‌অদিতি রায়: চার্লি চ্যাপলিন সেজে দুষ্টু লোকেদের শায়েস্তা করা থেকে শুরু করে, বিয়ার পাবে গিয়ে প্রচুর বিয়ার পান করে হেঁচকি তুলতে তুলতে সংলাপ বলা, বা রাজস্থানের মরুভূমিতে ঘাগড়ায় হিল্লোল তুলে নাচ, সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পথে প্রেমিকের চক্রান্তে ফেঁসে গিয়ে মাদক পাচারের অপরাধে কারাবন্দি এক অসহায় মেয়ে, কিংবা দুর্ঘটনায় স্মৃতিভ্রষ্ট অপরিণত মস্তিষ্কের এক যুবতী!‌ যে কোনও চরিত্রে অপরিসীম দক্ষতায় তাঁর অনায়াস বিচরণ। তিনি শ্রীদেবী। শ্রীদেবী আর নেই!‌ শনিবার রাত ১১.টা ৩০ নাগাদ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। নিজের দেশ থেকে বহু দূরে, আরব আমিরশাহিতে।
স্বামী বনি কাপুর ও ছোট কন্যা খুশিকে নিয়ে এক পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুবাই গিয়েছিলেন শ্রীদেবী। বনি কাপুরের প্রথম পক্ষের ছেলে, অভিনেতা অর্জুন কাপুরও ছিলেন তাঁদের সঙ্গে। বিয়েতে যোগ দেওয়ার হাসিখুশি ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন শ্রীদেবী। ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও ফুটেজেও দেখা গেছে সুসজ্জিত ঝলমলে শ্রীদেবীকে। ব্যাস ওই পর্যন্তই‌!‌ এরপর হোটেলে ফিরে, হোটেলেরই বাথরুমে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যান, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মৃত্যু হয় শ্রীদেবীর।‌ ইন্দ্রপতন বোধহয় একেই বলে!
১৯৬৩–‌‌র ১৩ আগস্ট তামিলনাড়ুর শিবকাশীতে তামিল পিতা আয়াপ্পান এবং তেলুগু মা রাজেশ্বরীর ঘরে জন্ম নেয় ফুটফুটে শ্রী আম্মা ইয়াঙ্গর আয়াপ্পান। কালক্রমে এই মেয়েটিই হয়ে ওঠে ভারতীয় সিনেমার প্রথম মহিলা সুপারস্টার শ্রীদেবী। মাত্র ৪ বছর বয়সেই টিনসেল দুনিয়ায় তাঁর পদার্পণ তামিল ছবি ‘‌থুনাইভন’‌–‌এ। এরপর বহু তামিল এবং তেলুগু ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন, পুরস্কার জিতেছেন। ১৯৭৫–‌এ ‘জুলি‌’ ছবিতে নায়িকার বোনের চরিত্রে বলিউডে প্রবেশ শ্রীদেবীর।‌ ১৯৭৯–‌তে হিন্দি ছবিতে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ অমল পালেকরের বিপরীতে ‘‌সোলওয়া সাওন’‌ ছবিতে। কিন্তু বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে ছবিটি, ফলে অপেক্ষা করতে হয় ৪ বছর। ১৯৮৩–‌তে জিতেন্দ্রর বিপরীতে ‘হিম্মতওয়ালা‌’‌তে চাবুক হাতে এন্ট্রি নিয়ে হইচই ফেলে দেন শ্রীদেবী।
এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। জিতেন্দ্রর সঙ্গে জুটি বেঁধে পরপর ১৩টা হিট ছবি দিয়েছেন তিনি, সঙ্গে ‘‌নয়নোঁ মে সপনা’‌‌র মতো সুপারহিট গান। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮, সময়টা জিতেন্দ্র–‌শ্রীদেবীর পকেটবন্দি। সেই সময় মুম্বইয়ের একটি নামকরা সিনেমা পত্রিকা ঘোষণা করে, নিঃসন্দেহে শ্রীদেবী ১ নম্বর হিরোইন। যত দিন ছিলেন, এই তকমাটা তাঁর থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। এরই ফাঁকে ‘সদমা‌’‌তে দুর্ঘটনার শিকার, স্মৃতিভ্রষ্ট, শৈশবেই থেমে যাওয়া এক তরুণীর ভূমিকায় অভিনয় করে শ্রীদেবী প্রমাণ করলেন ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি এসেছেন থাকতে শুধু নয়, রাজত্ব করতে!
