঁদের মনে। গায়ক গৌতম চট্টোপাধ্যায় মারা যাওয়ার পরেই বাংলার প্রথম ব্যান্ডটি অনেকদিন আগেই নিজের পথ হারিয়ে ফেললেও আড্ডা তাঁদের থামেনি। আর আড্ডা মানেই তো কিছু নতুন শিল্পের সৃষ্টি। তাঁদের মুখে শুনে নিই বাকিটা।

হিরণ মিত্র
আজ শুধু ওর মজার মজার কাণ্ডগুলোর কথা মনে পড়ছে। রঞ্জনকে নিয়ে আর কী বলব! ও এমন এমন কাণ্ড ঘটাত, যার একটা পুরো উপন্যাস হয়ে যায়। দু’‌একটা বলছি তবে। আচমকা একটা ফোন, ‘‌শোনো হিরণদা, আমার বই প্রকাশ হবে টলিক্লাবে। চলে এসো। ফর্মাল কিছু পরতে হবে না। সাধারণ কিছু পরে এসো।’‌ টলিক্লাবে বই প্রকাশ! একটু সন্দেহ হয়েছিল বটে। গিয়ে দেখি, মস্ত আয়োজন, কারওর বিয়ে হচ্ছে। একী! এখানে টেনে আনল কেন আমাদের? লোকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। বড্ড বেমানান দেখাচ্ছিল আমাদের। দেখি, কাকে একটা ‘‌চিংড়িটা হেব্বি হয়েছে। খেয়ে দেখুন!’‌ বলতে বলতে রঞ্জন এগিয়ে আসছে। আমাদের হতচকিত দেখে সবটা খোলসা করল সে। তার ভাগ্নির বিয়ে। হবু বর রঞ্জনের বড় ফ্যান। সে বলেছে, তার বিয়েতে রঞ্জনের বই প্রকাশ হোক। ব্যস সেখানেই রঞ্জনের বই প্রকাশ হল। আরেকটা গল্প বলি, রঞ্জন শো করবে বেঙ্গালুরুতে। আমাকে আমার আঁকা ছবি নিয়ে যেতে হবে। অনেকেই আমাকে সাবধান করল, দেখো, রঞ্জন কিন্তু ঢপ দেয়। ওর ফাঁদে পা দিও না। আমি বললাম, ভায়া, আমি কিন্তু আমার সব ছবি নিয়ে দক্ষিণে পাড়ি দিচ্ছি পূর্ব থেকে। আমাকে ঝুলিও না। ‘‌আরে না না! তুমি এসো। তোমার সব ব্যবস্থা আমি করব।’‌ রওনা দেওয়ার দু’‌দিন আগে থেকে রঞ্জন বেপাত্তা। তার গিন্নী ফোনে বলল, কী বলব হিরণদা? ও তো মাঝে মাঝেই কোথায় কোথায় চলে যায়। আবার বেপাত্তা হয়েছে। আমার তো মাথায় হাত। ভাবলাম, যা হয়ে যাক, দুগ্‌গা দুগ্‌গা করে বেরিয়ে তো পড়ি। ট্রেনে উঠতে রঞ্জনের ফোন। আমি তো এই মারি কি সেই মারি। বলে, ‘‌আরে তুমি আসবে, আর আমি পালিয়ে যাব! এমন হয় নাকি?’‌ ঠিক দেখলাম আপনভোলা রঞ্জন দুলতে দুলতে বেঙ্গালুরু স্টেশনে আমায় নিতে এসেছে। তা এরকমই বহু ঘটনা রয়েছে। রঞ্জনের একটা কষ্ট ছিল। ও গান গাইতে চেয়েছিল। সেটা খুব একটা হয়ে ওঠেনি। গান লিখেছে, সুরও দিয়েছে। কিন্তু গান গাওয়া হল না আর। ওর সেই গল্পগুলো আর ওকে খুবই মনে পড়বে।

আব্রাহাম মজুমদার
শিক্ষক, দাদা, গুরু, বন্ধু। সবই রঞ্জনদা। একসঙ্গে বসলে অনেককিছু শেখা যেত। আর পরিচয় যত দীর্ঘ হয়, তত বেশি ঘটনার ঘনঘটা। ১৯৭৫–৭৬ থেকে পরিচয়। অনেক আড্ডার কথাই মনে পড়ছে আজ। বহু পরিকল্পনা ছিল। ‘‌টেগোর সিম্ফনি’–এর সঙ্গে লন্ডন ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রার কথা ভাবছিলাম আমরা। কলকাতায় করেছিলাম ‌‘‌টেগোর সিম্ফনি’। সেই কাজটাই অন্য ফর্মে, বড়ভাবে করার কথা হচ্ছিল। সেইটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ নেই আর। রঞ্জনদার সেই ব্যক্তিত্ব ছাড়া সম্ভব নয় কোনওভাবেই। 

জনপ্রিয়

Back To Top