তিনি মনে করেন, দেশে তঁার মতো উদাহরণ নেই। কারণ, তিনিই একাধারে শিল্পী এবং শিক্ষক। পাশাপাশি, সঙ্গীতের ছাত্রও। প্রশ্ন করেছিলেন লোপামুদ্রা ভৌমিক

 কেরিয়ারের শুরুতে মঞ্চে তখনকার প্রখ্যাত শিল্পীদের গাওয়া আধুনিক গান গাইতেন। পরে কেন ক্লাসিক্যালে থিতু হলেন?‌
অজয় চক্রবর্তী: আমার শিক্ষার শুরু রাগসঙ্গীত দিয়েই। কিন্তু বাবা কীর্তন গাইতেন। জগন্ময় মিত্রের গান গাইতেন। আমি মান্না দে, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভক্ত ছিলাম। সুতরাং, রাগসঙ্গীতের পাশাপাশি রাগ আঙ্গিকের আধুনিক গানগুলিও গাইতাম রাগসঙ্গীতের প্রচার ও প্রসারের জন্য। সেই গানগুলোকে আধুনিক বলব না। রাগাশ্রয়ী বাংলা গান বলব। সেই গান মানুষের এত ভাল লেগেছিল, যে গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে বেশ কয়েকটা রেকর্ড করানো হয় আমাকে দিয়ে। আমিই বোধহয় শেষ গায়ক, যার লং প্লেয়িং রেকর্ড হয়। সুতরাং রাগসঙ্গীত থেকে কখনও দূরে থাকিনি। আজও আমি রাগসঙ্গীতের ছাত্র। তবে তখনকার দৃষ্টি আর এখনকার দৃষ্টির মধ্যে বিস্তর তফাত। 
 আপনার শিল্পীসত্ত্বা কি শিক্ষকসত্ত্বার কাছে ঢাকা পড়ে গেছে?‌
অজয়: একদমই না। শিক্ষকতাটা কর্তব্য। আমি তো শিল্পীসত্ত্বা বাদ দিয়ে শিক্ষকতায় আসিনি। যে সময়ে সারা ভারতে সবথেকে বেশি অনুষ্ঠান করতাম, তখন আমার গুরুজি বলেছিলেন, শুধু গাইলেই হবে না। শিক্ষক হিসেবে সঙ্গীতের এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে সঙ্গীতশিক্ষার একটা ধারা তৈরি করেছি। আমার ‘‌শ্রুতিনন্দন’‌ এককথায় ‘‌সিস্টেম অফ ট্রেনিং’‌। দেশে আমার মতো উদাহরণ নেই। কারণ, অনেকেই নিজের গানটা ঠিকঠাক রাখার জন্য শিক্ষকতা করতে চান না। সেজন্যই শুভলক্ষ্মী, ভীমসেন যোশি, বিসমিল্লা খান, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলের মতো শিল্পীদের পরবর্তী প্রজন্ম কেউ নেই। এটা আমাদের লজ্জা। সেইজন্যই আমি নিজের স্বার্থত্যাগ করে ‘‌শ্রুতিনন্দন’‌ তৈরি করেছি। তা বলে গান করছি না এমন নয়। তবে আপস তো আছেই। আমি আমার সন্তানকেও বড় করতে চাইব, আবার নিজেও বড় হব, এটা হয় না। সন্তানের জন্য নিজের স্বার্থকে ত্যাগ করতেই হয়। 
 ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই তো যশে আপনাকে ছাপিয়ে গেছে?‌
অজয়: নিজের সন্তান নোবেল পুরস্কার পেলে যেমন লাগে, আমার অনুভূতিটাও ঠিক তেমনই। আমার চ্যালারা যে এত ভাল গান করছে এবং ওদের সাফল্যে যে সামান্য হলেও আমার অবদান আছে, সেজন্য আমি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ। 
 রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা কতটা প্রাসঙ্গিক?‌
অজয়: রবি ঠাকুরের গান নিয়ে প্রচুর গবেষণা দরকার। কারণ, কবিগুরুর কাব্য ও সঙ্গীতের সরলতা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ। সঙ্গীতের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক তালিম প্রয়োজন। কিন্তু যাঁরা রাগসঙ্গীতের তালিম পেয়েছেন, তাঁরা কখনও রবীন্দ্রনাথের গান করেননি। আর যাঁরা রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন, তাঁদের সেই বিশেষ শিক্ষার সুযোগ হয়নি। সুচিত্রা মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়–সহ সকলেই রবীন্দ্রনাথের গানের কাব্যিক দিকটা বিচার করেই তাঁর গান গেয়েছেন। শুধু কাব্য হলে তো কবিতা বললেই চলত! সাঙ্গীতিক সূক্ষ্ণতাটা কোথায় যাবে?‌ রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে সাঙ্গীতিক বিচার, সৌন্দর্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আমি সেই চেষ্টা চালিয়েছি। 
