সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ কিংবদন্তির হেঁশেল। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। ধানসিঁড়ি। ১৬০ টাকা।
শুটিং চলছে সত্যজিৎ রায়ের ‘‌শাখাপ্রশাখা’‌ ছবির। সেখানে এক দৃশ্যে ছিল ভুনা খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ খাওয়া। ওই দৃশ্যে আরও অনেকের সঙ্গে ছিলেন হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তিনি নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না। খাবারের ওই গন্ধে। সেটের মধ্যেই শুরু করে দিলেন খাওয়া‌!‌ সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত বলে ফেললেন, ‘‌কী হচ্ছে কী হারাধন, শুটিংয়ের জন্য কিছু রাখো।’‌ এমন মজাদার ঘটনা শুনিয়েছেন মমতাশঙ্কর। যিনি সেদিন ওই ছবির সেটে ছিলেন। জানিয়েছেন ওই ছবির আউটডোর শুটিংয়ে ইউনিটের মেনু কী থাকত। ভাত, ডাল, আলু–‌ফুলকপির তরকারি আর ডিমের ডালনা। আবার সত্যজিতের পরের ছবি ‘‌আগন্তুক’‌–‌এর শুটিংয়ে আরেক কাণ্ড!‌ একটি দৃশ্যে মমতাশঙ্কর রবি ঘোষ আর উৎপল দত্তকে এনে দিচ্ছেন চায়ের সঙ্গে অভিনব এক বিস্কুট, হার্ট শেপের মুচমুচে বাটার বিস্কুট। যেটি বানিয়েছিলেন স্বয়ং বিজয়া রায়। শট দিতে গিয়ে তা মুখে তুলে স্বাদের অভিনবত্বে রবি ঘোষের কী ফূর্তি!‌ আর সেই ‘‌রিয়েল এক্সপ্রেশন’‌ই ধরা আছে শটে। এ সব কথাকাহিনি আছে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের কিংবদন্তির হেঁশেল বইয়ে। ১৬টি লেখায় ১৬ কিংবদন্তি সেলিব্রিটি রান্নাঘরের গপ্পো, রান্নাঘর রেসিপি মজা। নিঃসন্দেহে সুস্বাদু।
●‌ বাংলা পোস্টার। দুই বাংলার লেখা ও ছবি। সম্পাদনা:‌ শুভেন্দু দাশগুপ্ত। মনফকিরা। ৮৫০ টাকা
‘‌পোস্টার’‌ মানে যা ‘‌পোস্ট’‌ করা হয়, অর্থাৎ যা কোথাও সাঁটা হয়। বিজ্ঞাপনের জন্য। কিন্তু সেই প্রয়োজনের তাগিদটুকু ছাড়িয়ে সেই পোস্টার কখনও কখনও শিল্পের অতি উঁচুমানের দৃষ্টান্তও তো হয়ে ওঠে। তেমনই সব পোস্টারের কথা আর নমুনা নিয়ে শুভেন্দু দাশগুপ্ত গেঁথেছেন এই বই। ‘‌বাংলা পোস্টার দুই বাংলার লেখা ও ছবি’‌। পাতা উল্টে গেলে যেখানে প্রায় শ–‌চারেক পোস্টারের নমুনা। আর তার পাশাপাশি বিশ্লেষণ। সেখানে রাজনীতি, সিনেমা, কবিতা, প্রতিবাদ সব একাকার। ফারজানা আহমেদ জানিয়েছেন সিনেমার পোস্টার বানানোয় ব্যবহার হত এক বিশেষ ‘‌পেস্ট’‌ বা মিশ্র রং। এক ধরনের সস্তা গুঁড়ো রঙের সঙ্গে তিসির তেল মিশিয়ে এই রং তৈরি হত। এরপর কলকাতায় ছয়ের এবং ঢাকায় সাতের দশকে পোস্টার প্রিন্টিংয়ে চলে আসে ফ্লুরোসেন্ট রং। উত্তমকুমারের ছবির পোস্টার নিয়ে আলোচনায় আলোচক দেখেছেন, পোস্টারে জমির ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত উজ্জ্বল রঙে আঁকা উত্তম–‌সুচিত্রার মুখ। অন্য চরিত্রদের মুখ নীচে ম্যাড়মেড়ে রঙে আঁকা। পোস্টার এভাবেই তারকা নির্মাণ করে।
