অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: এখনও তিনি বাংলার বেস্ট-‌সেলার লেখকদের প্রথম সারিতে। কিন্তু তিনি এখন নিজের হাতে লিখতে পারেন না। দক্ষিণ কলকাতায় তাঁর আটতলার ফ্ল্যাটে নিজের ঘরটা বইয়েই ভর্তি। কিন্তু তিনি পড়তে পারেন না। তাঁর দৃষ্টিশক্তি এখন অতি ক্ষীন। কিন্তু স্মৃতিশক্তি প্রবল। এবং চিরকালীন রসবোধ তাঁর সঙ্গী। তিনি বুদ্ধদেব গুহ। বহু মানুষের প্রিয় লালা-‌দা।
কিন্তু নিজেকে অচল করে ফেলায় বিশ্বাসী নন এই জীবন-‌রসিক লেখক। তাঁর কণ্ঠে পুরাতনী গান শুনেছেন অনেকেই, কখনও ঘরোয়া আড্ডায়, কখনও টিভিতে, কখনও মঞ্চেও। কিন্তু এবার তিনি পুরোদস্তুর গায়কের ভূমিকায়। আগামী ৩ সেপ্টেম্বর, শিশির মঞ্চে একক আসরে গায়ক বুদ্ধদেব গুহকে দেখবেন এবং শুনবেন বাংলার দর্শক-‌শ্রেতারা। জনপ্রিয় লেখকের বদলে আমরা গায়ক বুদ্ধদেব গুহর মুখোমুখি, তাঁর গান-‌ঘরে।
• গায়ক বুদ্ধদেব গুহকে আমরা নতুন করে অভিনন্দন জানাচ্ছি। অনেকদিন পরে আপনি গান গাইতে মঞ্চে আসছেন। এবং একক আসরে।
•• তোমাদের অভিনন্দনের জন্যে ধন্যবাদ। হ্যাঁ, মঞ্চে গাইব আট-‌দশ বছর পরে তো বটেই। হ্যঁা, একক আসরে গাইব। এটাও একটা নতুন ব্যাপার।
• কতক্ষণ গাইবেন?‌
•• দেড় ঘণ্টা তো বটেই।
• হঠাৎ এই একক আসরে গান গাওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিলেন?‌ এই বয়সে এতক্ষণ গান গাওয়া তো বেশ পরিশ্রমের ব্যাপার।
•• শোনো, আমি এখন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে সাড়ে চার বছরের বড়। আমার বাবার চেয়েও দু’‌বছরের বড় হয়ে গেছি। আমার বয়স ৮৪ বছর। ১৯৩৫-‌এর ২৯ জুন আমার জন্ম। কিন্তু গান গাওয়াটা আমার কোনও পরিশ্রম বলে মনে হয় না। কেন জানো?‌
• বলুন।
•• আমি তো চোখে দেখতে পাই না। আমার বাঁ চোখে একটুও দৃষ্টিশক্তি নেই। ডান চোখে টেন পার্সেন্ট ভিশন আছে। তুমি বসে আছো, এটা বুঝতে পারছি, কিন্তু তোমার মুখ, তোমার অবয়ব বুঝতে পারছি না। আমি এখন কিন্তু পড়তে পারি না। কেউ পড়ে শোনালে আমার পড়া হয়। আমি লিখতে পারি না। মুখে বলি, ডিকটেশন দিই, কেউ লিখে নেয়। এভাবেই এবার পুজোতেও কয়েকটা লেখা লিখেছি। তোমাদের পুজো সংখ্যার (‌আজকাল শারদীয়)‌ জন্যেও একটা গল্প লিখেছি এইভাবে। কিন্তু নিজে তো লিখতে পারি না। ছবি আঁকতে খুব ইচ্ছে করে, কিন্তু পারি না। কিছুই তো পারি না। শুধু গান গাইতে পারি নিজে নিজে। এখন গান ছাড়া আর কিছু নেই আমার জীবনে। আমার ক্রিয়েটিভিটি বলতে আমার গান। মাঝরাতে উঠেও আমি গান করি। তখন মনে হয়, সৃষ্টির এই ধারাটার মধ্যে আমি জীবন্ত আছি। ফলে, গান গাইতে আমার কোনও পরিশ্রম হয় না।
• এই অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত কীভাবে নিলেন?‌ অসুস্থ শিল্পী পূর্বা দামের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে, তাঁকে সাহায্য করার জন্যে তো এই অনুষ্ঠানের আয়োজন। সেটাই কি আপনার গান গাওয়ার কারণ?‌
