অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: নরম সবুজ পালকের জাদুদণ্ডের ওপর একটা লাল ফুল। আলতো করে তিনি হাত বুলিয়ে দিতেই লাল ফুল ভ্যানিশ। আর একবার হাত বুলোতেই আবার ফিরে এল সেই লাল ফুল।
এমন আশ্চর্য অনায়াস ম্যাজিক দেখে হাততালি দিয়ে ওঠে বছর পাঁচেকের এক ফুটফুটে মেয়ে। তারপর বায়না ধরে, আমি শিখব। আমাকে শেখাবে?‌
গড়িয়াহাটের মোড়। ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের সামনের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে হেসে ওঠেন ওই ম্যাজিশিয়ান। গাল-‌ভর্তি বড় দাড়ি। মিটিমিটি হাসি নিয়ে ওই প্রবীণ জাদুকর বলে ওঠেন, তোমার জন্যেই তো এনেছি!‌ তুমি পারবে বলেই তো আমার এই ম্যাজিক।
খিল খিল করে হেসে ওঠে ওই বালিকা। ম্যাজিকটা শিখে নেয় সঙ্গে সঙ্গে। ২৫ টাকা দিয়ে মেয়েকে এই উপহার দেন তার বাবা, মা। এমন আশ্চর্য উপহার বোধহয় এই প্রথম পেল তিন্নি। (‌নামটা জিজ্ঞেস করেছিলেন ওই জাদুকর)‌। নাচতে নাচতে রাজ্য-‌জয় করে এগিয়ে গেল তিন্নি, মা-‌বাবার হাত ধরে।
এই প্রবীণ জাদুকরকে অনেকদিন ধরে দেখছি। কখনও গড়িয়াহাটে, কখনও পার্ক স্ট্রিটের রাস্তায়। বইমেলাতে, ভিড় থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর জাদু নিয়ে, দেখেছি। কথাও বলেছি তাঁর সঙ্গে। অনেকদিন পরে আবার তাঁকে আবিষ্কার করি গড়িয়াহাটে, যেখান থেকে পাঁচ মিনিট দূরত্বে প্রবাদপ্রতিম জাদুসম্রাট পি সি সরকারের বাড়ি, ইন্দ্রজাল ভবন।
একটু দূর থেকে লক্ষ করছিলাম তাঁকে। দেখলেন। চিনতে পারলেন। বললেন, ‘‌একটু দাঁড়ান। কথা বলব। আগে একটা ‘‌চার্লি চ্যাপলিন’‌ বিক্রি করে নিই।’‌
জানি, এই ‘‌চার্লি চ্যাপলিন’‌ তাঁর পয়া ম্যাজিক। একটা তাসের মতো কার্ড। সেখানে চার্লি চ্যাপলিন আঁকা। চার্লির টুপি-‌পরা মাথাটা একটু ওপরে উঠে আবার লেগে যাচ্ছে শরীরে। একটা আট-‌ন বছরের ছেলে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে নড়া-‌চড়া করা চার্লির দিকে। যথারীতি তার আবদার, ম্যাজিকটা সে শিখবে। শিখিয়ে দিলেন প্রবীণ জাদুকর। ছেলেটির মা কিনে নিলেন ম্যাজিকটা। চার্লি উপহার পেয়ে ছেলেটির মুখে চ্যাপলিনের মতো হাসি ফুটে উঠল।
এবার কাঁধের ঝোলা ব্যাগটায় চেন টেনে দিলেন জাদুকর। বললেন, আজকের মতো ম্যাজিক শো সমাপ্ত। আবার কাল। চলুন একটু আড্ডা দিই।
আড্ডার জন্যে চাই চা। ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের সামনেই, ফুটপাথে বাপির চা। বসার জন্য আছে গড়িয়াহাট উড়ালপুলের নিচে, সারিসারি দাবার বোর্ডের পাশে, প্রশস্ত রেলিং।
জাদুকরের নাম অশোক বসু। বয়স ৭০ পেরিয়েছে। টান-‌টান চেহারা। মুখভর্তি দাড়ি। ঝোলাভর্তি ম্যাজিক। এখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে যাবেন বালিগঞ্জ স্টেশন। সেখানে একটা নির্দিষ্ট দোকানে দুটো রুটি খাবেন। ডিনার শেষ। দুপুরে নিজেই একমুঠো ভাত রান্না করে নেন। থাকেন একা।
—একা কেন?‌
— একা থাকার একটা অদ্ভুত আনন্দ আছে। অনেকদিন তো সংসার করেছি।

জাদুকর অশোক বসু। গড়িয়াহাটের মোড়ে। ছবি:‌ অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

জনপ্রিয়

Back To Top