অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়:  • রাজনৈতিক সভায়, ভোটের মিটিংয়ে সবাই তো রণং দেহি। এ ওকে দেখে নিচ্ছে!‌ হ্যান করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা আওয়াজ উঠছে। আর, পর্দায় রাশি রাশি ভিলেনকে শায়েস্তা-‌করা সুপারস্টার দেবকে ঘাটালের মিটিংয়ে দেখছি, অত্যন্ত বিনয়ী। প্রকৃতি ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা দিচ্ছে, আর মিটিংয়ে তার দ্বিগুন তাপ বাড়াচ্ছেন নেতারা। এই উত্তপ্ত পরিবেশের মাঝখানে এই বিনয়টা দেব কোথা থেকে পেলেন?‌
•• এই কারণেই হয়ত দিদি আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। কিছু একটা তো উনি আমার মধ্যে দেখেইছিলেন। সেটা আমার ব্যাবহার হতে পারে, আমার বিনয় হতে পারে। এটা তো আমার মধ্যে ছিল আমার মা, বাবার আশীর্বাদে। তাছাড়া, আমিও তো একজন ভোটার। আমি তো এমন পার্টিকে ভোটটা দেব না যে সারাদিন মাইক নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করছে, গালমন্দ করছে। আমি কী চাই?‌ আমি সিনেমা জগতের লোক। আমি চাইব যে দলই আসুক না কেন, সিনেমা হলগুলো যেন ভাল হয়, সিনেমা দেখার পরিবেশ যেন ভাল হয়। সিনেমা তৈরির কাজ যেন সু্ষ্ঠুভাবে হয়। টেকনিশিয়ানদের নিয়ে যেন সেই দল ভাবে। আমার পাড়ার রাস্তা-‌ঘাটগুলো ভাল আছে কী না, ভাল হচ্ছে কী না, এটা আমি চাইব। আমার বাবা একটা রেস্টুরেন্ট চালান। আপনি তো জানেন আমাদের একটা রেস্টুরেন্ট আছে। আমার বাবা চাইবেন, রেস্টুরেন্টটা যেন ঠিকভাবে চলে। মানুষ তো পরিবার নিয়ে বাঁচে। পরিবার নিয়েই আমরা ভোটটা দিই। আমাদের যেগুলো রোজকার, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার জন্য দরকার, আমরা চাই সেগুলো নিয়ে যেন একটা দল ভাবে, চেষ্টা করে। প্রত্যেকটা দলের রিপোর্ট কার্ড-‌ই প্রত্যেকটা মানুষের কাছে আছে। এখন একজন ভোটার হিসেবে দেখতে চাই আপনি কী কাজ করেছেন এবং আপনি কী কাজ করবেন। খুব সিম্পল। এর জন্য বিরাট গালমন্দ করার, চিৎকার চেঁচামেচি করার তো দরকার নেই। তার জন্যে একঘন্টা কেউ এই কাঠ-‌ফাটা গরমে বসে থাকবে না। আমি এই ফিলোজফিতে বিশ্বাস করি। তাই ভোট পাওয়ার জন্যে গালমন্দ করে মানুষকে উত্যক্ত করতে আমি পারব না। এটা আমার সিস্টেমেই নেই।
• তাহলে, পর্দায় যে দেবকে মানুষ দেখেন, মিটিংয়ে একদম উল্টো দেব। পর্দায় আট-‌দশটা ভিলেনকে পিটিয়ে শায়েস্তা করা নায়ককে তো দেখছি শুধু বিনয়ের ভঙ্গীতে। মঞ্চে উঠে আপনি বলছেন, এই গরমে আপনারা অপেক্ষা করছেন আমার জন্যে। আমি ক্ষমা চাইছি। তারপর বলছেন, আমি ভোট চাইতে আসিনি। কিন্তু ভোট চাইতেই তো আপনি এসেছেন।
