অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: • গত রবিবার আপনাকে ফোন করে শুনলাম, শান্তিনিকেতনে আছেন। আজ তো আর একটা রবিবার। কদিন কি কলকাতাতেই আছেন?‌
•• না, না, খামোকা কলকাতায় আটকে থাকব কেন?‌ শান্তিনিকেতনে তো দ্বিতীয় ঘর। এটা তো চলতেই থাকে। কাল যাচ্ছি টাকিতে, বন্ধুদের সঙ্গে। আমার বন্ধুদের একটা গ্যাঙ আছে। আমরা প্রায়ই বেরিয়ে পড়ি, এখানে সেখানে। কাল ইছামতীর টানে যাচ্ছি।
• শাশ্বতীদির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ওঁরও বেড়ানোর একটা গ্যাঙ আছে বললেন। একটা শ্বশুরবাড়ির, আর একটা বন্ধুদের। শাশ্বতীদি বললেন, তিনদিন সময় পেলেও বেরিয়ে পড়ি। বললেন, কেয়ারও এমন বেড়ানো স্বভাব।
•• কিন্তু রানিরা তো শুধু বিদেশে বেড়াতে যায়। আমি তো বলি, আগে নিজের জায়গাটা জানতে হবে তো। আমার তো মনে হয়, ধানের ওপরের শিশির বিন্দুটি ‘‌দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’‌।
• কিন্তু শাশ্বতীদি বললেন, তাঁর বেড়ানো শান্তিনিকেতন হতে পারে, আলাস্কাও হতে পারে।
•• ওই তো, আলাস্কা। আলাস্কাই রানিকে টানে!‌
• আচ্ছা, এই যে কলকাতা দূরদর্শনের ৪৪ বছর হচ্ছে এই আগস্টে, আপনার আর শাশ্বতীদির আনুষ্ঠানিক বন্ধুত্বেরও ৪৪ বছর হচ্ছে, শাশ্বতী-‌ চৈতালির বা রানি-‌কেয়ার বন্ধুত্ব নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয়নি শাশ্বতীদিকে?‌
•• আমাদের মধ্যে কখনও কোনওদিনই কম্পিটিশন ছিল না। আমরা দুজনের প্রশংসাই করে গেছি। মজা করেছি। হাসি-‌ঠাট্টা করেছি। দুজনের জীবনের আনন্দ যেমন, সঙ্কটেও কাছাকাছি থেকেছি। আর, আমার মা বলতেন, আমার কোনও আকাঙ্খা নেই। (‌হাসতে হাসতে)‌ যার আকাঙ্খাই নেই, তার তো উচ্চাকাঙ্খাও নেই। ফলে, প্রতিযোগিতাও নেই।
• এটা তো একটা জীবন-‌দর্শনের কথা।
•• জীবন তো একটা দর্শনই। আসলে, রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন এমনভাবে ঘিরে ধরে আছেন, যে অন্যভাবে ভাবতে পারিনি। আমার দর্শন হল—সবার শেষে যা বাকি রয় তাহাই লব। ফলে, (‌হাসতে হাসতে)‌ আকাঙ্খা, উচ্চাকাঙ্খা কিছুই জন্মাতে পারেনি।
• শাশ্বতীদিকে আপনি তো শুরুতে দিদি বলতেন?‌
•• যখন প্রথম পরিচয় হয়েছিল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার চেয়ে দু’‌বছরের বড়। কিন্তু দূরদর্শনে ৭৫ থেকে যখন জুটি হয়ে গেলাম, তখন থেকে আমি ওকে ‘‌রানি’‌ বলি, রানিও আমাকে কেয়া বলেই ডাকে।
• আপনি তো সিরিয়ালে একসময় অনেক কাজ করেছেন। কিন্তু এখন আর দেখা যাচ্ছে না কেন?‌
