অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: জুটিটা সত্যিই ছক-‌ভাঙা, সন্দেহ নেই। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জুটি গার্গী রায়চৌধুরি। এমন এক ছক ভাঙা জুটি নিয়ে গতকাল শুক্রবার মুক্তি পেল সুদেষ্ণা রায়, অভিজিৎ গুহ পরিচালক জুটির ছবি ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌। ছবি রিলিজের দুদিন আগে আমরা মুখোমুখি গার্গী রায়চৌধুরির।
• ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌র জন্যে প্রথমেই আমাদের শুভেচ্ছা।
•• থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ। এবং কৃতজ্ঞতা।
• প্রথমেই জানতে চাই, ‘‌জুটি’‌ বললেই কাদের কথা মনে পড়ে?‌
•• (‌একটুও সময় না নিয়ে)‌ বাংলা সিনেমায় অবধারিতভাবে উত্তম-‌সুচিত্রা। হিন্দিতে অমিতাভ‌-‌রেখা। ইংরেজিতে ব্র‌্যাড পিট-‌অ্যাঞ্জেলিনা জোলি।
• একটুও তো ভাবতে হল না?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ হৃদয়ে গেঁথে থাকলে ভাবতে হয় না। এঁরাই অবধারিত জুটি।
• এবার আসি ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌য়। এখানে গার্গী রায়চৌধুরি  জুটি বেঁধেছেন তাঁর পিতৃতুল্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
•• হ্যাঁ, উনি তো ৮৫ বছর পেরিয়ে গেলেন।
• এই সৌমিত্র-‌গার্গী জুটিটাকে কীভাবে দেখছেন আপনি?‌
•• আমি তো সৌমিত্রদাকে হাজব্যান্ড হিসেবেই দেখছি। আমি শুভা সরকার। উনি অমিতাভ সরকার।
• এমন একটা অসমবয়সী জুটি তো দেখা যায় না।
•• সেটাই তো মজার। এটা একটা ছক-‌ভাঙা জুটি। আর, ছক-‌ভাঙা ছক আমার পছন্দ। শুধু বাংলা নয়, সারা পৃথিবীর ছবিতেই এখন ছক-‌ভাঙার সময় চলছে। জাতীয় স্তরে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও। আর, এই ছক-‌ভাঙা ছকের মধ্যে যে আনপ্রেডিক্টেবিলিটি আছে, যে অনিশ্চয়তা আছে, সেখানে অভিনয়ের মজাটা পাওয়া যায়। দুই-‌দুইয়ে সব সময় যে চার হয় না, একজন শিল্পী সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে যেতে চায়, তার স্বাদ দিতে চায় দর্শকদের। ছবি রিলিজের আগেই দর্শকদের মধ্যে প্রশ্ন জাগছে, সত্যিই কি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বউ গার্গী?‌ এই প্রশ্নটা ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌র একটা চমক তো বটেই। জীবনের চমক। এই যে ছক-‌ভাঙা সম্পর্ক, এটা চমৎকার। সত্যিই ছক-‌ভাঙার আনন্দে বিশ্বাস করি আমি। অভিনেত্রী হিসেবে এটা আমাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। আমি সেটা অ্যাকসেপ্ট করি সানন্দে।
• কিন্তু ছবিতে যেহেতু পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় আছেন, লোকে কিন্তু এটাও ভাবছে, তাহলে কি গার্গী-‌পরমও একটা জুটি হয়ে উঠবে শেষপর্যন্ত?‌
•• দর্শকদের নর্মাল সাইকোলজি তাই বলছে। এটাই একটা সোজাসাপ্টা ভাবনা যে, গার্গীর সঙ্গে পরমের জুটি হবে। কিন্তু এখনকার দর্শকও অনেক পরিণত। তাঁরাও কিন্তু হিসেব-‌কষা ছক পছন্দ করছেন না। সিনেমায়, সাহিত্যে মানু্য কিন্তু হিসেবের বাইরের রসায়নটাই দেখতে পায়, পড়তে চায়। এবং চায়, বাস্তবের সঙ্গে যেন তার সম্পর্ক থাকে। রজনীকান্ত যদি দশ-‌তলা বাড়ি থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন, গায়ের ধুলো-‌টুলো ঝেড়ে ‘‌ম্যায় হুঁ ডন’‌ টাইপের ডায়ালগ বলেন, আজকের দর্শক সেটা আর বিশ্বাসযোগ্য বলে ভাবেন না। এই অতি বাস্তব বা অবাস্তব ছকটা তথাকথিত ফর্মুলা ছবিতেও আজ আর চলছে না।