•• হ্যাঁ, সেটাই আমার গান গাওয়ার কারণ। পূর্বা দাম একজন নামকরা শিল্পী। আমার স্ত্রী ঋতুর (‌প্রয়াত ঋতু গুহ)‌ সিনিয়র উনি। পূর্বার স্বামী অরুণ দাম কলেজে আমার সঙ্গে পড়ত। আমি একদিন গিয়েছিলাম ওদের বাড়ি। পূর্বা অ্যালজাইমারে আক্রান্ত। কাউকে চিনতেও পারছে না। আমি তখন ভাবলাম, শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে আর কতটুকু পাশে দাঁড়াতে পারব!‌ দেবব্রত বিশ্বাসের কয়েকজন ছাত্র টেগোর সোসাইটি ক্যালকাটার সঙ্গে যুক্ত। ওদের বললাম, একটা অনুষ্ঠান করে টাকা তোলার আয়োজন করতে। তখন ওরা বলল, আমি যদি গাই, তাহলে একটা অন্যরকম অনুষ্ঠান হবে। কিছু টাকাও তোলা যাবে। এই হল আমার এই অনুষ্ঠানের কার্যকারণ।
• দেড় ঘণ্টা গাইবেন। তার জন্যে কি রিহার্সাল করছেন?‌
•• না, না। আমি এইসব পুরাতনী গান কয়েক হাজার বার করে বিভিন্ন পার্টিতে, আড্ডায় গেয়েছি। তাছাড়া, এখন তো গানই আমার সঙ্গী। মাঝরাতে একা একা গাই। আমি তো যন্ত্রপাতি নিয়ে গাই না। খালিগলায় গান করি। তবে এই আসরে এসরাজে আমার সঙ্গে থাকবেন শিউলি বসু। শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত এসরাজ শিল্পী প্রয়াত অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে হল শিউলি।
• তবলা নিচ্ছেন?‌
•• না, না, তবলা নিলে গোলমাল হয়ে যাবে। অভ্যাস নেই তো তবলা নিয়ে গাওয়ার।
• শুধুই কি পুরাতনী গান গাইবেন?‌ রবীন্দ্রসঙ্গীত থাকবে না?‌
•• রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইব কয়েকটা। বর্ষার গান। তবে, মূলত পুরাতনীই গাইব। নিধুবাবুর গান। তাঁর টপ্পা। এগুলো গাইতে আমি বরাবরই ভালবাসি।
• রবীন্দ্রসঙ্গীত তো শিখেছেন ‘‌দক্ষিণী’‌তে?‌
•• হ্যাঁ, কিন্তু ওই কোর্সের থিয়োরি, রিট্‌ন টেস্ট এসব আমার পোষাত না। বাবা (‌প্রয়াত শচীন্দ্রনাথ গুহ)‌ চাপ দিচ্ছিলেন সি এ পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে। তাই দক্ষিণীর ডিপ্লোমা অর্জন করতে পারিনি।
• কিন্তু ওখানে গান শিখতে গিয়েই তো ঋতু গুহকে অর্জন করলেন আপনি?‌ আপনাদের প্রেম নিয়েই তো লিখেছিলেন উপন্যাস ‘‌খেলা যখন’‌?‌
•• হ্যাঁ। খেলা যখন। ঋতু তো অসাধারণ গায়িকা ছিল তখনই। দক্ষিণীর অনুষ্ঠানে ও গাইত একক। আমি ছিলাম কোরাসের দলে। (‌হাসতে হাসতে)‌ ডিগ্রি অর্জনের চেয়ে ঋতুকে অর্জন করা অনেক বেশি কৃতিত্বের ছিল।
• দেবব্রত বিশ্বাসের কাছেও তো গান শিখেছেন?‌
•• হ্যাঁ, আমার বন্ধু অর্ঘ্য সেন আমাকে নিয়ে যায় জর্জদার কাছে। আর, জর্জদার কাছে শিখেছিলাম রবীন্দ্রনাথের গানের কথার সঙ্গে ভাবের সংমিশ্রণ কত জরুরি।
• পুরাতনী গান শেখেন চণ্ডীদাস মালের কাছে?‌
•• পরিণত বয়সে আমি চণ্ডীদাসবাবুর কাছে পুরাতনী গান শিখি। উনি এখনও আছেন। অনেক বয়স। বালিতে থাকেন। পরে দিলীপ মুখোপাধ্যায়ের কাছে শিখেছি। রামকুমার চট্টোপাধ্যায় কয়েকবার আমার বাড়িতে এসেছেন, আমাকে কয়েকটা গানও শিখিয়েছেন। উনি বলতেন, আমার পরে তুমিই সবচেয়ে ভাল পুরাতনী গাও। এটা কথার কথা। আমি মানতাম না।
• গান শোনেন নিয়মিত?‌
