অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: • ‘‌হিরো’‌ দেবকে তো পেছনে ফেলে দিচ্ছে ‘‌প্রযোজক’‌ দেবের হিরো-‌গিরি। প্রযোজক হিসেবে নতুন নতুন বিষয় নিয়ে আসার চেষ্টা সকলেরই নজরে পড়ছে। বাংলা ছবিতে ‘‌পাসওয়ার্ড’‌ও তো নতুন বিষয়?‌
•• শুধু হিরো হয়ে থাকতে চাইলে, শুধু অ্যাকশন-‌কাট নিয়ে কাটিয়ে দিতে চাইলে আমি আর একটা ‘‌রংবাজ’‌, আর একটা ‘‌পাগলু’‌ করতাম। কোনও ঝঁুকি নিতাম না। প্রযোজক হিসেবে নতুন নতুন সাবজেক্ট ট্রাই করে যাচ্ছি। বাংলার কোনও হিরো কি সেই চেষ্টাটা করেছেন?‌ তাঁরা শুধু ‘‌কমফর্ট’‌ জোন-‌এ খেলে যাচ্ছেন। এটাকে প্রযোজক দেবের হিরোগিরি বললে খুব একটা মিথ্যে বলা হবে না। কিন্তু, এটা একশ ভাগ সত্যি, আমি যে বিষয় নিয়ে ছবি করার কথা ভেবেছি, অন্য প্রযোজকরা সেই ছবি করতে ভয় পেয়েছেন, পিছিয়ে গেছেন, তাই আমি নিজে প্রযোজক হয়ে সেই ছবি করেছি। আর, ‘‌পাসওয়ার্ড’‌ তো বাংলা ছবিতে একদম নতুন বিষয়, আধুনিক বিষয়।
• যে বিষয় নিয়ে ‘‌পাসওয়ার্ড’‌, যেটাকে আপনি বলছেন আধুনিক বিষয়, সেটা কি সাধারণ দর্শক পুরোপুরি বুঝবেন?‌
•• নিশ্চয়ই বুঝবেন। বিষয়টা আধুনিক, কিন্তু আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িত। শহরে, গ্রামে সর্বত্র এখন স্মার্ট ফোনের ছড়াছড়ি। সবাই স্মার্ট ফোন ব্যাবহার করছেন। ব্যাঙ্কে টাকার লেনদেন হচ্ছে স্মার্ট ফোনে। ছোটরা ট্যাব ব্যাবহার করছে। কিন্তু অন্য একটা দিকও আছে, যা নিয়ে সতর্ক না হলে বিপদ এড়ানো মুস্কিল। আশা করি, দর্শকরা খুব ভাল ভাবে বুঝবেন। এটা খুব জরুরি বিষয়। বাংলা ছবিতে এটা নিয়ে প্রথম কাজ করলাম আমরা। কমলেশ্বরদা দুর্দান্ত গল্প আর চিত্রনাট্য লিখেছেন। তবে, এটা ফ্যামিলি ড্রামা নয়, সাইবার থ্রিলার।
• কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তো বেশ কয়েকটা ছবি করলেন আপনি।
•• হ্যঁা, এটা কমলেশ্বরদার সঙ্গে আমার চার নম্বর ছবি। আমার কাছে উনি একজন ‘‌ম্যাড সায়েন্টিস্ট’‌। ওঁর দৃষ্টিভঙ্গীই আলাদা। সিংহের সঙ্গে যে একজন বাঙালি ছেলে লড়তে পারে, এটা উনি দেখিয়েছেন ‘‌চাঁদের পাহাড়’‌-‌এ। এবং আমাদের এই ছবি ব্লক-‌বাস্টার হয়েছে। ‘‌পাসওয়ার্ড’‌-‌ও বিষয়ভাবনায়, নাটকীয় প্রেজেন্টেশনে বাঙালি দর্শকদের দারুন লাগবে।
• নিজের প্রযোজনার ছবিতে দেব কি ‘‌হিরো’‌ নয়, ‘‌অভিনেতা’‌ হিসেবেই নিজেকে প্রমাণ করতে চান?‌