‘সদমা‌’‌তে অভিনয় করেই ‘চাইল্ড ওম্যান‌’‌ খেতাবটা অর্জন করেন শ্রীদেবী। তাঁর বিশাল বড় বড় দুই চোখে যেন রাজ্যের বিস্ময়, ঠিক শিশুর মতো। অসম্ভব ইনোসেন্ট, নিষ্পাপ ওই মুখশ্রী ছিল তাঁর হাতিয়ার। ‘‌চালবাজ’‌, ‘মিস্টার ইন্ডিয়া‌’‌তে তাঁর কমিক টাইমিং যেমন অতুলনীয় ছিল‌, তেমনই ‘‌চাঁদনি’‌, ‘লমহে‌’‌‌তে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় প্রেমিকার রোলমডেল। থ্রিলার ধর্মী ‘‌গুমরাহ’‌ বা ‘জাঁবাজ‌’‌–‌এও শ্রীদেবীর অভিনয় বাঁধা ছিল সূক্ষ্ম তারেই। অভিনয়ের সেই সুর বা ছন্দ যে কোথাও হারিয়ে যায়নি তা টের পাওয়া গিয়েছিল দীর্ঘ ১৫ বছর পর তাঁর অভিনীত ‘ইংলিশ ভিংলিশ‌’‌ বা ‘‌মম’‌ ছবিতেই।
এই ‘চাইল্ড ওম্যান‌’‌ ছিলেন বেশ দাম্ভিক। আত্মসম্মানবোধ ছিল তাঁর প্রবল। যে–সময় অমিতাভ বচ্চনের বিপরীতে নায়িকা হওয়ার জন্য যে কোনও শর্তে রাজি ছিলেন অন্য নায়িকারা, সেই সময়ই অনায়াসে অমিতাভের বিপরীতে ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন শ্রীদেবী!‌ অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ‘ইনকিলাব‌’‌ ও ‘‌আখরি রাস্তা’য় অভিনয় করে শ্রীদেবীর মনে হয়েছিল, যে ছবিতে অমিতাভ বচ্চন নায়ক, সেখানে নায়িকা কেন, কারওরই কিছু করার থাকে না। এরপরও অবশ্য ‘খুদা গাওয়াহ‌’‌‌তে অমিতাভের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। কারণ, ওই ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে শুধু নয়, চিত্রনাট্যেও সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল শ্রীদেবী অভিনীত দুটি চরিত্রই। শ্রীদেবীর পেশাদারিত্ব বা ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রির প্রতি আনুগত্যও প্রশ্নাতীত। স্টিভেন স্পিলবার্গের মতো পরিচালকের প্রস্তাবও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ডেট ছিল না বলে!
দৃঢ়চেতা এই ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি শ্রীদেবী ছিলেন অত্যন্ত ইমোশনাল। তাঁর আবেগ মাঝেমধ্যেই তাঁকে ভঙ্গুর করে দিত। শোনা যায় ‘গুরু‌’‌ এবং ‘জাগ উঠা ইনসান‌’‌ ছবির শুটিং চলাকালীন মিঠুন ও শ্রীদেবীর মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। গোপনে নাকি বিয়েও সেরে ফেলেছিলেন তাঁরা। কিন্তু মিঠুন চক্রবর্তীর স্ত্রী যোগিতা বালি ডিভোর্স না দেওয়ার কারণে শ্রীদেবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন মিঠুন। সেই আঘাতে আরও গুটিয়ে গিয়েছিলেন স্বভাব লাজুক, শান্তশিষ্ট মেয়েটি। সেই সময় প্রায় বটগাছের মতো শ্রীদেবীকে ঝড়ঝাপ্টা থেকে আড়াল করতেন অনিল কাপুরের দাদা প্রযোজক বনি কাপুর। তিনিও তখন বিবাহিত। কিন্তু তাঁর স্ত্রী‌র থেকে বিচ্ছেদ পেতে সমস্যা হয়নি বনির। বিচ্ছেদের পরই শ্রীদেবীকে বিয়ে করে সসম্মানে ঘরে তোলেন বনি কাপুর। বিয়ের পরও দু–‌একটা ছবি করেছেন শ্রীদেবী। তখন একমাত্র সুপারহিট হয়েছিল ‘জুদাই‌’‌। এরপরেই স্বামী এবং সংসারের সঙ্গে জুদাই সহ্য হল না রূপ কি রানির। সব ছেড়েছুঁড়ে দিলেন, মা হলেন দুই ফুটফুটে কন্যার জন্ম দিয়ে। সমস্ত অপ্রাপ্তি মিটে গিয়ে তৃপ্তির হাসি ফুটল ‘‌চাইল্ড ওম্যান’‌–‌এর আদুরে ওই মুখে।
মেয়েরা বড় হল, এবার শিল্পীর খিদে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আলোকবৃত্তের অমোঘ আকর্ষণে ২০১২–‌তে প্রত্যাবর্তন ঘটল শ্রীদেবীর। গৌরী শিন্ডের ‘ইংলিশ ভিংলিশ‌’‌ ছবিতে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অনায়াস অভিনয়ে আবার মুগ্ধ হলেন তামাম সিনেমাপ্রেমী। ২০১৩–‌তে ‘‌বম্বে টকিজ’‌–‌এ অতিথি উপস্থিতির পর ২০১৭–‌তে আবার ফিরলেন ‘‌মম’‌ ছবিতে। এবার অনেকটা সিরিয়াস, বয়সোচিত। আবার চমকে গেলেন দর্শক, তাঁর অভিনয়ের মীড়ের কাজে। এই তো, এই ডিসেম্বরেই শাহরুখ অভিনীত ‘‌জিরো’‌‌তে দেখা যাবে শ্রীদেবীকে। মনে আছে ‘‌আর্মি’‌তে শ্রীদেবীর স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ খান। ছবির নায়ক কিন্তু শাহরুখ ছিলেন না। কারণ ছবিতে শ্রীদেবী ছিলেন যে!‌ শ্রীদেবীই তো নায়ক।
‘মিস্টার ইন্ডিয়া টু‌’‌ এবং ‘ইংলিশ ভিংলিশ টু‌’‌ আসবে এমন কথা হাওয়ায় ভাসছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। অপেক্ষায় ছিলেন প্রত্যেকেই। অপেক্ষার অবসান বড় অতর্কিতেই। চাঁদনির আলো বোধহয় এটুকুই পাওয়ার ছিল। কারণ, সে তো চলে গেল, বলে গেল না, ঠিক যেন বসন্তের বাতাসটুকুর মতোই।‌

জনপ্রিয়

Back To Top