ফেলুদাকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন। মনে করেন, ফেলুদার মনন বাঙালি হলেও তিনি সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক। প্রশ্নের জবাব পেলেন লোপামুদ্রা ভৌমিক

 আপনার ‘‌ফেলুদা ৫০’‌–এ বিভিন্ন মানুষ তাঁদের নিজস্ব দর্শনে ফেলুদাকে বিশ্লেষণ করেছেন। আপনার ফেলুদা–দর্শনটা কী?‌
‌সাগ্নিক চট্টোপাধ্যায়: যাঁরা ফেলুদাকে নিয়ে বলেছেন, তাঁদের সবার মতের সারাংশই আমার দর্শন। সবাইকে সেভাবেই প্রশ্ন করা হয়েছিল। যে যার মতামত বলেছেন। ওঁদের বক্তব্যের সবটা মিলিয়েই আমি ফেলুদাকে দেখি। 
 বইয়ে ফেলুদা পড়তে গিয়ে অনেকে বলেন, তিনি আসলে সত্যজিতের প্রতিলিপি। কেউ বলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ভেবেই ফেলু মিত্তিরের কল্পনা। আপনি কোনটায় বিশ্বাসী?‌
‌সাগ্নিক: সত্যজিৎ রায় তো বটেই। তবে আমার মনে হয় তিনি ছাড়া বেণুদার (‌‌সব্যসাচী চক্রবর্তী)‌‌ সঙ্গেই বেশি মিল ফেলুদার। আসলে এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা চলে না। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর বেণুদা — দু’‌জনেই ফেলুদার আলাদা আলাদা অংশ তুলে ধরেছেন। কেউই সম্পূর্ণ ফেলুদা নন। যেমন বেণুদার উচ্চতা, ‘‌বোম্বাইয়ের বোম্বটে’‌তে কুংফুর করিশ্‌মা বেণুদা ছাড়া ভাবতেই পারি না। অন্যদিকে, ‘‌সোনার কেল্লা’‌র ওই বুদ্ধিদীপ্ত অভিযান সৌমিত্র ছাড়া অসম্ভব। আমার কাছে ফেলুদা ঠিক গড়পরতা বাঙালি গোয়েন্দা নন। তাঁর মনন বাঙালি। কিন্তু তিনি সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক। 
 তাহলে ব্যোমকেশ বা গোয়েন্দা শবরকে ফেলুদার থেকে পিছিয়ে রাখছেন?‌
‌সাগ্নিক: পিছিয়ে রাখার ব্যাপার নেই। কিন্তু ফেলুদা এঁদের থেকে আলাদা। ব্যোমকেশ গল্পের ফর্মূলার মধ্যেই ঘোরাফেরা করেন। যা ফেলুদা এক্কেবারে করেন না। তাছাড়া ব্যোমকেশের সব গল্পের মধ্যে কাম এবং যৌনতা অন্যতম উপকরণ। পৃথিবীর সেরা গোয়েন্দা গল্পগুলিতেও এই ব্যাপারগুলো ভীষণভাবে রয়েছে। কিন্তু ফেলুদায় তা নেই। কারণ ফেলুদা যে বয়সের জন্য লেখা, সেখানে এসব চলে না। সারা বিশ্বের গোয়েন্দা গল্পে জটায়ুর মতো কোনও চরিত্রও আর নেই। জটায়ু একেবারেই আমবাঙালি। সুতরাং ফেলুদা, জটায়ু একেবারেই ভিন্ন মেরুর দু’‌জন। আর দুই বিপরীতের কম্বিনেশন একসঙ্গে বলেই এত জোরাল। 
 বইয়ের ফেলুদা আর পর্দার ফেলুদার মধ্যে একটা বদল আছে। এটা চলচ্চিত্রের জন্য কতটা সুফল এনেছে?‌
‌সাগ্নিক: খুবই ভাল হয়েছে। আমার দেখা সর্বকালের সেরা পাঁচটা সিনেমার একটা ‘‌সোনার কেল্লা’‌। দ্বিতীয় সেরা ‘‌রয়েল বেঙ্গল রহস্য’‌। বইয়ের পাতার গল্পকে ধরে, তুখড় সংলাপ আর টানটান উত্তেজনায় যেভাবে ছবিটা তৈরি, একটা ব্যক্তিগত ক্রাইসিসকে বইয়ের পাতা থেকে পর্দায় যেভাবে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে, তাতে আমি চমৎকৃত! ছবিটায় সেই অর্থে কোনও অ্যাকশন নেই। প্রেক্ষাপটে কেবল জঙ্গল আর জঙ্গল। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এরকম একটা সিনেমা তৈরি করা মুখের কথা নয়।
