বালাই ষাট। এ শিরোনাম নেহাতই কথার কথা। কিন্তু কী হতো‌ যদি পেশার খাতিরে নেমে পড়ে বাথটবের জলে আমাদের কেউ সত্যি সত্যিই ডুবে মরতেন! যাঁরা, গভীর পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকেই অবশ্য, ‘‌বুম’‌ নিয়ে চিৎপাত হয়ে শুয়ে পড়েছিলেন টবমধ্যে।   ‌
কিম্বা যাঁরা ‘‌ক্রোমা’‌ ব্যবহার করে স্টুডিওর ভেতরে বানিয়ে ফেলেছিলেন আস্ত বাথরুম। তাতে বাহারি বাথটব। সেই আয়তাকার চৌবাচ্চার (‌যতই গালভরা নাম থাক আর ফ্যাশনেব্‌ল দেখতে লাগুক, আদতে সেই চৌবাচ্চাই তো। যার মধ্যে প্রাচীনকালে আর্কিমিডিস ডুবেছিলেন–ভেসেছিলেন এবং শেষমেশ ‘‌ইউরেকা’‌ বলে লাফিয়েছিলেন) ধারে রাখা রেড ওয়াইনের গ্লাস। সামনে দাঁড়িয়ে টু–পিস স্যুটের অ্যাঙ্কর। সাদা বাথটবের গায়ে দেবনাগরী হরফে লেখা ‘‌মওত কা বাথটব’‌। দেওয়ালে প্রমাণ সাইজের পোট্রেটে শ্রীদেবী। স্বপ্নসুন্দরীর ঠোঁটে মৃদু হাসি। সামনে ঘটতে–থাকা গোটা কাণ্ডকারখানা দেখেই বোধহয়। যেখানে স্রেফ কল্পনাকে আশ্রয় করে গ্রাফিক ধারাবিবরণী চলছে তাঁরই অপঘাত মৃত্যুর। 
কোনও চ্যানেলে বাথটবের জলে আলুলায়িত কেশদাম নিয়ে ভাসছেন গ্রাফিক–চর্চিত তিনি। পাশে দাঁড়িয়ে স্বল্প এবং পক্ককেশ মাথা চুলকোচ্ছেন দিশেহারা আর উদ্‌ভ্রান্ত গ্রাফিক বনি কাপুর। তেলুগু চ্যানেল আরও এগিয়ে (‌বস্তুত, সবচেয়ে এগিয়ে)‌। হাজার হোক, দক্ষিণের আকাশেই তো প্রথম আবির্ভাব শ্রীদেবীর। ক্যাটক্যাটে গোলাপি পোর্সেলিনের বাথটবে ‘‌বুম’‌ নিয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়লেন ক্রাইম রিপোর্টার। দানাদার গলায় ব্যাখ্যা করলেন বাথটবে শ্রীদেবীর মৃত্যুর অনুপুঙ্খ বিবরণ। 
সত্যি!‌ কী যে হল ক’‌দিন ধরে। 
দুবাইয়ের প্রথমসারির দৈনিক প্রথম পাতায় যৎসংক্ষিপ্ত সম্পাদকীয়ই (‌পরিভাষায় ‘‌ন্যানো এডিটোরিয়াল’‌)‌ লিখে ফেলল— ‘শ্রীদেবী হোটেলের বাথটবের জলে ডুবে মারা গেছেন। সেই জলে ডুবে মরেছে ভারতীয় নিউজ চ্যানেলগুলোও’। 
মনে রাখতে হবে, চ্যানেলে–চ্যানেলে ‘‌টবগাথা’‌র আগেই দুবাই পুলিস সরকারিভাবে জানিয়ে দিয়েছিল, ‘‌দুর্ঘটনাবশত’‌ জলে ডুবে মারা গিয়েছেন শ্রীদেবী। কিন্তু টিআরপি বড় বালাই। 