• তার মানে, সৌমিত্র-‌গার্গী জুটি একইসঙ্গে ফর্মুলা এবং ছককে অগ্রাহ্য করছে?‌
•• একদম তাই। আমি ‘‌মেঘনাদবধ রহস্য’য় বেনুদার (‌সব্যসাচী চক্রবর্তী)‌ সঙ্গে জুটি ছিলাম। সেটা যদি একটুখানি ছক ভাঙা হয়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার জুটি সমস্ত ছককেই ভেঙে দিয়েছে।‌ ‘‌শ্রাবণের ধারা’‌য় একটা জায়গায় সংলাপ আছে, সৌমিত্রদাকে উদ্দেশ করে, গার্গী (‌মানে, শুভা)‌ কি আপনার মেয়ে?‌ তখন আমি উত্তর দিচ্ছি, না, না, উনি আমার স্বামী।’‌ আমি বলতে চাইছি, বয়সের তফাৎটা তো এমন-‌ই। এটাই তো সম্পর্কের রহস্য।
• সুদেষ্ণা, অভিজিৎ যখন এই ছবির স্ক্রিপ্ট শোনান, তখনই কি এমনই উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন চরিত্রটা নিয়ে?‌
•• সত্যি, এতটাই উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম। সুদেষ্ণা রায়, অভিজিৎ গুহ বরাবরই আমাকে নানান ধরনের চরিত্র দিয়েছেন তাঁদের ছবিতে। কিন্তু এটা একেবারে অন্যরকম চরিত্র। চিত্রনাট্য শুনতে শুনতে আমি ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলাম, আমি ছবিতে কেমন চশমা পরব। ভাবছিলাম, আমার ওজনটা একটু বাড়াতে হবে।
• সত্যিই ওজন বাড়াতে হল?‌
•• বাড়াতে হল তো। ছবির শুটিং শেষ হলে একটু বেশি জিম করতে হল।
• ছবি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনটা আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?‌ চরিত্র, চিত্রনাট্য?‌ নাকি, পরিচালক আর প্রোডাকশন হাউস?‌
•• সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবির চিত্রনাট্য আর আমার চরিত্র। গল্প শুনতে শুনতে আমার ‘‌ইনটিউশন’‌ যদি সায় দেয়, আমি যদি পুরো ছবিটা দেখতে পাই, ভিস্যুয়ালাইজ করতে পারি, তাহলে আমি রাজি হই ছবিটা করতে। আর, দেখুন, পরিচালকের ওপর আস্থা না থাকলে ছবিটা করব কী করে?‌ প্রযোজক সম্পর্কেও একই কথা। কিন্তু ছবির চিত্রনাট্য এবং চরিত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
• টেলিভিশনে একসময়ে চুটিয়ে কাজ করেছেন। ছোটপর্দা থেকে বড়পর্দায় এসে অভিনেত্রী হিসেবে অনেক বেশি এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ পাচ্ছেন?‌
•• এটা সত্যি। বড়পর্দায় আমি একটা থেকে আর একটা ছবিতে নিজেকে বারবার ভেঙেছি। আমাকে পরিচালকরা সেই সুযোগটা দিয়েছেন। তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। আমি যদি কোনও চরিত্রের সঙ্গে ‘‌ইমোশনালি’‌ নিজেকে কানেক্ট করতে পারি, তাহলে অভিনেত্রী হিসেবে সেই চরিত্রটা স্পষ্ট করে তুলতে আমার অসুবিধে হয় না। আমি সেই চেষ্টাটাই করি।
• কিন্তু কোনও চরিত্র যখন দর্শকের আনুকূল্য পায়, তাদের পছন্দ হয়, জনপ্রিয় হয়, তখন তো টালিগঞ্জ বারবার একই রকমের চরিত্র ‘‌অফার’‌ করে। এটা আগেও বাংলা ছবিতে অনেকের ক্ষেত্রে হয়েছে। একটা স্ট্যাম্প দিয়ে দেওয়া। আপনার ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেছে?‌