•• প্রচুর অভিনয় করেছি একসময় ধারাবাহিকে। কিন্তু শুধু টাকা রোজগারের জন্যে জীবনের প্রাইম-‌টাইমটা আর টিভিকে দেব না, এই সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিয়েছি। হ্যাঁ, ধারাবাহিক করলে প্রচুর সময় দর্শকের চোখের সামনে থাকা যায়। কিন্তু, টিভি থেকে আমি আর রানি যা পেয়েছি, যে জনপ্রিয়তা, দর্শকদের যে ভালবাসা, সেটা তো বিরাট প্রাপ্তি। এতটা ভালবাসা পাব ভেবে, পরিকল্পনা করে তো কাজ শুরু করিনি। আর, ধারাবাহিক করতে করতে এটা বুঝতে পেরেছি, দর্শকদের নতুন করে কিছু আর আমার দেওয়ার নেই। ফলে, সেই সময়টা ঘরে থাকি, সংসারে থাকি, নয় তো বেরিয়ে পড়ি।
• কোন কোন ধারাবাহিকে কাজ করে ভাল লেগেছে?‌
•• ‘‌একদিন প্রতিদিন’‌। সম্প্রতি ‘‌গোয়েন্দা গিন্নি’‌তে খুব ইন্টারেস্টিং একটা ক্যারেক্টর করেছি। রাজ চক্রবর্তীর পরিচালনায় ‘‌নায়িকা’‌ বলে একটা ধারাবাহিক করেছিলাম, সেখানে আমিই প্রধান চরিত্র, হিরোর মা। এগুলো খুব ভাল লেগেছে। থোড়-‌বড়ি-‌খাড়া ধারাবাহিক আর ভাল লাগে না। তবে, হ্যঁা, সিনেমায় ভাল চরিত্র পেলে এখনও ইচ্ছে হয় অভিনয় করি। (‌গলায় হতাশার ভাব ফুটিয়ে)‌ কিন্তু কেউ ডাকে না!‌
• আপনার বাড়িতেই তো পরিচালক। আপনার ছেলে বিরসা আপনাকে ছবিতে নিতে চায় না?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ আরে, বিরসা তো কদিন আগেই একটা ইন্টারভিউতে বলেছে, বাড়িতে সবাই অভিনয় জানে বলেই কি আমার ছবিতে তাদের নিতে হবে?‌ রাজা (‌দাশগুপ্ত)‌ যখন ছবি করত, তখনও অনেকে বলত, রাজা কেন বউকে ছবিকে নিচ্ছে না। (‌হাসতে হাসতে)‌ সে যাই হোক। ভাল ছবিতে কেউ ডাকলে আমি এক কথায় রাজি।
• আচ্ছা, আপনি আর শাশ্বতীদি একটা অসাধারণ জুটি। মঞ্চে একসঙ্গে অনুষ্ঠান করতে ইচ্ছে করে না?‌
•• অনেকে ডাকে তো আমাদের একসঙ্গে। যাই-‌ও। কিন্তু নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে কিছু করার কথা ভাবিনি। এখন আর উদ্যোগ নিতে ইচ্ছে করে না। তার চেয়ে বেড়াতে যাওয়া ভাল।
• শাশ্বতীদি বলছিলেন, কেয়ার মাথায় তো গোলমাল আছে!‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ সত্যি বলছিল?‌ রানি তো বলবেই!‌ ওর নিজের মাথায় গোলমাল আছে বলেই রানি আমার গোলমালটাও ধরতে পেরেছে!‌ সেই জন্যে বন্ধুত্বটাও এত বছর পেরিয়ে-‌ও ম্লান হয়নি।
• শাশ্বতীদি বলছিলেন, দূরদর্শনের বহু দর্শক ভাবতেন, আমরা দুই বোন। পরের জন্মে বোধহয় আমরা দুই বোন হয়েই জন্মাব।
•• এই জন্মেই তো দুই বোন হয়ে গেছি। একই সঙ্গে বোন, একই সঙ্গে বন্ধু। আমাদের ভেতরে পরস্পরের শেকড় ছড়িয়ে আছে। এই শেকড় গভীর। অনেক গভীর।‌

চৈতালির বিয়ের আসরে শাশ্বতী

জনপ্রিয়

Back To Top