সমীরকুমার ঘোষ: ‌আকাশবাণীতে এক সময় দুপুরে নিয়মিত আড্ডা বসত। কর্তা নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার থেকে প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, নলিনীকান্ত সরকার, যোগেশ বসু, রাইচাঁদ বড়াল, রাজেন সেন, বাণীকুমার, বীরেন ভদ্র অনেকেই থাকতেন। তেমনই এক আড্ডায় বুড়োদা মানে প্রেমাঙ্কুর প্রস্তাব দেন— ‘‌রোজ রোজ গান, বাজনা, বক্তৃতা, থিয়েটার, গল্পদাদুর আসর, মহিলা মজলিস্‌ এসব তো চলছে— কিন্তু আরও ধাক্কা দিতে হবে শ্রোতাদের!’‌‌‌ কেমন সে ধাক্কা— নৃপেনবাবুর প্রশ্নে বড় বড় গাইয়ে–‌বাজিয়ে দিয়ে জলসা আয়োজনের পাশাপাশি কোনোদিন ভোর চারটে থেকে প্রোগ্রামের প্রস্তাবও দেন প্রেমাঙ্কুর। সবার মনে ধরে। তা নিয়ে আলোচনার ফাঁকেই প্রেমাঙ্কুর বলেন, ‘‌এই তো বাণী রয়েছে— সংস্কৃতের আদ্যশ্রাদ্ধ করেছে— ওই কতকগুলো বৈদিক শ্লোক যোগাড় ক‌রে ফেলুক, আর গান লিখুক, রাই সুর দিক, বীরেন শ্লোক আওড়াক— ভোরবেলায় লাগিয়ে দাও, লোকের লাগবে ভাল।’‌ লোকের ভাল–‌লাগা নিয়ে কেউ কেউ যখন সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তখন বীরেন্দ্রই প্রস্তাব দেন, ‘‌পুজো আসছে আর মাসখানেক বাদে, প্রতি পুজোর সময় আমি এক জায়গায় ঠাকুরের সামনে বসে ব‌সে চণ্ডীপাঠ করি— খানিকটা সড়গড় আছে। শ্রীশ্রীচণ্ডীর কাহিনী নিয়ে যদি বেশ গান-‌টান, শ্লোক লাগিয়ে একটা প্রোগ্রাম করা যায় তাহলে প্রোগ্রাম লোকে পছন্দ করুক না করুক— দু–‌চারজন যারা ঘুম থেকে ভোরবেলায় উঠে আমাদের প্রোগ্রাম শুনবে তখন তাদের তা ভাল লাগতে পারে হয়তো।’‌ শুধু ভাল লাগা নয়, সেই অনুষ্ঠানই যে বাঙালির কাছে তৃতীয় মহাকাব্য হয়ে উঠবে কে জানত!‌
এই শুরু মহালয়ার সলতে পাকানোর পর্বর। প্রস্তাব পাশ হয়ে গেল। হপ্তাখানেকের মধ্যে বাণীকুমার গান লিখে ফেললেন ও পণ্ডিত হরিশচন্দ্র বালী, রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক সেগুলিতে সুর সংযোগ করতে লাগলেন। পঙ্কজ সুর তুলে সুরারোপ করে তখনকার শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের কণ্ঠে গান তোলাতে লাগলেন। রাইচাঁদও বিরাট অর্কেস্ট্রা পরিচালনার জন্য প্রস্তুত হলেন। সারেঙ্গি ধরলেন মুন্সী, চেলো বাজালেন তাঁর ভাই আলী, হারমোনিয়ামে খুশী মহম্মদ, দ্বিতীয় বেহালায় তারকনাথ দে, ম্যান্ডোলিনে সুরেন পাল, গিটারে সুজিত নাথ, এস্রাজে দক্ষিণামোহন ঠাকুর, পিয়ানোয় রাইচাঁদ প্রমুখ তখনকার দিকপাল শিল্পীরা। পরে গৌর গোস্বামী, হিমাংশু বিশ্বাস, শৈলেন দাস, অনিল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ যোগ দেন ও পঙ্কজের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। প্রধান গায়ক পঙ্কজ, বিমলভূষণ, কৃষ্ণ ঘোষ, আভাবতী, মানিকমালা, প্রফুল্লবালা, বীণাপাণি, প্রভাবতী প্রমুখ তখনকার তাবড় গায়ক–‌গায়িকারা। পরে যোগ দেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্র, শৈল দেবী, রাধারাণী, শ্যামল মিত্র, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রভা সরকার, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়রা।