•• এটা আপনি যেমন বুঝছেন, মিটিংয়ে আসা মানুষও সেটাই বুঝছেন। তাহলে, আমি ‘‌ভোট চাই’‌, ‘‌ভোট চাই’‌ বলে চিৎকার করব কেন?‌ হ্যঁা, পর্দায় চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে আমাকে ভিলেনদের শায়েস্তা করতে হয়। এটাও মানুষ জানেন। কিন্তু জনসভায় আমি তাদেরই একজন, যে কী না একটা সুযোগ পেয়েছে লোকসভায় গিয়ে তাদের কথা বলার। এবং আমি সেটা তো করছি। পাশাপাশি আমার এলাকার, ঘাটালের মানুষদের জন্যে সাধ্যমতো কাজ করার চেষ্টা করছি। সেই কাজগুলো কিন্তু মানুষ দেখতে পাচ্ছেন। আমি জোরে চিৎকার করলে সেগুলো বাড়বেও না। কমবেও না। এখন কেউ যদি গালমন্দ করে সত্যিটাকে নস্যাৎ করতে চায়, এটা তার দোষ, তার দুর্বলতা বা তার স্বভাব। আমি সেই খেলাটায় ঢুকিনি, ঢুকবও না।
• তাহলে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে দেবের কোনও আক্রমণ নেই?‌ রাজনৈতিক দেবের কোনও শত্রু নেই?‌
•• একটা কথা বলি। এই যে এখন আই পি এল হচ্ছে। একটা দলে ধোনি, আমরা অনেকে তাকে সাপোর্ট করছি। আবার বিরাটের দলকেও সাপোর্ট করছে অনেকে। অন্যদিকে কে কে আর-‌এর সঙ্গে খেলায় ধোনি বা বিরাট, কাউকেই হয়ত সাপোর্ট করছি না। কিন্তু, ধোনি, বিরাট যখন দেশের হয়ে খেলছে, তখন দুজনকেই আমরা ভালবাসছি, সাপোর্ট করছি। কারণ, তখন আমাদের দেশ খেলছে। কিন্তু রাজনীতির নামে এখন এমন বিষ ছড়ানো হচ্ছে, এমন বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, এমন গাল-‌মন্দ করা হচ্ছে যেটাকে আমি সমর্থন করতে পারি না। বিরোধীদের গালাগাল করব কেন?‌ এন্ড অফ দ্য ডে, আমরা তো সবাই ‘‌টিম ইন্ডিয়া’‌য় খেলব। সাংসদ হয়ে আমরা তে দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করি। এর জন্যে আমি মনে করি নিজেকে আগে ভদ্র হতে হবে, বিনয়ী হতে হবে। আমি সেটাই চেষ্টা করি। আমি মনে করি, একজন পলিটিশিয়ানের ‘‌শুড হ্যাভ গুড ইয়ারস দ্যান আইজ’‌। কত মানুষ তাদের সমস্যার কথা, কষ্টের কথা বলতে আসেন। সেগুলো শোনার মতো কান থাকা চাই। মানে, হৃদয় থাকা চাই।
• তার মানে দেব হৃদয় দিয়ে রাজনীতিটা করতে চান?‌
•• অবশ্যই হৃদয় দিয়ে। আমি তো সিনেমার লোক। দিদি যখন পাঁচ বছর আগে আমাকে ঘাটালে প্রার্থী করলেন, তখন অনেকেই অমিতাভ বচ্চনের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে আমাকে ঘাবড়ে দিতে চেয়েছিল। বলেছিল, কেরিয়ারের ‘‌পিক’‌-‌এ থাকতে থাকতে রাজনীতি করলে দুটোই যাবে। আমি কিন্তু ভয় পাইনি। আমি যেমন ঘাটালের সুখে দুঃখে থেকেছি, বন্যায় কাজ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছি, তেমনি আমি প্রযোজক হিসেবে নতুন নতুন ঝুঁকি নিয়েছি। নিজে অন্য ধরনের ছবি করেছি। কেউ কি বলতে পারবে এই পাঁচ বছরে আমি সিনেমার ক্ষেত্রেও নতুন ঝুঁকি নিইনি?‌
• সেটা তো অবশ্যই নিয়েছেন। প্রযোজক হিসেবে নতুন ভাবনার ছবি করেছেন। কিন্তু রাজনীতিক হিসাবে যতটা সময় দেওয়া দরকার, ততটা কি দিতে পারেন?‌
