সম্রাট মুখোপাধ্যায়: রাজার কুমার। ফলে, বন্দুকটা ভাগ্যিস চালাতে জানতেন প্রমথেশ। কুমার প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া। প্রিন্স অফ গৌরীপুর, আসাম।
বন্দুকটা চালাতে শিখেছিলেন শিকারে যেতে যেতে। শিকারে যাওয়া তো রাজপরিবারের বার্ষিক বিনোদনের অংশ ছিল। তবে এটা ঠিক ‘‌পাকা–‌শিকারি’‌ বলতে ঠিক যা বোঝায়, তা একেবারেই ছিলেন না প্রমথেশ। বাঘ মেরেছেন। হাতি ধরেছেন। রীতি মেনে সবই করেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর রোমান্টিক মন ছিল এই শিকার–‌হিংসার বিপরীত। এর জন্য একবার প্রাণ যেতে বসেছিল।
বাঘ এসে গেছে বিপজ্জনক দূরত্বে। অথচ প্রমথেশ ট্রিগার টিপছেন না!‌ কারণ বাঘের শরীরের সৌষ্ঠবময় পেশি সঞ্চালন আর ডোরা–‌ডোরা দাগের সৌন্দর্য শিল্পীমনের প্রমথেশকে নিয়ে গেছে অন্য জগতে!‌ কোনওরকমে প্রাণ নিয়ে ফিরেছিলেন সেবার।
আরেকবার একপাল হাতি ধরেছেন। তার ভেতর ধরা পড়েছে এক মা–‌হাতি। যার বাচ্চাটা ধরা পড়েনি। সারা রাত মা–‌হাতির কান্না শুনে রাজকুমার সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি শিকার ছেড়ে দেবেন। শোনা যায়, প্রায় নিরামিশাষী ছিলেন তিনি।
বিপদের কিনার ছুঁয়ে জীবনের রহস্যময় সৌন্দর্য আর করুণ কান্না দেখে–‌শুনে আসতেন প্রমথেশ। বারবার। এই জন্যই হয়তো তিনি যথার্থ ‘‌দেবদাস’‌। পর্দায়। জীবনেও।

তবুও বন্দুক
তো, শিকার ছাড়লেও, বাবার সঙ্গে ব্যক্তিত্বের বিরোধে ‘‌এস্টেট’‌ ছাড়লেও বন্দুক চালানো তো আর ভোলেননি যুবরাজ। সেটাই কাজে এল। আর ইতিহাসের অদ্ভুত ষড়যন্ত্রে। এক দুপুরে দমদমের এক বাগানবাড়িতে এক শুটিংয়ের কর্মকাণ্ডে মুখোমুখি হলেন বাংলা সিনেমার তিন প্রবাদ‌পুরুষ দেবকীকুমার বসু, ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি (‌‌ডিজি)‌‌ এবং প্রমথেশ বড়ুয়া। ডিজি–‌ই স্বল্পবন্ধুত্ব সূত্রে ওই শুটিং দেখতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আসামের গৌরীপুরের এই রাজকুমারটিকে। প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিদ্যায় ভাল ফল করে স্নাতক। আসাম রাজ্য দলের হয়ে ফুটবল খেলেছেন। খোলা গলায় দারুণ গান করেন। আসামে থাকাকালীন অ্যাসেম্বলির চিফ হুইপ হয়েছেন। বিলেত ঘুরে এসেছেন। এমন একজনের সান্নিধ্য কে না চাইবে?‌
সিনেমাটি ছিল ‘‌পঞ্চশর’‌। নির্বাক ছবি। যে দৃশ্যটির শুটিং তাতে বন্দুক ছোঁড়ার কথা নায়কের। রিহার্সাল চলার সময় আবিষ্কার করা গেল তিনি বন্দুক ধরতেই জানেন না ঠিক করে!‌ ‘‌মুশকিল আসান’‌ হয়ে প্রমথেশ গেলেন তাঁকে সেটা শেখাতে। আর প্রমথেশের আদব‌কায়দা এত ভাল লেগে গেল দেবকীবাবুর যে তিনি প্রস্তাব করে বসলেন, ‘‌এই দৃশ্যটায় আপনি নিজেই অভিনয় করে দিন।’‌
সালটা ১৯২৯। প্রমথেশ এর আগে অভিনয় করেছেন মঞ্চে। কলকাতায় নয়, গৌরীপুরে। ‘‌চন্দ্রগুপ্ত’‌–‌এ নামভূমিকা। চাণক্যও সেজেছেন এক নাইট। ‘‌ষোড়শী’‌তে জীবানন্দ। ‘‌প্রফুল্ল’‌তে সুরেশ। ‘‌নুরজাহান’‌–‌এর শের আফগান। আর কলকাতায় এসে মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন শিশিরকুমার ভাদুড়ীর নাটক। বলতেন, ‘‌প্রতিভা যদি দেখতে হয় তো দেখে এসো শ্রীরঙ্গমে’‌।