কিন্তু শিক্ষামূলকও বটে। প্রায় এক সপ্তাহ গোটা ভারতবর্ষে (‌পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশেও)‌ আলোচনা হল বাথটব নিয়ে। কত লম্বা। কত চওড়া। কত গভীর বা অগভীর। বাথটব এবং শ্রীদেবীর তুলনামুলক উচ্চতা। বাথটবে চিত হয়ে পড়লে কী হতে পারে। কী হতে পারে উপুড় হয়ে পড়লে। অ্যালকোহল পান করে টাল খেয়ে কি বাথটবের অনুচ্চ পাঁচিল টপকানো যায়। সেখানে ডুবতে গেলে কত জল থাকা প্রয়োজন। ডুবে মরতে গেলে কতটা জল থাকতে হবে। কাউকে ঘাড় ধরে বাথটবের জলে চুবিয়ে দিলে কতক্ষণ লাগবে দমবন্ধ হয়ে মরতে। মৃত্যুর পর কি দেহ বাথটব ধরে রাখবে। নাকি উগরে দেবে। দিলে কতটা দেবে। 
বাথটব!‌ বাথটব!‌ বাথটব!‌ 
দয়াদাক্ষিণ্যে কখনও–সখনও পাঁচতারায় দিনযাপনের ১৪ আনা সুযোগ–পাওয়া মধ্যবিত্তও বাথটব–বিশেষজ্ঞ হয়ে গেল। গত কয়েক হাজার বছর এই বস্তুটি সম্পর্কে কেউ এত কৌতূহল দেখিয়েছে?‌ কেউ জানত, ১৯ শতকে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল ‘‌ক্ল–ফুট’‌ টব?‌ অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি হল্যান্ডে তৈরি সেই বাথটবের নকশার অনুপ্রেরণা ছিল চিনা ড্রাগনের মোটিফ। অতঃপর আভিজাত্যের অভিজ্ঞান হয়ে বাথটব পাড়ি দিল ইংল্যান্ডে। বৃটিশরা বাথটব তৈরি করত কাস্ট আয়রন, টিন বা তামা দিয়ে। ওপরে রংয়ের প্রলেপ। যে রং ক্রমাগত ব্যবহারে জীর্ণ হতে হতে একটা সময়ে উঠে যেত। হাজার বছর আগে ছিল পায়ার ওপর রাখা ‘‌পেডেস্টাল টব’‌। আমেরিকায় হিপি যুগের (‌১৯৬৭–১৯৮০)‌ গান আর চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় ছিল ‘‌হট টব’‌। খানিকটা থেরাপি আর বাকিটা আরামের কারণে।  
হাজার বছর আগে যা মাটি দিয়ে তৈরি হতো, এখন তা তৈরি হয় থার্মোফর্মড অ্যাক্রিলিক, পোর্সেলিন, এনামেলের পাতলা মোড়ক দেওয়া ইস্পাত বা ফাইবার গ্লাস মিশ্রিত পলিয়েস্টার দিয়ে। এই বাথটবে জল বেরোনর পথ আছে। সঙ্গে ঠান্ডা–গরম জলের ট্যাপ। শাওয়ার। আগে বাথটব মাত্রেই হতো আয়তাকার এবং সাদা। এখন নানা মাপের। এবং নানা রংয়ের।  
আধুনিক সভ্যতায় বাথটব দু’‌ধরনের। প্রথম, অগভীর এবং লম্বা। যেখানে পুরোপুরি শুয়ে পড়া যায়। পাশ্চাত্যের স্টাইল। দ্বিতীয়, তুলনায় ছোট এবং গভীর। যেখানে বসে বসে স্নান করতে হয়। প্রাচ্যের স্টাইল। জাপানে বিখ্যাত ‘‌ওফুরো’‌ নামে। 
শিক্ষামূলক নয়?‌ 
বাথটব, তার দৈর্ঘ্য–প্রস্থ, রকমফের সম্পর্কে বিপুল জ্ঞানলাভ হল। সেই হাঁটুডোবা জলেই ডুবে মোলো ভারতীয় সাংবাদিকতা। 
কিন্তু এ এক রোমান্টিক মৃত্যু। সাধে কি ‘‌ময়মনসিংহ গীতিকা’‌য় নদের চাঁদ আর সুন্দরী মহুয়ার কথোপকথন মনে পড়ল?— ‘‌তুমি হও গহীন গাঙ আমি ডুইব্যা মরি’‌‌! 
দুবাইয়ের দৈনিক জানেটা কী!‌ বাথটব–প্রেমের জয় হোক ।

জনপ্রিয়

Back To Top