 সন্তোষ দত্ত মারা যাওয়ার পর সত্যজিৎ নিজেই ফেলুদার সিনেমা তৈরি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সত্যজিৎ–পরবর্তী ছবিতে জটায়ু সন্তোষ দত্তর অনুপস্থিতি ছবির ভিত নাড়িয়ে দেয়নি?‌
‌সাগ্নিক: আমার সেটা মনে হয় না। সন্তোষ দত্তের পর রবি ঘোষের প্রথম দিকের জটায়ুর অভিনয়ের সময় থেকে ‘‌গোঁসাইপুর সরগরম’‌ করার সময়কার অভিনয়ে সাবলীলতা অনেক বেশি। ওঁর চলে যাওয়াটা জটায়ু চরিত্রে একটা ধাক্কা তো বটেই। আসলে সন্তোষ দত্তর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জটায়ু করা খুব কঠিন। তাই পরবর্তীকালে কেউই ওঁকে নকল করেননি। সবাই নিজের মতো করে জটায়ুকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। বিভু ভট্টাচার্যও খুব ভাল করেছেন। তবে হিন্দিতে মোহন আগাসে আমার অত্যন্ত পছন্দের জটায়ু। একদম অন্য জটায়ু। আলাদা হওয়াটা খুব জরুরি।
 কিন্তু ইদানীং তো বিভিন্ন গোয়েন্দা চরিত্রে একই অভিনেতা অভিনয় করছেন। এতে আলাদা ব্যাপারটা কি আদৌ থাকছে?‌
‌সাগ্নিক: ফেলুদার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। আবির চট্টোপাধ্যায় ব্যোমকেশ করার পর আর ফেলুদায় ফিরতে পারলেন না। একমাত্র ফেলুদাই এই ব্যাপারটা ঠিকঠাক মেনে চলেছে। তাছাড়া অন্যান্যদের বিষয়ে বলাটা সমস্যার। এমন কিছু কথা বলতে হবে, যেগুলো খুবই অপ্রিয়। তাই এই প্রশ্নটা কাটিয়েই গেলাম। 
 ফেলুদার ছবির অধিকার এখনও বিশপ লেফ্রয় রোডেই সীমাবদ্ধ। এটা কতটা ক্ষতি বা লাভ করেছে?‌
‌সাগ্নিক: ভালই হয়েছে। কারণ, ফেলুদার কপিরাইট যাদের কাছে থাকবে, সেই পরিবারের কেউ পরিচালক হলে অন্য কাউকে কেন দিতে যাবে?‌ আমি হলেও দিতাম না। তাছাড়া, ফেলুদা যে সময়ে লেখা হয়েছিল, গল্পে স্বাভাবিকভাবেই সেই সময়ের ছাপ রয়েছে। ফেলুদাকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফেলতে গেলে তার মধ্যে এখনকার সময়ের উপাদান দিতেই হবে। একটা চূড়ান্ত ব্যালান্সের প্রয়োজন। আমার মতে, এই ব্যালান্সটা একমাত্র করতে পারেন সন্দীপ রায়। এটা অত্যন্ত কঠিন। এজন্যই আমি নিজে কখনও ফেলুদা করব না। 
 একটা তথ্যচিত্রকে বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি দেওয়ার সাহস কোথা থেকে অর্জন করলেন?‌
‌সাগ্নিক: আমার তো সাহসটুকুই আছে! অনেকেই তখন বলেছিলেন, বাণিজ্যিকভাবে একটা তথ্যচিত্রের মুক্তি ব্যাপারটা খুব ভুল। আমি বলেছিলাম, হোক ভুল। দেখি না কী হয়। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কিন্তু করতে হবে মানে করতে হবেই। 
 ফেলুদার বাইরে কিছু ভাবছেন না?‌
‌সাগ্নিক: সত্যজিৎ রায়ের অন্য গল্পের কপিরাইট নেওয়া আছে। ওটা করব। তাছাড়া নতুন লেখকদের সঙ্গে কাজ করতে চাই। যেমন স্মরণজিৎ চক্রবর্তী আমার খুব প্রিয়। কাজ করতে চাই প্রচেত গুপ্ত, শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়ন্তনী দাশগুপ্তর লেখা নিয়েও। এঁদের প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে আলাদা। আর সিনেমাতে যদি আলাদা কিছু দেওয়া না গেল, তবে মানুষ দেখবেন কেন?‌

জনপ্রিয়

Back To Top