তাঁর মতে কোনও মহিলার হাতে ক্ষমতা গেলে তিনিও পুরুষতন্ত্রের উপাদানের মধ্যে চলে যান। প্রশ্ন করে সোজাসাপ্টা জবাব পেলেন লোপামুদ্রা ভৌমিক

 ‘‌মাধব মালঞ্চি কইন্যা’‌ থেকে মিসেস উদ্‌গারিকা— লম্বা সফর। সেই আপনি আর এই আপনির মধ্যে তফাত কতটা?‌
সুরঞ্জনা দাশগুপ্ত: প্রথমত বয়স। আর জটিলভাবে বলতে গেলে পরিণত মনষ্কতা। তখন যা করেছি, তার থেকে এখনকার কাজগুলোকে একেবারে অন্যভাবে দেখি। কারণ, বয়স পরিণত হলে কাজকর্মও পরিণত হয়ে ওঠে। ‘‌মাধব মালঞ্চি কইন্যা’‌–র পরবর্তীকালে অনেক লড়াই করেছি। অনেকটা পথ হেঁটেছি। কেরিয়ারের প্রথম দিকের কাজেই যেহেতু জনপ্রিয়তা এবং পরিচিতি পেয়েছি তাই জার্নিটা একটু অন্যরকম ছিল। লড়াইটাও। তাছাড়া  থিয়েটার এতটাই জনগণের থেকে দূরে এবং প্রায় প্রান্তিক শিল্প, যে এটা নিয়ে মানুষ খবরাখবর কম পাবেন, আলোচনা কম হবে তাতে আর বিষ্ময়ের কী!‌ 
 তাহলে ‘‌মাধব মালঞ্চি কইন্যা’‌ এতটা সার্বিক হল কীভাবে?‌
সুরঞ্জনা: কারণ, নাটকটা চলতি ধারার বিপরীত। ফলে নাটকটার একটা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হযেছিল। যেমন একমাত্র ‘‌বাবা তারকনাথ’‌ দিয়ে সন্ধ্যা রায়ের পরিচিতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল, সেরকমই ঘটেছিল আমার ক্ষেত্রেও। ‌আট থেকে আশি— সকলের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল ওই নাটক। খুব কম সৃষ্টিই এতটা গ্রহণযোগ্যতা পায়। প্রান্তিক শিল্প হয়েও এটা কম কথা নয়। 
 থিয়েটারে তো এখন অনুদানের প্রচুর টাকা আসছে। তবু থিয়েটার কেন মুষ্টিমেয়র সম্পত্তি হয়েই থেকে যাচ্ছে?‌
সুরঞ্জনা: অনুদান বা গ্রান্ট যখন ছিল না তখন গয়না বেচে থিয়েটার করার কথাটাকে আমরা গৌরবান্বিত করতে পারতাম।  কেয়া চক্রবর্তী গয়না বিক্রি করে নান্দীকারকে দাঁড় করাচ্ছেন— এই গল্পটা আমাদের অস্ত্র ছিল। কিন্তু এখন যে গ্রান্ট দেওয়া হচ্ছে সেটা যেন রুগ্ন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অর্থসাহায্যের মতো। এমন নয় যে, গ্রান্টের টাকায় দারুণ কিছু শিল্প সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু গ্রান্ট চালু হওয়ার ফলে দলের সংখ্যা বেড়েছে। প্রত্যেকেই ভাবছে আজ একটা দলে আছি, কাল অন্য একটা দল গড়ব। তারপর গ্রান্টের আবেদন করব। এভাবে তো শিল্প হতে পারে না। ফলে প্রযোজনা বা দলের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু গুণগত মানের বৃদ্ধি কতটা হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আসলে কেন, কোথায়, কীভাবে, কোন উদ্দেশ্যে থিয়েটার করব— এই প্রশ্নগুলোর জবাব যদি নিজের কাছে পরিষ্কার না থাকে তাহলে এরকমই হবে। তবে ‘‌মাধব মালঞ্চি কইন্যা’‌ দিয়ে আমি যে ব্যপ্তিতে পৌঁছেছিলাম, সেটা আজ অনেকটাই সঙ্কীর্ণ। কিন্তু যে আদর্শ নিয়ে থিয়েটার শুরু করেছিলাম সে পথে এখনও দৃঢ়ভাবে আছি। তাই আমার কাছে গ্রান্টের টাকা না থাকলেও আমি কোনও জমায়েতে দাঁড়িয়ে একটা নাটক তৈরি করে দিতে পারি। 
 তাহলে কি বাংলা থিয়েটার পেশাদার হয়ে উঠতে পারেনি?‌
