‌আজকালের প্রতিবেদন: ২৫তম বছরে পৌঁছে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব পৌঁছে যেতে চলেছে কলকাতার পাড়ায় পাড়ায়। শহরের মোট ৩৫টি জায়গায় দেখানো হবে ২৫টি ছবি। গত এক বছরের মধ্যে মুক্তি পাওয়া নতুন বাংলা ছবি শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্ত, সঙ্গে শহরতলিও বাদ পড়ছে না এতে। আসন্ন উৎসব নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে শুক্রবার শিশির মঞ্চে এ কথা জানালেন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী তথা এই চলচ্চিত্র উৎসবের ডেপুটি চেয়ারম্যান ইন্দ্রনীল সেন। তিনি জানান, বর্তমান রাজ্য সরকারের আমলে যেভাবে সঙ্গীতমেলা পৌঁছে গেছে পাড়ায় পাড়ায়, সেভাবেই চলচ্চিত্র উৎসবকেও আমজনতার মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্যেই এই পরিকল্পনা, যা ভেবেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। মুখ্যমন্ত্রীর ভাবনা ও প্রেরণায় আরও একটা জিনিস বদলাচ্ছে এবারে। উৎসবের ‘‌সিগনেচার টিউন’‌। প্রাথমিক ভাবনা মমতা ব্যানার্জির, যাকে বাস্তবায়িত করেছেন পণ্ডিত বিক্রম ঘোষ এবং ওই বাস্তবায়নে অবদান আছে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মুখ্যসচিব তথা ‘‌কেআইএফএফ’‌–‌‌এর মুখ্য পরিচালক বিবেক কুমারের। এদিন শিশির মঞ্চে এই টিউন শোনানোর পাশাপাশি উদ্বোধন করা হয় নতুন লোগোরও। যার আবরণ উন্মোচন করেন উৎসবের চেয়ারম্যান রাজ চক্রবর্তী। সঙ্গে ছিলেন কোয়েল মল্লিক ও এই উৎসবের শর্ট ও ডকুমেন্টারি ফিল্ম বিভাগের চেয়ারম্যান পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। পরমব্রত বলেন, এই বিভাগে এবার বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। দেখানো হচ্ছে দেড়শোরও বেশি ছবি। তার মধ্যে ছোট ছবি বিভাগে ২২টি ও তথ্যচিত্র বিভাগে ২০টি ছবি প্রতিযোগিতায় আছে।
এবারে মোট ছবির সংখ্যা ৩৬৭টি। ৭৬টি দেশ থেকে আসছে এসব ছবি। এত বেশি পরিমাণ ছবি এর আগে আসেনি। দেখানো হবে মোট ১৭টি প্রেক্ষাগৃহে। এগুলি হল নন্দন এক, নন্দন দুই, নন্দন তিন, শিশির মঞ্চ, রবীন্দ্রসদন, মিনার, বিজলী, প্রিয়া, নবীনা, অজন্তা, পি ভি আর অবনী রিভারসাইড মল, আইনক্স সিটি সেন্টার এক, রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবন, নজরুল তীর্থ, নিউ এম্পায়ার, চলচ্চিত্র শতবার্ষিকী ভবন। এইসব হলে ছবি দেখানো হবে নয় থেকে পনেরো নভেম্বর। আর আট নভেম্বর উৎসবের উদ্বোধন হবে নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এবারও মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে থাকবেন অমিতাভ বচ্চন ও শাহরুখ খান। জানালেন রাজ্যের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। অরূপবাবু এই চলচ্চিত্র উৎসবের মুখ্য উপদেষ্টাও। তিনি জানান, ওই দিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকবেন জয়া বচ্চন, রাখী গুলজার, মহেশ ভাট, মাধবী মুখোপাধ্যায় ও গৌতম ঘোষ। জার্মানির প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্র পরিচালক ভোলকার স্কোলেনডর্ফও উপস্থিত থাকবেন। প্রসঙ্গত, স্কোলেনডর্ফের একগুচ্ছ ছবি এবারের উৎসবের বড় আকর্ষণ। এই উৎসবে এবারে ফোকাস কান্ট্রি জার্মানি। সেই সুবাদেই স্কোলেনডর্ফের