•• হিরোগিরি তো অনেক করেছি। এখনও করতে পারি। কিন্তু সেই ‘‌সেফ জোন’‌-‌টায় আমি খেলছি না। তবে, প্রযোজক দেব কেন, অন্য প্রযোজকের ছবিতেও আমি অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। অতনু রায়চৌধুরির প্রযোজনায় ‘‌সাঁঝবাতি’‌ করছি। সেখানে তো হিরোগিরির কোনও জায়গা নেই।
• ‘‌সাঁঝবাতি’‌ নিয়ে তো অভিযোগ উঠেছিল, এই ছবির সঙ্গে ‘‌গোত্র’‌-‌র কাহিনীগত মিল আছে?‌
•• দেখুন, ‘‌সাঁঝবাতি’‌র কথা আগে ঘোষণা হয়েছে। ‘‌গোত্র’‌-‌র ঘোষণা আমাদের পরে এবং ছবিটা রিলিজ করে গেছে। আমাদের ছবি রিলিজ করার পর দর্শকরা বুঝতে পারবেন আমরা কী তৈরি করেছি। তবে, আমি শুধু এইটুকুই বলব, হিংসা দিয়ে, ইগো দিয়ে, পারস্পরিক লড়াই করে ইন্ডাস্ট্রি এগোবে না।
• এবার পুজোয় তো লড়াই হচ্ছেই। চারটে বাংলা ছবি। তাহলে?‌
•• এটা তো কিছু করার নেই। দর্শকরা সব বাংলা ছবিই দেখুন, এটাই চাই। পুজোয় সবাই চান, দর্শকরা তাদের ছবি দেখুন, ব্যাবসা ভাল হোক।
• কিন্তু এর মাঝখানে তো এসে পড়ল পুজোতেই ঋত্বিক রোশন আর টাইগার শ্রফের ‘‌ওয়ার’‌।
•• এটা নিয়ে আমি ট্যুইটার করেছি। পুজোর সময় আমাদের এখানকার হল-‌এ বাংলা ছবিকে প্রাধান্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। আমার এই দাবি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গেছে। তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন। এবং এর ফলে অবস্থাটা পাল্টাল। পুজোয় আমাদের চারটে বাংলা ছবিই যথেষ্ট ভাল হল পাচ্ছে। এখানে আমার এই দাবি তোলাটা একটা ভূমিকা পালন করল বলে আমার খুব ভাল লাগছে।
• একটা বিষয় নিয়ে বরাবরই লেখা হচ্ছে, বলা হচ্ছে যে বাংলা ছবি বক্স অফিসে ভাল ফল করছে না। অধিকাংশ ছবিই সিনেমা হল থেকে প্রোডাকশনের খরচও তুলতে পারছে না। এটা কি সত্যি?‌
•• প্রচুর ছবি হলে সব ছবিই যে ব্যবসা করবে, এটা তো হতে পারে না। কিন্তু আমার ছবি ব্যবসা করছে বলেই তো আমি পরপর ছবি প্রযোজনা করতে পারছি।
• কিন্তু, এটা তো ঘটনা যে, দেব বা জিৎ-‌এর ছবি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচুর টাকায় বিক্রি হয় এবং লাভটা সেখান থেকেই উঠে আসে। সিনেমা হলে সেই সব ছবি যে লাভ করছে, এটা সব সময় তো সত্যি নয়।