•• হয়েছে তো। মার্কা মেরে দেওয়া তো ইন্ডাস্ট্রির সহজ ছক। এটা চিরকালই ছিল। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঘোষের মতো আসাধারণ শিল্পীদের বারবার একই ছকের কমেডি রোল দিয়ে গেছে বাংলা ছবি। এটা তো প্রতিভার অপচয়। আমার ক্ষেত্রে ‘‌রামধনু’‌র পর এরকম ঘটেছে। ‘‌রামধনু’‌তে আমার আর শিবুর (‌শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)‌ মালতি আর লাল্টু প্রবল জনপ্রিয় হয়। তারপর আমার কাছে তিন-‌চারটে ছবির অফার আসে, সেখানে চরিত্রটা একেবারে মালতির মতো। আমি ছবিগুলো করিনি। একই জিনিস, একই চরিত্র, বারবার আমার ভাল লাগে না। আমি যেমন জিম করি, ডায়েট করি, কিন্তু রোজ একঘেয়ে খাবার আমার ভাল লাগে না। আমি উল্টোপাল্টা খাই। খাওয়া-‌দাওয়া নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করি। একঘেয়ে ছক আমার ভাল লাগে না। না অভিনয়ে, না জীবনে। এই ছক-‌ভাঙা ছক বা এক্সপেরিমেন্ট-‌ই আমাকে ‘‌কিক’‌ দেয়, আমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
• তার মানে, সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে ওয়ার্কশপ বা রিহার্সালের ছক আপনার পছন্দ নয়।
•• একদম পছন্দ নয়। আমি মেথড অ্যাক্টর নই। আমি স্বতঃস্ফূর্ত বা ইমোশনালি অভিনয় পছন্দ‌ করি। সিনেমায় বারবার রিহার্সাল করলে ইমোশনের সূক্ষতাগুলো হারিয়ে যায়। কাচের বাসনের বাক্সে যেমন লেখা থাকে, ‘‌হ্যান্ডল উইথ কেয়ার’‌, সিনেমার অভিনয়টা তেমনই। খুব সূক্ষ। মানে, ’‌নার্চার করো, নাড়াচাড়া কোরোনা। তাহলেই, ভেঙে যাবে। ওয়ার্কশপে বারবার ডায়লগ বললে, এই সূক্ষতাটা ভাঙে যাবে। কো-‌স্টারদের চেনার জন্যে তাদের সঙ্গে আড্ডা দাও, একসঙ্গে খাওয়া-‌দাওয়া করো, কিন্তু ওয়ার্কশপ নয়।
• কিন্তু গার্গী তো নাটকের মেয়ে। নাটকের মঞ্চ থেকে পর্দায় আসা। কিন্তু থিয়েটারে তো যত রিহার্সাল, তত দক্ষতা।
•• থিয়েটারটা একদম আলাদা। সেখানে আলো কোথায় পড়বে, মেপে রেখে অভিনয় করতে হয়। সহশিল্পীর আলো যাতে কেটে না যায়, সতর্ক থাকতে হবে। রিহার্সাল ছাড়া থিয়েটার সম্ভব নয়। থিয়েটারে তো রি-‌টেক হয় না সিনেমার মতো। কিন্তু আমার কাছে থিয়েটারের প্রতিটা শো মানেই নতুন করে মঞ্চে আসা!‌ আমি চেষ্টা করি, প্রতিটা শো-‌এই নিজেকে কিছুটা ভাঙতে, কিছুটা পাল্টাতে। এটা থিয়েটারের চ্যালেঞ্জ।
• ‘‌রঙ্গিনী’‌র পর থিয়েটার নিয়ে কী ভাবনা?‌ আবার মঞ্চে আসার পরিকল্পনা আছে?‌
•• অবশ্যই। যখন ‘‌রঙ্গিনী’‌ শুরু করি, তখন শুধু থিয়েটারটা নিয়েই থেকেছি। কথা ছিল, ২০টা শো করব। করেছি। এবার বিদেশে ‘‌রঙ্গিনী’‌র শো হবে। আবার একটা নতুন নাটকের ভাবনা চলছে। সেটাও একক অভিনয়। মানসিকভাবে ওয়ার্কশপ শুরু করে দিয়েছি।
• সিনেমায় একটা বড় চমক আছে শুনেছি। সেটা কবে জানা যাবে?‌
•• সেটা ২০২০তে আমার ড্রিম প্রজেক্ট। (‌হাসতে হাসতে)‌ জানাব, জানাব।
• তার আগে তো আবার মিতালি আর লাল্টু ফিরছে?‌
•• হ্যাঁ, ‘‌হামি ২’‌ শুরু হবে। এখানে লাল্টু তো শিবুই, আর  আমি মিতালি।
• ‘‌হামি টু’‌ মানে তো জুনিয়র পণ্ডিত?‌
•• হ্যাঁ, ছবির নাম ‘‌জুনিয়র পণ্ডিত’‌। তারপর হবে ‘‌জুনিয়র কমরেড’‌। এখানেও লাল্টু, মিতালি আর হামি-‌র ব্রত—তিনজনেই থাকছি।
• আচ্ছা, টেলিভিশনে গার্গীর ফেরার আর কোনও সম্ভাবনা নেই?‌
•• একেবারেই নেই। যদি ভাল রিয়েলিটি শো-‌এর কোনও প্রস্তাব আসে, সেটা নিশ্চয়ই বিবেচনা করব। কিন্তু ধারাবাহিকে আর নয়। টিভিতে ধারাবাহিকে নিজের কাছে নিজেকে প্রমাণ করে দিয়েছি। শিল্পী হিসেবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তো নিজের কাছে নিজেকে প্রমাণ করা। সেটাই করেছি, সেটাই করতে চাই জীবনভর। সেটাই করতে চাই।‌
আমাদের শুভেচ্ছা গার্গীর ছক-‌ভাঙা ভাবনাকে।‌

শ্রাবণের ধারা:‌ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও গার্গী রায়চৌধুরি

জনপ্রিয়

Back To Top