●‌ নবারুণের দুটি নাটক। সম্পাদনা:‌ রাজীব চৌধুরি। ভাষাবন্ধন। ১৮০ টাকা।
নবারুণ ভট্টাচার্য যে একজন ‘‌সিরিয়াস’‌ নাট্যকর্মী ছিলেন, ছিলেন নাট্যকার–পরিচালক, এমনকী মঞ্চের নিয়মিত অভিনেতাও, সে–কথাটা ঢাকা পড়ে যায় তাঁর লেখক–অনুবাদক সত্তার জনপ্রিয়তার ছায়ায়। তো, সেই অনভ্যাসে এবার বদল আনবে ‘‌নবারুণের দুটি নাটক’‌ নামে জোড়া নাটকের বইটি। দুটি নাটক— ‘‌জনি ও উর্বশী’‌ আর ‘‌যারা আগুন লাগায়’‌। কোনওটিরই কাহিনিকার নবারুণ নন। প্রথমটি মহাশ্বেতা দেবীর গল্প অবলম্বনে লেখা। পরেরটি জার্মান নাট্যকার ম্যাক্স ফ্রিৎজের ‘‌দ্য ফায়ার রেইজার্স’‌–এর ভাবানুবাদ। দু’‌টিরই কাহিনিকার স্বয়ং নবারুণ না ‌হওয়ায় কোনও ক্ষতি হয়নি, বরং এটা দেখার সুযোগ মিলেছে যে এক একটা অচেনা ‘‌কিসসা’‌র মধ্যে তিনি ঢুকে পড়ে যখন বেরোন, তখন কেমনভাবে সম্পাদনায়–সংলাপে–রিটেলিংয়ে করায়ত্ত করেন তাকে। সঙ্গে আছে নাটক সম্পর্কে নবারুণের নিবন্ধ। দু’‌টি নাটকেরই প্রকাশিত বিজ্ঞাপন, হ্যান্ডবিল, বুকলেট, চরিত্রলিপি, এমনকী টিকিটও।
●‌ যাত্রাপথে অজিতেশ। প্রভাতকুমার দাস। ঋত প্রকাশন। ৩২৫ টাকা
১৯৭৭। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনে এক পালাবদলের বছর। নান্দীকার ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন অজিতেশ। গড়ে তুলেছেন নতুন দল। আরও একটি বড় ঘটনা ঘটছে এই বছরে। প্রথম বারের জন্য পেশাদার যাত্রাদলে যোগ দিচ্ছেন অজিতেশ। দলের নাম ‘‌প্রদীপ অপেরা’‌। তবে অভিনেতা হিসেবে নন। পালাকার তথা নির্দেশক হিসেবে। একটি জীবনীমূলক পালা ‘‌রত্নাকর গিরিশচন্দ্র’‌। অন্যটি ঐতিহাসিক রোমান্স ‘‌আনারকলি’‌। দল নক্ষত্রখচিত, তবু সাফল্য এল না। পরের বছরও তাঁর রচিত পালা তেমন সাফল্য পেল না!‌ সে বছর তাঁর মঞ্চসফল নাটক ‘‌তিন পয়সার পালা’‌কে আনা হয়েছিল যাত্রার আসরে। ১৯৭৯–‌তে ‘‌রাবণ’‌ পালায় নিজেই মুখ্য ভূমিকায় নেমে এবার সশরীরে যাত্রার আসরে চলে এলেন অজিতেশ। তৃতীয় বছরেও চরম ব্যর্থতা ও সরাসরি সমালোচনার স্বাদ পেলেন গাঁ–‌গঞ্জে। ’‌৮০–‌তে নাগ কোম্পানিতে এসে ‘‌হাটেবাজারে’‌‌তে চলচ্চিত্রে করা দুষ্ট চরিত্রটি করে প্রথম সাফল্য পেলেন। সে সব কাহিনি তথ্যপ্রমাণ–সহ রোমাঞ্চকর উপন্যাসের মতো লিখেছেন প্রভাতকুমার দাস।
●‌ চৌরঙ্গী। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় জন্মশতবর্ষ সংখ্যা। সম্পাদক:‌ শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ২৫০ টাকা