সঙ্গীত পরিচালনায় পঙ্কজের সহকারী ছিলেন তাঁর বিশেষ স্নেহভাজন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। যাঁকে সবাই বলত ‘‌ছোট পঙ্কজ’‌। বিভিন্ন সঙ্গতে সাহায্য করতেন মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণের লেখা থেকে জানতে পারি, পঙ্কজ দু বছর এই অনুষ্ঠান পরিচালনা না করায় হেমন্ত একবার পরিচালনাও করেছিলেন। আরেকবার বিজন ঘোষদস্তিদার ও শচীন দাস মতিলাল।
শুরুর দিকের অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ বদলেছে বারবার। নামও। বিশেষ প্রভাতী অনুষ্ঠান ‘‌শারদীয়া বন্দনা’‌র শুরু ১৯৩০–‌এর ১৫ জুন, ষষ্ঠীর ভোরে। তাকে পরিমার্জিত করে সরিয়ে আনা হয় মহালয়ার দিন, ৮ অক্টোবর ১৯৩৪। ‘‌মহিষাসুরমর্দিনী’‌ নামে প্রচার শুরু হয় ১৯৩৬–‌এ। যদিও দিনটা ছিল ষষ্ঠী। পরে সরে আসে মহালয়ার দিন। 
মহালয়া যখন সরাসরি সম্প্রচার হত, পরিভাষায় ‘‌লাইভ’‌, তখন প্রতিবছরই লেখা একটু–‌আধটু বদলাত, বদলাত গান এবং শিল্পীও। কারণ শ্রোতাদের একঘেয়েমির অভিযোগ। মহালয়ার দুই অতি–‌জনপ্রিয় গান ‘‌মাতল রে ভুবন’‌ এবং ‘‌জাগো দুর্গা’। গেয়েছেন একাধিক শিল্পী। ‘‌জাগো দুর্গা’‌ এক দশকেরও বেশি গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় উনি বোম্বেতে চলে যান। ওঁর শূন্যস্থানে নেওয়া হয় শচীন গুপ্তকে। তখন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় দুটো ডুয়েট আর কোরাসে অংশ নিয়ে মহালয়া–‌টিমে ঢুকেছেন। শচীন অসুস্থ হয়ে পড়ায় সুশীল গুপ্ত ও সত্য চৌধুরিকে পিছনে ফেলে সুযোগ পেয়ে যান দ্বিজেন। একবার তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও গেয়েছিলেন। সম্ভবত দ্বিজেনের কণ্ঠ হেমন্ত–‌অনুসারী বলেই পঙ্কজ মল্লিকের পছন্দ হয়েছিল। হেমন্ত নিজেও অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‌তুই তো ফাটিয়ে দিয়েছিস।’
৪৬–‌এর ভয়াবহ দাঙ্গার সময় সরাসরি সম্প্রচারের বদলে  স্টুডিও রেকর্ডে গৃহীত অনুষ্ঠান বাজানো হয়েছিল। প্রযুক্তিগত কারণেই সেটি সংরক্ষণ করা যায়নি। ১৯৬৩ সালে প্রথম অনুষ্ঠান রেকর্ড করা হয়। তারপরও আরও বেশ কয়েকবার। ১৯৭৫ সালে তৎকালীন মিউজিক প্রযোজক অসীমা মুখোপাধ্যায় সবকটি রেকর্ড থেকে বেছে একটিকে চূড়ান্ত করেন। যা এখন বাজে, যার রেকর্ড বাজারে মেলে। গত বছর অবশ্য অন্য একটি রেকর্ড বাজানো হয়েছিল।  রেকর্ড হওয়ার অনেক আগে থেকেই মহালয়া–‌দলে হেমন্ত ছিলেন না। তাই রেডিওয় যে মহালয়া আমরা শুনে থাকি, তাতে স্বাভাবিকভাবেই নেই ‘‌ছোট পঙ্কজ’‌ তথা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ‘‌দেবী দুর্গতিহারিণীম’‌–‌এ যখন ওঁকে সঙ্গীত পরিচালনার জন্য বলা হয়, সেটি ছিল ওঁর কাছে আর পাঁচটা সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনার মতো একটি ‘‌অ্যাসাইনমেন্ট’‌। ওঁদের গুরু–‌শিষ্যের সম্পর্ক কখনই মলিন হয়নি। 

জনপ্রিয়

Back To Top