তবে এসব তো মঞ্চাভিনয়ের কথা। এই দিয়ে কি আর সিনেমায় অভিনয় করা যায়?‌ সমস্যার সমাধান করলেন দেবকীবাবু, ‘‌আপনাকে অভিনয় করতে হবে না। ছবিতে আপনার মুখ দেখা যাবে না। শুধু আপনার বন্দুক ছোঁড়াটা টেক করা হবে।’‌ ভাবা যায়!‌ বাংলা সিনেমার প্রথম সুপারস্টারের প্রথম পর্দাবতরণ নিছক ঘটনাচক্রে, একটা বন্দুক ছুঁড়তে!‌ ওই ছবি মুক্তি পায় ১৯৩০ সালের পড়ল নভেম্বরে। শুরু হয় ইতিহাসের চাকা গড়ানো।‌
প্রথম সুপারস্টার
প্রমথেশের ফিল্ম–‌কেরিয়ারের সেরা সময় ১৯৩৫ থেকে ১৯৪২। যার শুরু ‘‌দেবদাস’‌ দিয়ে। আর শেষ ‘‌শেষ উত্তর’‌ দিয়ে। মাঝে আছে ‘‌গৃহদাহ’‌, ‘‌মায়া’‌, ‘‌মুক্তি’‌, ‘‌অধিকার’‌, ‘‌রজত জয়ন্তী’‌, ‘‌উত্তরায়ণ’‌। যখন দেবকীকুমার বসুর সঙ্গে তাঁর জুটি ভাঙল, সবাই ভেবেছিলেন প্রণথেশ এবার কী করবেন?‌ প্রমথেশ নিজেই পরিচালক হলেন। উপরের সব কটি ছবিরই পরিচালক তিনি। ‘‌মায়া’‌ বাদে সব কটিরই নায়কও। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় একই সঙ্গে ‘‌উত্তমকুমার’‌ ও ‘‌সত্যজিৎ রায়’‌কে পাওয়া। শুধু একই প্যাকেজ–‌এ একজন মহান পরিচালক আর একজন দুর্দান্ত অভিনেতাকে পাওয়াই নয়। পাশাপাশি আরও একটা অসম্ভবের মিলন আছে এই ‘‌প্যাকেজ’–‌এ। প্রতিটি ছবিই শৈল্পিক গুনমানে এবং ভাবনার ভিন্নরুচিতে বিকল্প পথের পথিক। অথচ, প্রবল জনগণেশের অভিনন্দনধন্য। বক্স অফিস হিট। যুবকদের মাথার চুলে ‘‌বড়ুয়া–‌কাট’‌। উঁচু কলারের পাঞ্জাবি আর পাজামার বড়ুয়া–‌ফ্যাশন।
কেমন পরিচালক ছিলেন বড়ুয়া ‌স্যর?‌ ঋত্বিককুমার  ঘটকের এই অননুকরণীয় উদ্ধৃতিটুকুই যথেষ্ট, ‘‌পদ্ধতি টদ্ধতি বুঝি না মশাই, আমার কাছে প্রমথেশ বড়ুয়া আজও ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ পরিচালক। আমরা কেউই তাঁর পায়ের নখের যোগ্য নই। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি ‘‌গৃহদাহ’‌। আজও মনে পড়ে গৃহদাহ–‌র সেই অসম্ভব ট্রানজিশনটা। সেই যে হাইহিল জুতে পরা দুটো পা থেকে সোজা কেটে আলতামাখা পা পালকি থেকে নামছে। এবং ব্যাপারটা ভদ্রলোক করেছিলেন ১৯৩৬ সালে।.‌.‌.‌ ওখানে অচলার ট্রানজিশন ফ্রম টাউন টু ভিলেজ যে মন্তাজের দ্বারা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তখন, তা অভাবনীয়।
কেমন অভিনেতা ছিলেন প্রমথেশ?‌ উত্তমকুমারকে যখন বারবার ‘‌দেবদাস’‌ করতে বলা হয়েছে, বারবারই নাকচ করেছেন সে প্রস্তাব এই যুক্তিতে যে ‘‌দেবদাস’‌ একজনই। আর তিনি বড়ুয়া স্যর। কেমন করেছেন তিনি ‘‌দেবদাস’‌–‌এ প্রশ্নের উত্তরে দিলীপকুমারের লাজুক উত্তর ছিল, ‘‌বড়ুয়া সাবকে তরা নহী’‌। তপন সিংহ লিখেছিলেন, ‘‌প্রমথেশ বড়ুয়ার মধ্যেই আমরা প্রথম সিনেমার উপযোগী স্বাভাবিক অভিনয় দেখি। অহীন্দ্র চৌধুরি, শৈলেন চৌধুরি, দুর্গাদাস, ছবি বিশ্বাসও কিছুটা— এঁদের সকলেরই অভিনয়ে মঞ্চের প্রভাব ছিল।’‌
