এমনটাই মনে করেন তিনি। পাশাপাশিই তিনি মনে করেন, দেশে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখন বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রশ্ন করেছিলেন লোপামুদ্রা ভৌমিক

ইদানিং চারিদিকেই থিয়েটারের উৎসব। অলিতে–গলিতে নাটকের দল। এই ছড়িয়ে যাওয়া বাংলা থিয়েটারের পক্ষে কতটা সুফল বা কুফল বয়ে আনছে?‌
বিভাস চক্রবর্তী: থিয়েটার যদি বেশি হয় এবং মানুষ যদি তার মধ্যে শিল্পের উপাদান এবং রস উপভোগ করেন, তাহলে তো থিয়েটার বেশি হলে ক্ষতি নেই। কিন্তু রসিক মানুষজন আবার সংখ্যার থেকে গুণের আধিক্যটাই মূলত চেয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে সংখ্যা যদি কেবলই নিজেদের জাহির করার জন্য হয়, যদি তার প্রকাশ শিল্পের রূপ ধরে না আসে, তাহলে সেগুলো আমাদের থিয়েটারের যে প্রবাহ এবং ঐতিহ্য, তাকে ব্যাহতই করে। 
 বাংলা থিয়েটারের এই সংখ্যাধিক্য কি অনুদানের জন্য?‌
বিভাস: আমি মনে করি না বাংলা থিয়েটারে গ্রান্টের ছড়াছড়ি। যত লোক থিয়েটার করেন, তার তুলনায় গ্রান্ট খুবই কম আসে। ‌থিয়েটারে এখন প্রচুর টাকা আসছে, সেই টাকা দিয়েই থিয়েটার হচ্ছে—এগুলো ‘মিথ’ ছাড়া কিছু নয়। আসল ব্যাপারটা হল, আমাদের দেশে ভাল কাজের পথ খুব কম। বিশেষ করে কমবয়সীদের জন্য। সেজন্য তাদের মধ্যে দুর্নীতি বা বখে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই যারা ভাল কাজ করতে চায়, তারা থিয়েটার করার দিকে যায়। কারণ, আর কোনও ভাল পথ যুব সম্প্রদায়ের কাছে খোলা নেই। তবে রাষ্ট্রশক্তি বা সরকার যে থিয়েটারকে পোষণ করে, এটাও বলছি না। তারা থিয়েটারের দিকে নামমাত্র কিছু ভিক্ষান্ন ছুড়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। 
 অতীতে বাংলা থিয়েটারে নানা রাজনৈতিক ইস্যু প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে। ইদানিং আবার রাজনৈতিক ইস্যুর ছড়াছড়ি। তবু থিয়েটারে তার প্রতিফলন সেভাবে নেই কেন?‌
বিভাস: মানুষ দেখছেন বর্তমানে স্বাধীনভাবে কিছু কথা বলাটা সারা দেশেই নানাভাবে নানা পথে বিঘ্নিত হচ্ছে। সেজন্য নিরাপদ থাকতে চান সকলেই। শুধুমাত্র থিয়েটার করছেন। সেই থিয়েটারটাও বন্ধ হয়ে যাবে?‌ এই সামান্য থিয়েটারের জন্য তঁার ওপরে আক্রমণ নেমে আসবে?‌ এই ভয়ে আগে থেকেই সাবধান হয়ে নিরাপদ নাটকই করতে চাইছেন সকলে। 
 সেজন্যই কি শাসকের সঙ্গে সমঝোতা?‌
বিভাস: না। এটা সমঝোতা নয়। সমঝোতা অনেকেই করেন না। বরং উল্টোটা। তঁারা শাসকের সঙ্গে সঙ্ঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে চাইছেন না। কারণ, এখন প্রশাসন সবকিছু গ্রাস করতে চায়। যে থিয়েটারকে তারা নামমাত্র সাহায্য করে বা করে না, তাকেও গ্রাস করতে চায়। একেকটি থিয়েটারের অনুষ্ঠানের কার্ডে দেখলে দেখা যায় সেখানে রাজনৈতিক লোকজনের নামের একেবারে নীচে থিয়েটারের লোকজনদের নাম। আমার কাছে এমন অজস্র প্রমাণ রয়েছে। সুতরাং, থিয়েটারকে বা শিল্পকে সেই গুরুত্ব দেওয়াই হয় না। থিয়েটার যেন অনুগৃহীত হয়েই থাকতে চায়, এরকম একটা ধারণা আছে লোকজনের মধ্যে। 