‘‌অগ্নীশ্বর’‌ ছবির শুটিং চলছে তোপচাঁচিতে। পরিচালক ঢুলুবাবু ওরফে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় সকালবেলা দাঁত মাজতে মাজতে তাড়া লাগাচ্ছেন ইউনিটের সবাইকে। মাধবী মুখোপাধ্যায়কে তারই ভেতর বললেন, ‘‌আজকাল মাজনগুলো সব কেমন!‌ এতক্ষণ মাজছি কোনও ফেনাই হচ্ছে না!‌’‌ কৌতূহলী মাধবী দেখলেন অরবিন্দবাবু টুথপেস্ট দিয়ে নয়, বোরোলিন দিয়ে দাঁত মাজছিলেন!‌ নিজের ইউনিট নিয়ে আউটডোরে গেলে সবাইকে মনমতো মাছ–‌ভাত খাওয়াতে তিনি নিজে থলি হাতে বাজারে যেতেন বেছে মাছ কিনতে। জানিয়েছেন সন্ধ্যা রায়। আবার জয়া ভাদুড়ীর কাছে তিনি ফাদার ফিগার। এ সব স্মৃতি, মজার, গভীর, সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ‘‌চৌরঙ্গি’‌ পত্রিকার অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় সংখ্যা। এই সংখ্যার অতিথি সম্পাদক গোপাল দাশ। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তিনি যে ‘‌মিডল রোড’‌ সিনেমার অন্যতম পথিকৃৎ, সে কথাটা আলোচকদের লেখায় সুপ্রতিষ্ঠিত। আছে বিস্তারিত জীবনপঞ্জি ও চলচ্চিত্রপঞ্জি। তবে সর্বোচ্চ পাওয়া ‘‌কিছুক্ষণ’‌ আর ‘‌নকল সোনা’‌ ছবি দু’‌টির ‘‌ব্যাক টু ব্যাক কালার’‌ বুকলেট দুটি।
●‌ প্রতিরোধের সিনেমা। সম্পাদনা:‌ দ্বৈপায়ন ব্যানার্জি, কস্তুরী বসু, তৃণানীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায়। পিপলস ফিল্ম কালেকটিভ। ১০০ টাকা।
‘‌পিপলস ফিল্ম কালেকটিভ’‌ও এক অন্যরকম সিনেমা সংগঠন। যারা খুঁজে নিয়ে আসে তথ্যচিত্র আর বিকল্প ধারার ছবির সম্ভার। তা নিয়ে দু’‌টি উৎসব করে প্রতি বছর। গত সাত বছর ধরে। আর এই সাত বছর ধরে তারা প্রকাশ করে চলেছে একটি সারগর্ভ পত্রিকা। যা‌ চিন্তার ক্ষেত্রে সত্যিই প্রতিরোধাত্মক। সুকান্ত মজুমদারের ‘‌কোমল গান্ধার’‌ নিয়ে লেখায় সতর্কবাণী এ ছবিকে একমাত্রিক ‘‌ন্যারোটিভ’‌ হিসেবে দেখে, দেখিয়ে এর গায়ে বিশেষ একটি ধর্মের অনুষঙ্গের স্ট্যাম্প যেন না লাগানো হয়। এ লেখার শেষে একটি কিউ আর কোড মুদ্রিত আছে। তা ডাউনলোড করলে শোনা যাবে এ ছবিতে হিন্দু উদ্বাস্তুদের গাওয়া গানগুলি এবং শোনা যাবে সেখানে বহুবার উচ্চারিত নানা মুসলিম ধর্মীয় অনুষঙ্গের সশ্রদ্ধ উল্লেখ। ‘‌পদ্মাবতী’‌র মতো ছবি প্রচ্ছন্নে কেমনভাবে হয়ে ওঠে ‘‌রেজিমেন্টেড’‌ হিন্দুত্বের পর্দাপ্রচার, তার প্রকাশ অন্য একটি প্রবন্ধে। এই সূত্রেই এসেছে শ্যাম বেনেগালের ‘‌ভারত এক খোঁজ’‌–‌এ পদ্মাবতী ‘‌মিথ’‌কে অন্যভাবে খোঁজার চেষ্টার কথাও।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top