•• দেখুন, রাজনীতি একটা ফুল-‌টাইম প্রফেশন। বা, ফুল-‌টাইম জব। প্রতিদিনের কাজ। সেটা সবসময় প্রত্যক্ষ ভাবে, উপস্থিত থেকে আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের দলের অন্য নেতা, কর্মীরা আছেন, যারা সারা বছর কাজ করছেন। আমি তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান অনুমোদন করিয়েছি। কিন্তু আমরা যে টাকা পাই, এলাকার উন্নয়নের পক্ষে সেটা যথেষ্ট নয়। কিন্তু আমার চেষ্টায় আমি ফাঁক রাখিনি।
• তাহলে আপনি প্রমাণ করলেন রাজনীতি করলেও ফিল্ম কেরিয়ারের কোনও ক্ষতি হয় না?‌
•• সেটা তো প্রমাণ করতে পেরেছি। বলুন?‌ মিমি, নুসরত তো মিডিয়ায় বলেছে, আমি তাদের ইন্সপায়ার করেছি। এটাও আমার প্রাপ্তি।
• বিভিন্ন জনসভায় গিয়ে বা চায়ের দোকানে শুনলাম, সবাই বলছেন দেব কিন্তু ‘‌ভদ্র’‌ রাজনীতি করছেন।
•• এটাই তো স্বাভাবিক। ভদ্রতাটাই স্বাভাবিক, এটা হয় তো অনেকে ভুলে যাচ্ছেন। অভদ্রতা তো কোনও ক্ষেত্রেই উচিত নয়। শুধু রাজনীতি কেন, জীবনের কোনও ক্ষেত্রেই উচিত নয়। স্বাভাবিক জিনিসটাই আজ বোধহয় অস্বাভাবিক হয় উঠছে। এবং আমি ঘাটালের অন্য তিন প্রধান বিরোধীদলের প্রার্থীকে সেই জন্য শুভেচ্ছা পাঠিয়েছি। ওয়ান-‌টু-‌ওয়ান মেসেজ করে নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফলে সবাই দেখেছেন আমি ঘাটালের সি পি আই, কংগ্রেস, বি জে পি প্রার্থীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছি। এখানে আমাকে অনেকেই বলছেন, সারা দেশে এরকম নজির নেই। আমার বক্তব্য, আমি কেন সৌজন্য দেখাব না?‌
• আপনার নতুন ছবি আসছে ‘‌কিডন্যাপ’‌।
•• হ্যঁা। কলকাতায় গিয়ে তো পোস্টার রিলিজ করে এলাম। দুটো দায়িত্বই কিন্তু আমি সমানতালে পালন করে যাচ্ছি।
• ‘‌‌কিডন্যাপ’ রিলিজ কবে?‌
•• পাঁচ জুন।
• তার আগেই তো ভোটের রেজাল্ট বের হয়ে যাচ্ছে।
• হ্যঁা, ২৩ মে।
• আর একটা নতুন ছবির কাজও তো চলছে?‌ ‘‌পাসওয়ার্ড’।
•• হ্যঁা, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের‌‌ ছবি।
• কতদূর কাজ হল?‌
•• অনেকটাই শুটিং হয়ে গেছে। পরমের (‌পরমব্রত)‌ ডেট পাওয়া গেলে ভোটের পরে বাকি শুটিংটা হয়ে যাবে।
• আর কোনও নতুন ছবি?‌
•• হ্যঁা, লীনা গঙ্গেপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘‌সাঁঝবাতি’‌। একদম অন্যরকম গল্প। স্ক্রিপ্টটা খুব ভাল লেগেছে আমার। অন্যরকম একটা চরিত্র। আমি কিন্তু এক্সপেরিমেন্ট করে যাচ্ছি। বলুন?‌
• সেটা তো নিশ্চয়ই।
