সম্রাট মুখোপাধ্যায়: • ছোট ছবি। নাটক/‌পরিচালনা:‌ সোহাগ সেন। প্রযোজনা:‌ অনসম্বল।
ভাঙা। তারপর গড়া।
ছোট থেকে বড়র দিকে ‘‌জার্নি’‌।
সঙ্গে সিনেমার পর্দা আর পর্দার ভেতরে–‌বাইরে নাটক আর মঞ্চের ওপর চলা অন–‌ক্যামেরা–‌অফ–‌ক্যামেরা শুটিং পর্ব। মিলেমিশে তৈরি করছে একটা নাটক। নতুন রকম ফর্ম আর ভাবনার কাটাছেঁড়া। এটাই সোহাগ সেন তথা ‘‌অনসম্বল’‌–‌এর নতুন নাটক ‘‌ছোট ছবি’‌র সারাৎসার।
‘‌উত্তরাধিকার’‌ মতো নব্য ক্লাসিকের যুগ ছেড়ে উত্তর–‌আধুনিক ছোট ছোট টুকরো আখ্যান বলায় গত এক দশক ধরে ঢুকে পড়েছেন সোহাগ সেন। তাঁর নাটকে এখন অভিনয়ের ভেতর অভিনয় বা ‘‌অ্যাক্টিং উইদিন অ্যাক্টিং’‌–‌এর খেলা বার বার ঢুকে পড়ে। সঙ্গে থাকে ‘‌বক্স টেল’‌–‌এর আঙ্গিক। এক নাটকে একঝাঁক গল্প। ‘‌লাল স্যুটকেস’‌–‌এ ছিল। এ নাটকে আবার তা ফিরে এল। সেবার কেন্দ্রে ছিল একটি লাল রঙের স্যুটকেস, যা যে সব চরিত্রের কাছে যাচ্ছে, একটা করে গল্প তৈরি হচ্ছে। আর এবার কেন্দ্রে একটি শুটিং, যার ভেতর আর বাইরে ক্রমাগত গল্প তৈরি হয়ে চলেছে।
আপাতভাবে গুনলে হয়তো চারটি বা পাঁচটি গল্প। কিন্তু ভালভাবে দেখলে বোঝা যাবে এরা আবার ভেঙে পড়ছে অসংখ্য ছোট ছোট কণিকার মতো গল্পে। এই বিকেন্দ্রীকরণের ভাবনাটাই নাটকের পরিকল্পক সোহাগ সেনের সবচেয়ে বড় জোর। বোঝা যায় ‘‌অ্যাক্টিং ওয়ার্কশপ’‌ই এই নাটকের প্রাণটুকুকে আবিষ্কার করেছে। সহজভাবে গভীর কথা বলা বরাবরই পরিচালক সোহাগ সেনের নিজস্বতা। তা তিনি এই নাটকেও এতাবধি ধরে রেখেছেন।
নাটক শুরু হয় ‌হালকা ‘‌ফার্স’‌–‌এর চালে, একটি ‘‌মেলোড্রামাটিক’‌ সিকোয়েন্সের শুটিং দিয়ে। যা তীব্রতর হয় একটি বৈপরীত্যের ব্যঞ্জনায়, যা হয়তো মঞ্চে আপাতভাবে হাস্যকর, কিন্তু তলিয়ে দেখলে অভিনয় বিজ্ঞানের এক নৈব্যক্তিকতাকে তুলে ধরে। খানিকটা ‘‌ওয়ার্কশপ’‌ ভঙ্গিতেই। এবং সংলাপ ছাড়াই প্রায়। যেখানে চলে আসে ‘‌অ্যাক্টিং উইদিন অ্যাক্টিং’‌। অভিনয়ের ভেতরে অভিনয়। এক সন্তান পরিত্যক্ত দুঃখী মায়ে‌র শোকাবহ দৃশ্যের শুটিং চলছে। মা–‌কে দেখে প্রবল দুঃখ পাবেন দর্শক। আর তারপরই যখন ফ্লোরের শুটিং লাইট নিভবে দর্শকের চমক লাগবে এটা দেখে যে এই চরিত্রের অভিনেত্রী তুমুল ভোগবাদী, কুটিল, উচ্ছৃঙ্খল আর লোভী। বাস্তব আর সিনেমা বাস্তবের এই ফারাক যেন ‘‌ব্রেখট্‌’‌–‌এর সেই সচেতন বাণীরই প্রতিধ্বনি। বাস্তব আর নাটকের বাস্তব আলাদা। তাই আবেগে না ভেসে সচেতন মন নিয়ে শিল্পকর্মকে আস্বাদন করুন। এমন একটা গভীর আর মূলগত কথাকে সহজ উদাহরণে নাটকের ভেতর দিয়েই আনার জন্য সোহাগ সেন ধন্যবাদ পাবেন। নিঃসন্দেহে তাঁর পরিচালক জীবনে এ এক উল্লেখযোগ্য কাজ।
অন্য তিনটে গল্পেও, মানে ছোট ছবির চিত্রনাট্যেও এই দ্বন্দ্বটা আছে। কোথাও দুই অভিনেতা–‌অভিনেত্রীর জীবনের অতীত গল্প আর বর্তমানে পর্দার গল্প হুবহু এক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পর্দার ‘‌ক্লাইম্যাক্স’‌–‌এর মতো ঘটছে না বাস্তবের শেষটা। কোথাও চিত্রনাট্যের বিষণ্ণ কাহিনি প্রযোজকের ইচ্ছায় বদলে দিতে হচ্ছে। এরকম সব ব্যাপার চলতে থাকে। নাট্যকার সোহাগ সেনের কাছে একটাই অনুযোগ, কোথাও কোথাও ‘‌টেক্সট’‌ বা সংলাপ যেন বড্ড আরোপিতভাবে ‘‌কনসেপচুয়াল’‌ আর সরলীকৃত লেগেছে। সোহাগ সেন অবশ্য পরিচিতিপত্রে নিজের নাম নাট্যকার হিসাবে নয়, বরং ‘‌কনসেপ্ট’‌কার হিসাবেই দিয়েছেন।
সোহাগ সেনের তত্ত্বাবধানে অভিনয়ে টিম ওয়ার্কের জয়জয়কার হবে এটা প্রত্যাশিতই। তবে বাবার চরিত্রে মতিলাল সেনের অভিনয়ে কিছু সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি ভোলার মতো নয়। আর চপল অভিনেত্রীর চরিত্রে সোমা মুখোপাধ্যায়ও অভিনয়ের চাহিদা অনুযায়ী বহুমাত্রিক। প্রযোজকের চরিত্রে সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কেও মঞ্চে দাপুটে লেগেছে। একটি দৃশ্যে চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে শীতল গলায় বলা তার একটি সংলাপ বহুদিন মনে থাকবে।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top