সুরঞ্জনা: বাংলা থিয়েটারে আকাশ থেকে পেশাদার করার চেষ্টা হয়। পরিকাঠামো ছাড়াই এই পেশাদার করার চেষ্টা থেকে ভুলভ্রান্তিগুলো আরও বেশি করে উঠে আসে। আমরা একজন ছেলে বা মেয়েকে শো–পিছু পাঁচশো টাকা দিয়েই ভাবি অনেক টাকা দিয়ে দেওয়া হল। কিন্তু সে যখন মুম্বইতে গিয়ে থিয়েটার করে তখন হয়তো পঞ্চাশ হাজার টাকা পায়।  তাহলে কেন সে পাঁচশো টাকার থিয়েটারে থাকবে?‌ আমাদের বাংলা থিয়েটারে পেশাদারিত্বের কোনও পরিকাঠামোই নেই। 
 আপনিও কি বাংলা থিয়েটারে পুরুষতান্ত্রিকতার শিকার?‌
সুরঞ্জনা: আমি ব্যাপারটাকে পুরুষতন্ত্র হিসেবে দেখি না। আমার কাছে ওটা ক্ষমতাতন্ত্র বা শক্তিতন্ত্র। একজন নারীর হাতে যদি ক্ষমতা চলে যায়, তাহলে তিনিও পুরুষতন্ত্রের উপাদানগুলোর মধ্যে চলে যান। এটা তো সত্যি, যে এখানে এখনও ‘‌নারীর মঞ্চ’‌ নামে একটা আলাদা মঞ্চ করতে হয়। কলকাতায় এখন ৩০ থেকে ৪০ জন মহিলা নির্দেশক। তবু কোনও থিয়েটার উৎসবে একদম ছোট্ট হরফে একজন হয়তো মহিলা নির্দেশকের নাম প্রযোজনার নিচে লেখা থাকে। সমাজে মেয়েদের সৃষ্টিশীলতার ইতিহাস আজও লেখা হয়নি। আসলে একজন সৃষ্টিশীল নারীও চান যে পুরুষতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই তাঁর সৃষ্টিশীলতার মূল্যায়ন হোক!‌ কারণ পুরুষতান্ত্রিকতা সমাজের অস্থিমজ্জায় ঢুকে রয়েছে। 
 তাহলে এখানে মহিলারা কতটা সুরক্ষিত?‌
সুরঞ্জনা: মহিলাঘটিত অবাঞ্ছিত কাজ তো পুরুষতন্ত্রে হবেই। কিন্তু সেইসব কাজে মহিলাদেরও যদি সমর্থন থাকে, তাহলে আবার সেটা মহিলা ক্ষমতাতন্ত্রকেই প্রশ্রয় দেয়। কোনও মহিলাঘটিত কেলেঙ্কারিতে কোনও নারী যদি প্রতিবাদ করেন, ক’‌জন মহিলা গিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াবেন সেটাই বড় প্রশ্ন। তবে আশার কথা, আমাদের থিয়েটারকে এখনও ভোগবাদ গ্রাস করতে পারেনি। তাই থিয়েটারে এখনও মেয়েদের পণ্য করা যায়নি। পুরুষতন্ত্রকে তুড়ি মেরে এবং তাকে হাস্যকর প্রামাণ করেই মেয়েদের নিজেদের লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। 
 মাত্র দু’‌তিনটি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। কেন?‌ পছন্দ নয়?‌ নাকি সুযোগের অভাব?‌
সুরঞ্জনা: আমাকে সিনেমা আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরেনি। বেশ কয়েকবার ভাল অফার এলেও কেন জানি না শেষ পর্যন্ত করা হয়ে ওঠেনি। তবে হয়নি বলেই থিয়েটার আঁকড়ে আছি এমনটা নয়। আমি থিয়েটারকে ভালবাসি। তাই আঁকড়ে আছি। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে এখন গোটা বিষয়টা এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে যেভাবে এতকাল থিয়েটার করেছি সেভাবে করব কিনা সেটা নিয়েও ভাবছি। হয়তো থিয়েটারের পথটাই বদলে ফেলব। 
 এত দশকের কেরিয়ারের পরও আপনার পরিচিতিতে এখনও ‘‌মাধব মালঞ্চি কইন্যা’‌। সেটা ভাল লাগে?‌ নাকি কষ্ট দেয়?‌ 
সুরঞ্জনা: কষ্টই দেয়। যে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষকে যদি একটা কাজ ধরেই বারেবারে পরিচিত করা হয়, তার খারাপই লাগবে। মাঝেমাঝে গালাগালি দেওয়ার মতো শুনতে লাগে। ইদানিং কিছু মানুষ ‘‌মিসেস উদ্‌গারিকা’‌ দেখে বলছেন ‘‌মাধব মালঞ্চি ‌কইন্যা’‌কেও ছাপিয়ে গেছে। এই বয়সে এসে আর কী–ই বা চাইবার থাকতে পারে।

জনপ্রিয়

Back To Top