•• আমি কিন্তু চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি কিন্তু সাংসদ হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি রিস্ক নিয়েছি প্রযোজক এবং অভিনেতা হিসেবে। সেটা তো আমি না-‌ও নিতে পারতাম। আমি তো ‘‌সেফ’ খেলতে পারতাম। আমার তো কেরিয়ার নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে ভয় পাবার কথা ছিল, ইন জেনারেল। সেটা কিন্তু আমার ক্ষেত্রে হয়নি। ঝুঁকি বলুন ঝঁুকি, সাহস বলুন সাহস, সেটা কিন্তু আমি নিয়েছি। আমার মনে হয়েছে, নতুন বিষয় নিয়ে বাংলায় ছবি হওয়া দরকার। একই ব্যোমকেশ বা একই ফেলুদা নিয়ে ছবি করে আমরা লোককে বোকা বানাচ্ছি। মুম্বইতে কিন্তু ‘‌উরি’র মতো ছবি হচ্ছে, ‘‌পদ্মাবত’‌-‌এর মতো ছবি হচ্ছে, ‘‌‌প্যাডম্যান’-‌এর মতো ছবি হচ্ছে। আমরা কেন একই ধরনের সাবজেক্ট-‌এ আটকে থাকব?‌ গত পাঁচ বছরে প্রযোজক হিসেবে যে ঝুঁকি আমি নিয়েছি, সেটা কি অন্য কেউ নিত?‌ আমি ‘‌সেফ’‌ খেলিনি। আমি অনেস্টলি কাজ করছি। আর অনেস্টি-‌টা লোকে দেখতে পায়, সেটা রাজনীতিতে যেমন, সিনেমার ক্ষেত্রেও তেমন।
• আচ্ছা দেব, এই যে একটা মিটিং থেকে আর একটা মিটিং, এমন গরম, সারা দিনে একটুও অবকাশ নেই, এখানে জিম-‌এর সুযোগও নেই, তাহলে আপনি ব্যায়ামটা করছেন কোথায়?‌
•• (‌মিলিটারি শার্টের কলারটা দু’‌হাতে ঝাঁকিয়ে, হাসতে হাসতে)‌ করছি না। মাথার মধ্যে এত ব্যায়াম চলছে যে অন্য ব্যায়াম করার কথা ভাবতেই পারছি না। জিম-‌টিম যা হবে, ভোটের পরে। সাইকোলজিক্যাল প্রেসার তো থাকেই। খুব সচেতন থাকতে হয়, যাতে একটা ভুল শব্দও না মুখ থেকে বেরিয়ে যায়।
• পাঁচ বছর আগে কত ভোটে জিতেছিলেন?‌
•• প্রায় দু’‌লাখ সত্তর হাজার ভোটে।
• এখানে কেউ বলছেন দেবের মার্জিন আরও বাড়বে, কেউ বলছেন কমবে। কিন্তু দেব যে জিতবেন, এটা নিয়ে কোথাও খুব একটা সংশয় দেখা যাচ্ছে না। শেষে, আপনাকেই একটা সরল প্রশ্ন করতে চাই, আপনি কি জিতবেন?‌
•• এটার উত্তর জনগন দেবেন, ঘাটালের মানুষ দেবেন। পাঁচ বছর আগে যখন দিদি আমাকে এখানে দাঁড় করান, তখন সবাই বলেছিল এখানে বামপন্থীরা ছাড়া কেউ জেতেনি। কিন্তু ঘাটালের মানুষ দু’‌হাত ভরে ভালবাসা দিয়েছিলেন আমাকে। তাই দু’‌লাখ সত্তর হাজার ভোটে জিতেছিলাম। পাঁচ বছর পরে আমি ঘাটালের মানুষের অনেক কাছাকাছি আছি। তাদের ভালবাসাতেই আমি বিশ্বাস এবং আস্থা রাখছি। তবে, আবার একটা কথা বলি, আমরা যারা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি, তাদের লক্ষ্য ভোটে জিতে ঘাটালের উন্নতি করা। কিন্তু আমার প্রশ্ন, আমি হারলে কি ঘাটালের ক্ষতি করার চেষ্টা করব?‌ যাদের জন্যে ভোট, যাদের জন্যে নির্বাচন, তাদের ভালর জন্যেই তো এত কিছু। ভোটের পর কিন্তু কাজ করবে ‘‌টিম-‌ইন্ডিয়া’। আমি এমন করেই ভাবি। ফলে, ভোট নয়, আমি ঘাটালের মানুষের ভালবাসাটাই চাই।

দেবের কথা শুনে মনে হল, সত্যিই এক ব্যতিক্রমী প্রার্থী তিনি। সব রাজনীতিকের ভাবনা যদি এমন‌‌‌‌ হত, আমাদের চারপাশটা আরও সুন্দর হয়ে উঠত, সন্দেহ নেই।‌

 

ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগঘাটালের গৌরায়। ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top