•• গানই তো শুনি শুধু। রশিদ খানের গান আমার খুব ভাল লাগে। গতকাল রাতে শুনলাম সন্দীপনের গান। সুকুমার সমাজপতির ছেলে। বেশ গায়।
• কার কার রবীন্দ্রসঙ্গীত বেশি শোনেন?‌
•• জর্জদার গান শুনি। মোহনের (‌মোহন সিং খাঙ্গুরা)‌ গান। মোহরদির (‌কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ গান। আর ঋতুর গান।
• ঋতু গুহর কথা বারবার উঠছে। উনি নেই। খুব অভাববোধ করেন ওঁর জন্যে?‌
•• সে তো করিই। আসলে, এক সময় অ্যাকাউন্টেন্সি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকতাম। অন্যদিকে রাত জেগে লিখতাম। তারপর আমার জঙ্গল ভ্রমণ ছিল, শিকার ছিল। ব্যস্ততার শেষ ছিল না। তাই যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি ঋতুকে। সেজন্যে আজ খুব অপরাধবোধ হয়। আর, সত্যি বলতে কি, আমার কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়িকা হিসেবেও ঋতু শ্রেষ্ঠ। মোহরদি এক ধরনের গানে খুব সুন্দর, সুমিত্রাদি (‌সুমিত্রা সেন)‌ আর এক ধরনের গানে খুব সুন্দর। কিন্তু সব ধরনের গানে ঋতু সবচেয়ে সুন্দর। (‌কথা বলতে বলতে আন্দাজে দেওয়ালের দিকে তাকান উনি। সেখানে ঋতু গুহর ছবি।)‌ বললেন, ঋতুর ছবি আছে ওখানে। জানি। আমি অবশ্য দেখতে পাই না।
• পড়াশোনা, লেখালেখি, ছবি আঁকা, জঙ্গল ভ্রমণ—এখন তো সবই বন্ধ বলছেন। কোনটার জন্যে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়?‌
•• দেখো। জঙ্গল আমার প্রাণের। পালামৌ আমার হাতের রেখার মতো মুখস্ত। ভীল, ওঁরাও, মুণ্ডাদের সঙ্গে কত কতদিন কাটিয়েছি। আমি তো আসলে জংলিই। শুধু লেজটা নেই। আর, লিখতে তো আজও ইচ্ছে করে। অনেক কথা এখনও বলার আছে। ঠিকমতো ডিকটেশন নেবার লোক পেলে অনেক লেখা এখনও লিখে যেতে ইচ্ছে করে।
• আপনার গানের অ্যালবামও তো আছে।
•• হ্যাঁ, পুরাতনী গানের অ্যালবাম বেরিয়েছিল হিন্দুস্তান রেকর্ডস থেকে। পরে অশোক, তোমাদের সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত জোর করল রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করার জন্যে। তখন ইন্দ্রনীল সেনের কোম্পানি থেকে আমার রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট বের হয়।
• অনেকদিন পরে গান গাইছেন মঞ্চে, একক আসরে। এই গানগুলোর লাইভ রেকর্ডিং করতে বলেছেন?‌
•• বলিনি তো। বলে দেব। হ্যাঁ, এগুলো একটা অ্যালবাম হতে পারে বলো?‌ তবে, এটা অনেকটা বৈঠকী চালের অনুষ্ঠান। কথাও বলব, গানও গাইব। রেকর্ড করলে লোকে শুনবে?‌ মনে রাখবে?‌ মনে হয় না।
প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দেন প্রবীণ বুদ্ধদেব গুহ, যিনি ৮৪ বছর বয়সে দর্শক-‌শ্রোতাদের সামনে আসছেন একক গানের আসরে। কথা বলায় অক্লান্ত তিনি। জীবন-‌রসিক লেখক কথা থামিয়ে, আপন মনে গান গাইতে শুরু করেন, ‘‌কেন ভোলো, মনে করো তারে।’‌
সেই সুর টেনে নেয় দক্ষিণ কলকাতার আট তলার বাতাস। সেই বাতাস যেন বলে ওঠে, মনে থাকবে। মনে থাকবে। ‌‌

সাক্ষাৎকারের দিন। ছবি:‌ বিপ্লব মৈত্র

জনপ্রিয়

Back To Top