অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় 

সেই তো কবেই ঘোষণা হয়েছে, পুজোয় রিলিজ করবে কাকাবাবুর নতুন ছবি। কিন্তু এই ঘোষণায় কি আস্থা রাখতে পারছেন স্বয়ং ‘‌কাকাবাবু’‌ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়?
বিদেশ থেকে শুটিং সেরে এসে সেই যে নিজের বাড়ি ‘‌উৎসব’‌–‌এ ঢুকেছেন প্রসেনজিৎ, তার পর থেকে চার মাসের বেশি সময় তিনি গৃহবন্দি। একসময় তো সব কিছু স্তব্ধ ছিল টানা লকডাউনে। এখন রাস্তা থেকে গাড়ি‌ঘোড়ার শব্দ আসে বাড়িতে। কিন্তু সেই শব্দে প্রাণ খুঁজে পান না প্রসেনজিৎ। বললেন, একটা ছোট্ট ভাইরাস পাল্টে দিল পৃথিবী, পাল্টে দিল জীবন। সব কিছুই যখন পাল্টে যাচ্ছে, সিনেমাও পাল্টে যাবে, সন্দেহ নেই। সেই পাল্টে যাওয়া সিনেমা কেমন হবে, সেটাও এখন অনিশ্চিত। এটা নিশ্চিত কণ্ঠেই বলে ওঠেন প্রসেনজিৎ।
বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি পাল্টে যাওয়া ছবিতেই নিজেকে আবিষ্কার করতে করতে চলেছেন। তার শেষতম দৃষ্টান্ত ‘‌নিরন্তর’‌।
এবং এই পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতিতে বাংলা সিনেমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা তিনিই নিয়েছিলেন শুধু ‘‌নিরন্তর’‌–‌এর অভিনেতা হিসেবে নন, এই ছবির প্রযোজক হিসেবেও। এই ছবির রিলিজ এবং প্রিমিয়ার করেছেন ছোটপর্দায়।
অন্য পরিচালক ও প্রযোজকরা কি সেই রাস্তায় হাঁটবেন? প্রসেনজিৎ বলেন, ভাবতে হবে সবাইকেই। ছবি তৈরি হয়ে যাওয়ার পরে কতদিন আটকে রাখা যাবে, কীভাবে পৌঁছনো যাবে দর্শকদের কাছে, কীভাবেই বা এই পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতিতে প্রযোজকরা তাঁদের বিনিয়োগের টাকার একটা বড় অংশ ফেরত পেতে পারেন, সবটা নিয়েই চিন্তা–‌ভাবনা করাটা জরুরি বলেই তিনি মনে করেন।
অভিনেতা হিসেবে একাধিক অন্যরকম ছবির প্ল্যানিং হয়েছিল। প্রযোজক হিসেবেও প্ল্যানিং ছিল কিছু। সবটাই অনিশ্চিত এখন। অনিশ্চিত, কিন্তু ভাবনা–‌চিন্তা থেমে নেই প্রসেনজ
 প্রযোজক নিশপাল সিং রানে তথা সুরিন্দর ফিল্মসের প্রযোজনায় প্রায় ১০টি ছবি তৈরি হয়ে আছে। সদ্য করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন নিশপাল, কোয়েল মল্লিক। নিশপালও ভেবে পাচ্ছেন না কবে রিলিজ হতে পারে ছবিগুলো। নতুন ছবির শুটিং করার সম্ভাবনাও এখন নেই। সিনেমা হল না খুললে তো রিলিজের প্ল্যানিংও অসম্ভব, জানালেন নিশপাল।
বেশ কয়েকজন পরিচালকের ছবি সম্পূর্ণ হয়ে গেছে বহুদিন। শুটিং, ডাবিং, এডিটিং সব শেষ। কিন্তু সব ছবিই এখন স্তব্ধতার মধ্যে। 
কৌশিক গাঙ্গুলির তিনটে ছবি সম্পূর্ণই বলা যায়। তার মধ্যে আছে ‘‌অর্ধাঙ্গিনী’‌, ‘‌লক্ষ্মী ছেলে’‌। এই সব ছবি কবে মুক্তি পাবে, সেটা নিয়ে কোনও প্ল্যানিং করার কথাই ভাবেননি তিনি। কৌশিক বললেন, প্ল্যানিং করার কোনও অধিকার আমাদের নেই, এই করোনা পরিস্থিতি সেটাই আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে। ‘‌প্ল্যানিংয়ের অধিকারহীন’‌ দর্শন নিয়ে গৃহবন্দি এই খ্যাতিমান পরিচালক।