 মোহন সিং তো রাগসঙ্গীতেরই শিল্পী। পরে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁকে তো কোনও পরীক্ষা করতে হয়নি?‌
অজয়: মোহন সিং–এর খেয়ালের ক’‌টা রেকর্ড আছে?‌ কতবার ডোভার লেনে গেয়েছেন?‌ ওঁর ক্লাসিক্যাল শিক্ষা নেই বলছি না। তবে উনি ক্ল্যাসিক্যালটা গাইতে পারলে তো কয়েকটা কনফারেন্সে পরিবেশন করতেন। সে তো লতা মঙ্গেশকরও ক্ল্যাসিক্যাল শিখেছিলেন। কোনও শিল্পীকে বিচার করতে গেলে তার শিক্ষার চরিত্র, ভাব, অবদান, সেবা— সবকিছু চিন্তা করতে হবে। 
 ধ্রুপদীসঙ্গীত জগতের অন্দরের রাজনীতির শিকার হয়েছেন?‌
অজয়: কোনও রাজনীতি আমি মানি না। অন্যকে ছোট করে নিজে বড় হওয়া যায় না। আমার থেকে বেশি সম্মান, ভালবাসা, শ্রদ্ধা ভারতবর্ষে খুব কম মানুষ পান। আমার সঙ্গে রাজনীতি করে কোনওদিন কেউ কিছু করতে পারেনি। করার কোনও প্রয়োজনও কারও হবে না। কারণ, আমি চিরকালই সঙ্গীতের ছাত্র থাকব। 
 আলি আকবর খাঁ বা রবিশঙ্করের মত বিদেশে কোনও সঙ্গীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন না কেন?‌
অজয়: বিদেশের ছেলেমেয়েরা কি দেশের ছেলেমেয়েদের থেকে ভাল রাগসঙ্গীত সৃষ্টি করতে পারবে?‌ বিদেশিদের স্বাদটাই তো আলাদা। দেশে থেকে আমার থেকে খুশি বোধহয় কেউ নেই। কারণ, আমি দেশকে একটা সংস্থা দান করতে পেরেছি। যেখান থেকে অর্থনৈতিক কোনও সুবিধে কখনও নিইনি। আর রবিশঙ্কর, আলি আকবর খাঁ, বড়ে গুলাম আলি খাঁ— যাঁর নামই বলা হোক না কেন, ঈশ্বর এই করুণা একমাত্র আমাকেই করেছেন। 
 ক্লাসিক্যালের প্রতি নতুন প্রজন্মের বিমুখতার কারণ কী?‌
অজয়: আমরা নতুন ছেলেমেয়েদের মধ্যে এর মাধুর্য ছড়িয়ে দিতে পারিনি। এটা আমাদের দোষ। যদিও আমি আমার অভিজ্ঞতায় দেখছি, দেশের রাগসঙ্গীতের ভবিষ্যত যথেষ্ট উজ্জ্বল।  
 টেলিভিশনে রিয়্যালিটি শো–গুলো কি রাগসঙ্গীতের ভালবাসার ক্ষেত্রে হানি ঘটাচ্ছে?‌
অজয়: সাধনার দিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রিয়্যালিটি শো গুলো যদি ঠিকঠাক করা যায় তাহলে এর মাধ্যমেও রাগ সঙ্গীতের প্রচার ও প্রসার সম্ভব। ভুলভাবে ব্যবহার করলে তো এরকমই হবে। 
 আপনার কন্যা তথা সঙ্গীতশিল্পী কৌশিকী চক্রবর্তী কি কোনওদিন আপনাকেও ছাপিয়ে যেতে পারেন?‌
অজয়: সেদিন সবথেকে আমি খুশি হব। তবে আমি যদি ওকে তৈরি করি, তবেই ছাপিয়ে যাবে। সেই চেষ্টাই তো চালাচ্ছি। 
 রাশিদ খানের সঙ্গে আপনার সম্পর্কে একটা শীতলতা ছিল। সেটা কি এখনও জারি আছে?‌ 
অজয়: শীতলতা তো কখনও ছিল না। ও আমার আত্মার ভাই। কোনও সাফল্য পেলে ও প্রথম ফোনটা আমাকেই করে। ওর সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে এবং আজীবন থাকবেও।‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top