সম্রাট মুখোপাধ্যায়: তারকা বা সহশিল্পী হিসাবে নয়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বহুদিন পর্যন্ত হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মনে রেখেছিলেন তাঁর মায়ের পরিচয়ে। ‘‌হেমন্তদার কাছে আমি ছিলাম দুগ্‌গাদির ছেলে’‌, সম্প্রতি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ কথা বললেন সৌমিত্রবাবু। ‘‌হেরিটেজ বেঙ্গল’‌ আয়োজিত ‘‌শতবর্ষে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়’‌ অনুষ্ঠানে। এই উৎসবের দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধক ছিলেন সৌমিত্রবাবু। বলতে উঠে দৃশ্যতই আবেগ–বিহ্বল হয়ে পড়েন তিনি। নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌লিপ’‌–এ অসংখ্য হিট গানের জন্ম দিয়েছেন গায়ক–সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু সে–‌ আলোচনায় না–‌ঢুকে সৌমিত্রবাবু বলতে শুরু করেন তাঁর শৈশবের এক স্মৃতি। ১৯৪৯ সালের। তখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নবম শ্রেণির ছাত্র। হাওড়ায় থাকেন। সেখানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গেছেন এক গানের জলসায়। কিশোর সৌমিত্র গ্রিনরুমে দেখতে গেছেন নক্ষত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে। এক ফাঁকে সৌমিত্র নিজের বাবার নাম বলতেই, হেমন্তবাবু মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ‘‌তুমি মোহিতবাবুর ছেলে। মানে তুমি আমাদের দুগ্‌গাদির ছেলে!‌’‌ প্রসঙ্গত, সৌমিত্রবাবুর মাসি ছিলেন প্রসিদ্ধ গায়িকা সুচিত্রা মিত্র। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদেই সৌমিত্রবাবুর মাতৃকুলকে চিনতেন হেমন্তবাবু। কিন্তু খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও পুরনো পরিচিতদের অতখানি বিস্তারে মনে রাখা ও চিনতে পারা যে ‘‌সদাশয়’‌ তার প্রকাশ, তা সেদিন মুগ্ধ করেছিল কিশোর সৌমিত্রকে।
এর পরের ঘটনা ঠিক দশ বছর পরে। ১৯৫৯–এ। তখন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের নায়ক। একদিন স্টুডিও চত্বরে হেমন্তবাবুর সঙ্গে দেখা সত্যজিতের। তাঁর সঙ্গে তখন তাঁর নায়ক সৌমিত্র। সামান্য দু–চার কথা চলছে দু’‌জনের মধ্যে। ঈষৎ দূরে সৌমিত্র। তাঁর তখনও সেই ‘‌দুঃসাহস’‌ হয়নি ওই দুই দীর্ঘদেহীর মাঝে দাঁড়িয়ে আলোচনায় অংশ নেন। এরই মধ্যে সত্যজিৎবাবু ডেকে সৌমিত্রর পরিচয় দিচ্ছেন, হেমন্তবাবু তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‌ওকে আমি চিনি তো, ও তো আমাদের দুগ্‌গাদির ছেলে।’‌ আবারও মুগ্ধ হওয়ার পালা সৌমিত্রর। যে–‌মুগ্ধতা ষাট বছর পরেও যে কাটেনি, তা রবীন্দ্রসদন মঞ্চে সেদিন তাঁর স্মৃতিচারণার ধরন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল।
একইভাবে হেমন্তবাবু সৌমিত্রবাবুকে চমকে দিয়েছিলেন তাঁর বিয়ের রাতে সোজা বাসরে চলে এসে। যেহেতু দু’‌দিন পরে সৌমিত্রবাবুর বউভাতে তিনি আসতে পারবেন না, তাই বম্বে থেকে অত রাতে প্লেনে করে এসে বাসরেই দেখা করে গেলেন!‌ প্রসঙ্গত উদ্বোধক সৌমিত্রবাবুর হাতে এদিন এক অভিনব উপহার তুলে দেওয়া হয় মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক সংস্থা কে সি দাশের তরফে। হারমোনিয়ামের আকারে এক মিষ্টান্নের মোড়ক, যার ভেতরে নানারকমের মিষ্টি!‌
দু’‌দিনের এই হেমন্ত–উৎসবের প্রথম দিনের উদ্বোধক ছিলেন আরতি মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‌হেমন্তদাকে দাদা বলে ডাকতাম ঠিকই, কিন্তু আসলে তিনি ছিলেন পিতৃপ্রতিম। মানুষটা ছিলেন অদ্ভুত সরল। বাড়িতে এলে কী কী রান্না হয়েছে দুপুরে, তারও খোঁজ নিতেন।’‌
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সেভাবে রাগসঙ্গীত শেখেননি। কিন্তু সুরকার হেমন্তর রাগসঙ্গীত–চর্চায় বা রাগকে নিজের গানে ব্যবহারে তা অন্তরায় হয়নি বলেই মনে করেন গায়ক শ্রীকান্ত আচার্য। তিনি সুরকার হেমন্ত–র একাধিক গান গেয়ে ভেঙে ভেঙে দেখান কীভাবে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের বিভিন্ন রাগ সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে। শ্রীকান্ত বলেন, ‘‌ওনার গানে রাগগুলো ছায়া ফেলে থাকত, কখনই তারা দীর্ঘ হয়ে উঠত না মূল গানের সুরের চলনের থেকে। এটাই হেমন্তবাবুর সুরের মৌলিকত্ব। কিন্তু উনি জানতেন কীভাবে একটা রাগকে ভেঙে ফেলে নিজের গানে ব্যবহার করে নিতে হবে। একবার তো এমনকী রেডিও স্টেশনে ‘‌সংবাদ বিচিত্রা’‌র তৎকালীন ‘‌সিগনেচার টিউন’‌–এর মধ্যে রাগের ছোঁয়া পেয়ে তাকে নিজের গানে ‘‌প্রিল্যুড’‌–এ ব্যবহার করেছিলেন!‌ সে–‌গান ‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা’‌।
শ্রীকান্ত আচার্যর পাশাপাশি একক ও যৌথভাবে বেশ কিছু গান পরিবেশন করেন জয়তী চক্রবর্তী। একইভাবে সেতারে হেমন্তবাবুর রাগভাঙা গানগুলির উৎস থেকে চলন পরিবেশন করেন পন্ডিত শুভজিৎ মজুমদার ও কল্যাণ মজুমদার। সঙ্গীত পরিবেশন করেন জীমূত রায়, অঙ্কিতা ভট্টাচার্য ও সাগ্নিক সেন। ছিল এক আকর্ষণীয় তথ্যচিত্রও। হেমন্তবাবুর জীবন ও সঙ্গীতকেন্দ্রিক এই তথ্যচিত্রটির মূল ভাবনাকার সুখেন্দুশেখর রায়। প্রকাশ পায় একটি স্মারকগ্রন্থও।‌

জনপ্রিয়

Back To Top