•• এখন আমার ছবি যদি টেলিভিশন চ্যানেলে বেশি দামে বিক্রি হয়, সেটা তো আমার অপরাধ নয় (‌হাসতে হাসতে)‌। কিন্তু, সত্যি বলছি, আমার ছবিগুলো বক্স অফিসে ভাল রেজাল্ট করেছে, লাভ দিয়েছে, এটা ঘটনা। রানেদের (‌নিসপাল সিং)‌‌ ‘‌কিডন্যাপ’‌ও বক্স অফিসে হিট হয়েছে। কিন্তু, এটাও ঘটনা যে প্রচুর টাকার টিকিট কেটে মধ্যবিত্ত মানুষ পরিবার নিয়ে সবসময় সিনেমা হলে যেতে পারেন না। কিন্তু অন্যরকম বিষয় হলে, অন্যরকম ছবি হলে দর্শক হল ভরিয়ে দেন। দেখুন, ‘‌চাঁদের পাহাড়’‌ তো অন্যরকম বিষয়ের ছবি। ছবিটা সিনেমা হল-‌এ আসার আগে বাংলা ছবির দর্শক ভাবতেই পারেননি, বিভূতিভূষণের এমন একটা অসাধারণ উপন্যাস নিয়ে এমন একটা দুর্দান্ত ছবি হতে পারে। কমলেশ্বরদা বিস্মিত করেছেন সবাইকে। আমিও অভিনেতা হিসেবে চেষ্টা করেছিলাম সাধ্যমতো। এখন, এটা তো ঘটনা, আমি প্রযোজক হিসেবে ‘‌চ্যাম্প’‌ করেছি, ‘‌কবীর’‌, ‘‌ককপিট’‌-‌এর মতো ছবি করেছি। নতুন বিষয় নিয়ে ভেবেছি। নতুন বিষয় না আনলে বাংলা ছবি আরও মুখ থুবড়ে পড়বে।
• এই অবস্থায় শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নন্দিতা রায় কিন্তু একটার পর একটা বক্স-‌অফিস-‌সফল ছবি উপহার দিচ্ছেন।
•• অবশ্যই। ওরা নতুন বিষয় নিয়ে ভাবছেন। নিজেদের মতো করে ছবি করছেন। কিন্তু বাংলা ছবি তো এখন গোয়েন্দাতে আটকে গেছে। বড় গোয়েন্দা, ছোট গোয়েন্দা। বাংলা সহিত্যে কি বিষয়ের অভাব আছে?‌ ফর্মুলা আর গোয়েন্দায় আটকে থাকলে বাংলা ছবি এগোবে না। হিন্দি ছবিতে কত নতুন বিষয় নিয়ে কাজ হচ্ছে। আগে বাংলায় হিন্দি ছবি করতে আসতেন বিখ্যাত পরিচালকরা। বাংলা ছবি হিন্দিতে ডাব করা হত। একসময় সিনেমায় নেতৃত্ব দিত বাংলা। এখন আমরা হিন্দি ছবির তুলনায় অন্তত ২০ বছর পিছিয়ে আছি। শুধু সেফ জোন-‌এ খেলতে গিয়ে এই দুর্গতি হচ্ছে বাংলা ছবির।
• এবার একটা কথা জিজ্ঞেস করি। ‘‌পাসওয়ার্ড’‌-‌এর নায়িকা রুক্মিনী। আগের ছবি গুলোতেও তাই হয়েছে। তাহলে, দেব যা যা ছবি করবেন, সেখানেই কি নায়িকা হবেন দেবের বান্ধবী রুক্মিনী?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ আরে, সব নায়িকা তো আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তাহলে আমি ছবি করব কাকে নিয়ে?‌ (‌সিরিয়াস ভঙ্গীতে)‌ তবে, রুক্মিনীকে যেখানে অবধারিত মনে হয়েছে পরিচালকদের, সেখানেই ও নায়িকা হয়েছে। সেটা ওর অভিনয় দক্ষতার জন্যে। এখানে আমার কোনও ভূমিকা নেই। আর ‘‌পাসওয়ার্ড’‌-‌এ কিন্তু রুক্মিনী আমার নায়িকা নয়। ওর সম্পর্ক আদৃতের সঙ্গে। ফলে, (‌হাসতে হাসতে)‌ দুয়ে-‌দুয়ে চার হল না।
• আমাদের শুভেচ্ছা ‘‌পাসওয়ার্ড’‌-‌এর জন্যে।
•• অনেক ধন্যাবাদ। আর, দর্শকদের কাছে আবেদন, পুজোয় ঠাকুর দেখুন আর বাংলা ছবি দেখুন। তবেই তো জমজমাট হবে উৎসব।‌‌

ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top