শুরুর দিকে সৃজিত মুখোপাধ্যায়  জানিয়েছিলেন, পুজোয় রিলিজ করবে তাঁর ‘‌কাকাবাবুর  প্রত্যাবর্তন’‌। কিন্তু এখন কোনও কিছুই নিশ্চিত ভাবে বলা যে সম্ভব নয়, স্পষ্টই বললেন জনপ্রিয় এই পরিচালক।
অরিন্দম শীলের ‘‌মায়াকুমারী’‌ও রিলিজ করবে পুজোয়, এমনই ঘোষণা ছিল। কিন্তু সিনেমা হল খোলার মতো পরিস্থিতিই যখন নাগালের বাইরে, তখন নিশ্চিত ভাবে কোনও তারিখ কি ঘোষণা করা যায়?‌ ‘‌ব্যোমকেশ’‌ ও ‘‌শবর’‌ সিরিজের জনপ্রিয় পরিচালক অরিন্দম তো পরবর্তী শবরের চিত্রনাট্য রেডি করে বসে আছেন। কিন্তু শুটিং করার পরিস্থিতি কোথায়?
লকডাউনের সময় পর পর শর্ট ফিল্ম তৈরি করে চমকে দিচ্ছিলেন বক্স অফিস সফল পরিচালক জুটি নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ‘‌বেলাশেষে’‌র জনপ্রিয়তা ম্লান হবে না তাঁদের তৈরি হয়ে থাকা ছবি ‘‌বেলাশুরু’‌তেও, এটাই ধারণা ইন্ডাস্ট্রির। সৌমিত্র–‌স্বাতীলেখা জুটির এই ছবিও বহুদিন ধরেই মুক্তির দিন গুনছে। কবে ‘‌বেলাশুরু’‌ ইনিংস শুরু করবে, কেউ জানে না।
রাজ চক্রবর্তী ছবি করতে চান বুদ্ধদেব গুহর ‘‌বাবলি’‌ নিয়ে। এটা তো ভবিষ্যতের কথা। কবে শুটিং শুরু করা যাবে, রাজও জানেন না। তাঁর ছবি ‘‌ধর্মযুদ্ধ’‌ রেডি। বক্স অফিসের যুদ্ধ কবে থেকে, রাজও জানেন না।
প্রসেনজিৎ বললেন, এই বছরের ক্যালেন্ডারটা কোনও কাজে লাগবে না। যদি ঈশ্বর দয়া করেন, পরের বছর এই সময়ে হয়তো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারব। তবে, প্রসেনজিৎ মনে করেন, সিনেমা হলে রিলিজের দিকে আর বোধহয় তাকিয়ে থাকা যাবে না। হিন্দি ছবি তো ঢেলে রিলিজ হচ্ছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। ওদের তো নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, ডিজনি প্লাস/‌ হটস্টার, সোনি লিভ, জি ফাইভের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আছে। এখানে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম যদি আরও জোরদার না হয়, তাহলে অনেক ছবিকেই মুক্তির পথ খুঁজে নিতে হবে টেলিভিশনে, ‘‌নিরন্তর’–‌এর মতো। 
তবে, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় থেকে কৌশিক গাঙ্গুলি, সবাই মনে করছেন, করোনা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে জীবন। 
দূরে, সিঙ্গাপুরে রয়েছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। বললেন, আমাদের জীবনটাই তো সিনেমা নিয়ে। কিন্তু এখন কোনও কিছুই নিশ্চিত নয়। সত্যিই কোনও প্ল্যান করে লাভ নেই। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সুসময়ের জন্যে, ফোনে বললেন ঋতুপর্ণা।
 সেই নতুন দিনের অপেক্ষায় শুধু সিনেমা জগৎ নয়, গোটা পৃথিবী। জীবন। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top