আসা। থাকবেন স্লোভাকিয়ার বিশিষ্ট পরিচালক দুসান জানাকও। উৎসবের উদ্বোধনী ছবি সত্যজিৎ রায়ের ‘‌গুপী গাইন বাঘা বাইন’‌। এই উৎসব উপলক্ষে চারটি প্রোমো বানানো হয়েছে, যা আজ শুক্রবার প্রথম দেখানো হয়। এগুলি উৎসবের বিজ্ঞাপন হিসাবে দেখানো হবে টিভিতে, আঞ্চলিক ও জাতীয় চ্যানেলে। উৎসবের চেয়ারম্যান রাজ চক্রবর্তী এদিন বলেন, ‘‌রাজ্যের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী আমায় মস্ত বড় দায়িত্ব দিয়েছেন। যা অনেকের খুব একটা পছন্দ হয়নি। আমি দায়িত্ব পালন করে তাঁদের পছন্দকে জয় করার চেষ্টা করব। এই উৎসবের সঙ্গে আমার যোগ তৃতীয় বছর থেকে। যখন আমি আর পরমব্রত ঘুরে ঘুরে ছবি দেখতাম। একবার ও ৩৮টা আর আমি ৩২টা ছবি দেখেছিলাম।’‌ তিনি দেখান উৎসবে দেখানোর জন্য ২৫০০টার কাছাকাছি ছবি এসেছিল। বিচারকেরা তার ভেতর থেকে এই ৩৬৭টি ছবি বেছে নিয়েছেন। তার জন্যে তাঁরা নানা ব্যস্ততার ভেতরে প্রয়োজনে মোবাইলেও ছবি দেখেছেন বলে রাজ জানান। প্রতিযোগিতা বিভাগে রয়েল বেঙ্গল টাইগার গোল্ডেন ট্রফি পাবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সেরা ছবি। পুরস্কার মূল্য ৫১ লাখ টাকা। আর সেরা পরিচালক পাবেন ২১ লাখ টাকা। যা বিশ্বের চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ। ভারতীয় ছবির প্রতিযোগিতা বিভাগে সেরা ছবি পাবে সাত লাখ টাকা। আর সেরা পরিচালক পাবেন পাঁচ লাখ টাকা। সেরা ছোট ছবি পাবে পাঁচ লাখ টাকা। সেরা তথ্যচিত্র তিন লাখ টাকা। এছাড়া নেটপ্যাক বিভাগও থাকছে।
উৎসবের ছবি ঘিরে বড় খবর হল এবারে দেখা যাবে এমন তিনটি পুরনো ছবি, যা খুব কমই দেখা গেছে। এগুলি ভারত–‌‌জার্মান যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল। ‘‌সিরাস’‌ (‌১৯২৮)‌, ‘‌ক্রাঞ্চপাশ’‌ (‌১৯২৯)‌ ও ‘‌অচ্ছুতকন্যা’‌ (‌১৯৩৬)‌। ইতালির বিখ্যাত পরিচালক বার্তোলুচ্চির ছয়টি ছবি দেখানো হবে। আর এগুলি দেখানো হবে পুরনো সেলুলয়েড ফরম্যাটেই। এর জন্য আবার পুরনো প্রোজেকশন মেশিন জোগাড় করা হয়েছে। তার চেয়েও বড় খবর এই প্রথম দুটি প্রেক্ষাগৃহে থ্রিডি ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে— প্রিয়া ও বিজলী। এদিকে বিদেশ থেকে আসছেন ৫৬ জন অতিথি। তাঁদের একটা ‘‌হেরিটেজ ট্যুর’‌ করানো হবে শহরে। উদ্দেশ্য, শহরের ঐতিহ্যপূর্ণ জায়গাগুলো তাঁদের সামনে তুলে ধরা। যাতে ভবিষ্যতে তাঁরা ছবি করার জন্য এসব জায়গাকে কাজে লাগানোর কথা ভাবতে পারেন। এ ব্যাপারে একটি তথ্যচিত্রও বানানো হয়েছে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের পরিকল্পনায়। বোঝা যাচ্ছে এই উৎসবকে রাজ্য সরকার অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে চাইছে পর্যটনকে জুড়ে নিয়ে। উৎসবের সমাপ্তি অনুষ্ঠান হবে নজরুল মঞ্চে।‌‌‌

২৫তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সাংবাদিক বৈঠকে দুই মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও ইন্দ্রনীল সেন। রয়েছেন তথ্য–‌সংস্কৃতি সচিব বিবেক কুমার, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, ম্যাক্সমুলার ভবনের ডিরেক্টর ফিজো মেকার, কোয়েল মল্লিক ও রাজ চক্রবর্তী। শিশির মঞ্চে, শুক্রবার। ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top