স্বয়ং কুমার প্রমথেশ খুব সহজ করে খুলেছেন নিজের অভিনয়ের রহস্য। লিখেছেন, ‘‌মঞ্চাভিনয়ে অভিনেতার অভিনয় কৌশল যতখানি প্রাধান্য পায়, ছায়াছবিতে ঠিক ততখানি প্রাধান্য পায় অভিনেতার টাইপ সৃষ্টি।.‌.‌.‌ রঙ্গালয়ের দর্শক শিশিরবাবুর অভিনয় কৌশল দেখতে যায়— তারা ‘‌ষোড়শী’‌র জীবানন্দকে দেখতে যায় না;‌ তেমনি আবার চলচ্চিত্রের দর্শক ‘‌দেনাপাওনা’‌য় জীবানন্দকেই দেখতে যায়।’‌
প্রমথেশচন্দ্রর সম্পর্কে এইসব স্মৃতি, মন্তব্য, তাঁর নিজের কথা—‌ এসব গেঁথে একটি বই প্রকাশ করেছে সম্প্রতি দে’‌জ পাবলিশিং। ‘‌রাজার কুমার’‌ নামে। প্রয়াত সাংবাদিক রবি বসুর লেখা একটি জীবনকথা এর কেন্দ্রে। কিন্তু এই ‌বইয়ের ভেতরে–‌বাইরে থাকা কিছু জিনিস সত্যিই বিস্ফোরক। বা মণিমুক্তো।
ঘরেও নহে, পারেও নহে
এই ‌বইতে আছে কিছু চিঠি। যা স্বয়ং প্রমথেশচন্দ্রর লেখা। বউকে, বোনকে, বন্ধুকে। যা পড়লে হদিশ মেলে তাঁর পর্দার বাইরের জীবনের। বিশেষত তাঁর অন্তিম জীবনের। যা অনেকটাই কুয়াশায় ঢাকা। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যান তিনি। অর্থাভাব, সংসারচ্যুতি আর আত্মনিগ্রহে ভরা সেই সব দিনের কথা সরাসরি চিঠিতে লিখেছেন তিনি। অকপটে। তারকসুলভ গোপনীয়তার আবরণ খসিয়ে দিয়েছেন সেখানে।
যেমন একসময় যে ক্ষিতিকে (‌অমলাবালা)‌ বিয়ে করার জন্য ছেড়ে এসেছিলেন প্রথমা স্ত্রী মাধুরীলতাকে, সেই ক্ষিতি তাঁর জীবন থেকে চলে যাওয়ার পর তাঁকে লিখছেন, ‘‌আমাকে যেতে লিখেছিস কেন?‌ আমাদের তো আর মিলবার উপায় নেই।.‌.‌.‌ এখন আমি যে পথে গিয়েছি তাতে আর কোনও কারও সঙ্গে মেশা যায় না।’‌ অবিকল ‘‌দেবদাস’‌ লিখছে, এমনটাই মনে হয়। বন্ধু প্রফুল্ল দাশগুপ্তকে লিখছেন, ‘‌আমার আজকালকার জীবনটা শুনবে?‌ এক বেশ্যাকে রেখেছি। তার কাছে রোজ সন্ধে ৬টায় যাই— রাত দু‌টোয় বাড়ি আসি। রোজ সকালে ৯টায় ঘুম থেকে উঠি। একটার মধ্যে খাই। তারপরে একটু ঘুমোই। ৪টায় উঠে দাড়িগোঁফ কামাই, চান করি— আবার সেখানে যাই। দুর্গতির শেষ সীমায় এসেছি। .‌.‌.‌ একটা মেয়ের হাতে ভালবেসে নিজের জীবনটাকে তুলে দিয়েছিলাম— সে ভাবলে সেটা অপবিত্র ময়লা। ধুলোয় ফেলে দিলে।’‌
যখন ‘‌মুক্তি’র চিত্রনাট্য শুনিয়েছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিককে, তখন পঙ্কজবাবুর মনে হয়েছিল এই ‌ছবির নায়ক ‘‌আশ্চর্য এক মানুষ’‌। যাকে ধরা যায় রবীন্দ্রকবিতার একটি লাইন দিয়েই— ‘‌ঘরেও নহে পারেও নহে, যে জন আছে মাঝখানে।’‌ চিত্রনাট্য শুনে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং এরপর অনুমতি দিয়েছিলেন সেই কবিতা ‘‌দিনের শেষে ঘুমের দেশে’‌তে সুরারোপের। আর সিনেমায় ব্যবহারের। এসব চিঠির উন্মোচনে মনে হয়, সেই ‘‌মাঝখানে’‌ থাকা মানুষটিই ছিলেন প্রমথেশচন্দ্র বড়ুয়া। এক বিষাদগ্রস্ত ‘‌হ্যাপি প্রিন্স’‌।‌

ছবি:‌ দেবব্রত ঘোষ। রবি বসুর ‘‌রাজার কুমার’‌-‌এর প্রচ্ছদে ব্যাবহৃত।

জনপ্রিয়

Back To Top