 থিয়েটারে ইদানিং ফ্রিল্যান্স অভিনেতা–নির্দেশকের ছড়াছড়ি। এটা বাংলা থিয়েটারের জন্য কতটা ফলদায়ক?‌
বিভাস: নির্দেশক ফ্রিল্যান্স কম আছেন। অভিনেতার সংখ্যাই বেশি। এটার বিভিন্ন কারণ হতে পারে। একটা কারণ হতে পারে, কারও হয়তো এ বিষয়ে দক্ষতা আছে। তাঁর হয়তো অন্যত্র রুজির ব্যবস্থা নেই। তিনি বিভিন্ন দলে কাজ করে তাঁর দক্ষতাও প্রমাণ করছেন। রোজগারও হচ্ছে। আর একটা কারণ হতে পারে, থিয়েটার সকলেই করেন। আমিও করি। অভিনয় না জেনেই টাকা নিয়ে অভিনয় করছেন। এই সাহসটা সে পাচ্ছে বা তঁারা পাচ্ছেন পরিস্থিতির কারণে। কারণ, আশেপাশে যা দেখছে তাই শিখছে। পেশাদার জগৎ হলে এমনটা হত না। 
 বাংলা থিয়েটার এখনও পেশাদার হয়ে উঠতে পারেনি?‌
বিভাস: আমি মনে করি, আমরা যে থিয়েটার করেছি সেটা পেশাদারের থেকেও বেশি পেশাদার। আমি বলতে চাইছি, পেশাদার জগতে যাদের অর্থ রোজগারের তেমন সম্ভাবনা নেই, অভিনয় করে তারা সেই সুযোগটা ব্যবহার করছে।  
 বাংলা থিয়েটারের পুরুষতান্ত্রিকতা কি কাটিয়ে ওঠা গেছে?‌
বিভাস: পুরুষতান্ত্রিকতা এভাবে মাপা যায় না। অনেক মহিলা নির্দেশক এ জগতে রয়েছেন, যাঁরা যথেষ্ট ভাল কাজ করছেন। সংখ্যা দিয়ে তো বিচার করা যাবে না। গোটা সমাজটা যেভাবে এগোচ্ছে, সবকিছুই তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হচ্ছে। রাতারাতি সব মহিলা প্রচারের আলোয় আসবেন এটা ভাবা অন্যায়। মহিলা সংরক্ষণ বিলই তো এখনও পার্লামেন্টে পাশ হল না!‌ এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে সমাজটা কীভাবে এগোচ্ছে এবং রাজনীতি কোন পথে যাচ্ছে। সেখানে মহিলাদের স্থানটা ঠিক কী, সেটাও বোঝা যাচ্ছে। তাই থিয়েটারে হঠাৎ করে মহিলারা উঠে আসবেন, এটা ভাবা ঠিক নয়। তবে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, বাংলা থিয়েটারে পুরুষতান্ত্রিকতা আছে। 
 বাংলা থিয়েটারে যে কর্তৃত্বের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা, তা থিয়েটারের ভবিষ্যতের জন্য কতটা দরকারি?‌
বিভাস: ধরা যাক, আমি একজন দক্ষ সংগঠক। এবার আমি যদি দলের মাথায় না থাকি, তাহলে তো দলটাই চলবে না! শম্ভু মিত্র চলে যাওয়ার পর বহুরূপীর কী অবস্থা!‌ সেখানে তালা পড়েছে। উৎপল দত্ত চলে গেলেন। এলটিজি উঠে গেল। একমাত্র ব্যতিক্রম নান্দীকার। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় চলে যাওয়ার পরও রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত দক্ষ হাতে চালাচ্ছেন। এগুলো প্রমাণ করে, শিল্পসৃজনে যাঁর ক্ষমতা রয়েছে, তাঁকেই উন্নতির জন্য কর্তৃত্বের দায়িত্ব দেয় দল। তাঁরা নিজেরা কর্তৃত্ব করেন না। দলই তাঁদের কর্তা বানায়। তঁারা ছায়ার মতো দলকে রক্ষা করেন। নয়তো দল হারিয়ে যাবে। 
 বর্তমানে বাংলা থিয়েটার ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে?‌
বিভাস: ভাল–খারাপ মিলিয়েই আছে। চিরকালই তাই ছিল। তবে আগে শৃঙ্গগুলোকেই মূলত বেশি দেখা যেত। কারণ, সংখ্যায় কম ছিল। এখন তা নয়।  বর্তমানে অনেক টিলা তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে শৃঙ্গগুলোকে বেছে দেখা কঠিন।

জনপ্রিয়

Back To Top