সম্রাট মুখোপাধ্যায়: অনবদ্য সুর, আর দুর্দান্ত মানের ‘‌অ্যানিমেশান’‌।
সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের বাংলা ছবি ‘‌গুপী গাইন বাঘা বাইন’‌–এর চিত্রনাট্যের প্রতি প্রায় ‘‌ফ্রেম টু ফ্রেম’ বিশ্বস্ত থাকা।
এই নিয়ে হিন্দি অ্যানিমেটেড ‘‌গুপি গাওয়াইয়া বাঘা বাজাইয়া’‌র প্যাকেজ। যা দেখতে বসে সন্দেহ নেই উঠে আসা খুব মুশকিল। আপনি উঠে আসতে চাইলেও, আপনার পাশে বসা বা আপনার ভেতরে থাকা ক্ষুদেটিই আপনাকে উঠতে দেবে না। সে ‘‌গুগাবাবা’‌ আগে দেখা বা পড়া থাক আর নাই থাক।
সন্দেহ নেই, এত উন্নত মানের অ্যানিমেশন এদেশে খুব কমই দেখা গেছে। রূপকথার জমজমাট গল্প নিয়ে যা পাশাপাশি দাঁড়াতে পারে ‘‌ডিজনি কার্টুনস’‌–এর। পরিচালক শিল্পা রানাডে এবং নির্মাতা সংস্থা ‘‌করাডি টেলস’‌ উভয়েরই প্রশংসা প্রাপ্য এজন্য। আশ্চর্যের কথা, এ‌ছবি তৈরি হয়েছে ২০১৩–তে। ৭৯ মিনিটের এছবি টোরান্টো, বুসান, দুবাইয়ের চলচ্চিত্র উৎসবে তারপরই দেখানো হয়েছে। এদেশে মুক্তি পেতেই খালি লেগে গেল সাড়ে পাঁচ বছর। অথচ এছবির সহ প্রযোজক সরকারি সংস্থা চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি। নাকি সরকারি লাল ফিতের ফাঁসের উদাসীনতাই এর জন্য দায়ী?‌
শিল্পা সচেতনভাবেই জোর দিয়েছেন গানের সুরের বৈচিত্র‌্য আর তার পেছনের ‘‌ভিস্যুয়াল’‌কে জমজমাট করে বানানোয়। বোঝা যায় তাঁর উচ্চাকাঙ্খা ‘‌ডিজনি কার্টুনস’‌–এর জগদবিখ্যাত ‘‌মিউজিকাল অ্যানিমেশন’‌কে স্পর্শ করা। আর তারই‌ জন্য বাংলার গুপী বাঘাকে বেছে নেওয়া।
ছবিতে অবশ্য বাঙালী–ভাবটা অনেকটাই অন্তর্হিত। বরং এসেছে একটা সর্বভারতীয় চেহারা। গুপী বাঘার, পোশাকে খাওয়াদাওয়ায়–আচার ব্যবহারে। বাংলা ‘‌গুগাবাবা’‌র গানে কোথাও কোথাও রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরের গঠনের যে উকি মেরে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই তা এখানে নেই। তবে সুরে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত আর লোকগীতির মিশ্রণটা এখানেও আছে।

সচেতনভাবেই। আর তাতে আগেই লিখেছি গান শুরু হলে, সত্যিই নড়াচড়া করা ভারি কঠিন হয়েছে। থ্রি ব্রাদার্স অ্যান্ড আ ভায়োলিন’‌ও অন্যরকম সুর করায় ‘‌ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই’‌ থেকেই ভারি বিখ্যাত নাম। দরদ ঢেলে সুর করেছেন তাঁরা এছবিতেও।
তবে এই গানের সিকোয়েন্স নিয়েই খুঁতখুঁতানি থাকবে বাঙালি দর্শকের। শুন্ডির রাজসভায় গান চলার সময় শুন্ডিরাজের (‌সন্তোষ দত্তের)‌ নড়েচড়ে তাল দেওয়া নিয়েই যে সময়, সেই গুগাবাবা সিনেমার আমলে কত প্রশ্ন উঠেছিল। আর এই ‘‌জিজি বিবি’‌ (‌এভাবেই নামের ইংরেজি আদ্যক্ষর দিয়ে ছোট নাম দেওয়া হয়েছে ‘‌গুগাবাবা’‌র আদলে‌)‌‌ তে দেখা যাচ্ছে শুন্ডির রাজসভায় গানের সঙ্গে সবাই কোরাসে গলাও মেলাচ্ছে।
প্রশ্ন আছে আর একটা ব্যাপার নিয়েও। ছবির শুরুতে কাহিনি-‌ঋণ নিয়ে উপেন্দ্রকিশোরের (‌রায়চৌধুরী)‌ কাছে যতটা প্রণতি জানানো হয়েছে, তা সত্যজিৎ–এর কাছে জানানো হয়নি। কিন্তু এখন তো সবাই জানেন, দাদু উপেন্দ্রকিশোরের কাহিনীর প্লট খুব কমই ব্যবহৃত হয়েছে নাতি সত্যজিতের ছবিতে। আর শিল্পা রানাডের এ‌ছবি তো সেই বাংলা সিনেমার গল্প থেকেই তৈরি। তাহলে?‌
ছবির শুরুতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি স্যালুট জানায় গুপী বাঘা। জানা নেই যুদ্ধ যুদ্ধ আবহের মধ্যে এ‌ছবির মুক্তি বলে এমনতর আয়োজন কিনা! ‘‌তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল’‌ এমন পংক্তি আর এমন ‘স্যালুট’‌ একসঙ্গে মিলমিশ খায় কিনা জানা নেই।
দু–একটা ব্যাপারে অন্যরকম পরীক্ষা–নিরীক্ষাও আছে। যেমন শুন্ডি রাজার দরবারে গান শোনাতে গিয়ে গুপী বাঘার প্রায় জেল হবে এমনতর ব্যাপার বা ভূতের রাজার চার নম্বর বর দেবার ব্যাপারটা!‌ না, এগুলো জমেনি।
বরং যেটা জমেছে তা হল ভূতের রাজার সিকোয়েন্সটা। তার ভয় দেখানো আদব–কায়দা এবং বিশেষ ডলবি সাউন্ডট্র‌্যাক। আর ছবির আদবকায়দায় ভালো লেগেছে ওল্ড রাশিয়ান স্কুলের অলংকরণ–শৈলীর ব্যবহার। সেটাও অনেকটা ‘‌নস্টালজিয়া’‌র ঘোর তৈরি করে।     ‌ ‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top