অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: • বাইশে শ্রাবণের পাঁচদিন আগে আপনি মুম্বই থেকে কলকাতায় এলেন আপনার রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম ‘‌প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’‌ প্রকাশ করার জন্যে। বাইশে শ্রাবণ কে মাথায় রেখেই কি এই গানগুলো প্রকাশ করলেন?‌
•• আসলে, অনেকদিন থেকেই ভাবছিলাম আবার একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম প্রকাশ করি। দিনটা বাইশে শ্রাবণের কাছাকাছি হয়ে গেল। খুব পরিকল্পনা করে যে দিনটা বাছাই করেছি, এমন নয়। তবে রবীন্দ্রনাথ তো সারা বছর জুড়েই সঙ্গে থাকেন। পঁচিশে বৈশাখ আর বাইশে শ্রাবণে তো তাঁকে বেশি করে মনে পড়ে। রাগা মিউজিকের প্রেমকুমার গুপ্তা আগ্রহ নিয়ে প্রকাশ করলেন এই অ্যালবাম। তাঁকে ধন্যবাদ।
• এই অ্যালবামের গানগুলো কি আগেই রেকর্ড করা ছিল?‌
•• হ্যঁা, কয়েক বছর আগেই রেকর্ড করেছিলাম। তখন সুভাষ চৌধুরি ছিলেন। ওঁর তত্ত্বাবধানেই করেছিলাম। রবীন্দ্রসঙ্গীতের শুদ্ধতা নিয়ে তো সব শিল্পীরই সজাগ থাকা উচিত। রবীন্দ্রসঙ্গীতকে যেন রবীন্দ্রসঙ্গীত বলে চেনা যায়, এটা সবসময় মাথায় রাখা উচিত। আবার নিজের গায়কীর ছাপও যেন থাকে। নিজস্বতাই তো একটা গানের প্রাণ।
• এই অ্যালবামের গানগুলো কীভাবে বাছলেন?‌ একদিকে যেমন ‘‌প্রাণ চায় চক্ষু না চায়’‌-‌এর মতো জনপ্রিয় গান আছে, আবার ‘‌বাজে করুণ সুরে’‌ও গেয়েছেন, যে গান কম শিল্পীই করেন।
•• আমার ভাললাগা গানগুলো থেকেই ১২টা গান বেছেছি। সব ধরনের রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেই আমি ভালবাসি। ‘‌আমার যে দিন ভেসে গেছে’‌, এই গানটাও তো খুব বেশি শোনা যায় না। আমার খুব প্রিয় গান। তাই গেয়েছি।
• ‘‌আমার যে দিন ভেসে গেছে’‌ বা ‘‌বাজে করুণ সুরে’‌— শুনে মনে হচ্ছে কোথাও যেন বাইশে শ্রাবণকে মাথায় রেখেও গান বেছেছেন।
•• দেখো, এখন তো বিশেষ বিশেষ সময়ে গান প্রকাশ হওয়ার রীতি প্রায় উঠে গেছে। তবু, আমার এই গানগুলো বাইশে শ্রাবণের কাছাকাছি প্রকাশ হল, রবীন্দ্রনাথকে প্রণাম জানালাম এই সব গানে। কিন্তু ওই যে বিশেষ সময় বলছিলে না?‌ দেখো, বাংলা গানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হল পুজো। সেই পুজোর গানই তো উঠে গেল!‌
• আপনার পুজোর গান তো প্রতিবছরই হিট হত। ফিরত লোকের মুখেমুখে। ‘‌বন্য বন্য এ অরণ্য ভাল’‌, ‘‌জলে নেমো না আর থই পাবে না’‌ কিংবা ‘‌তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়’‌-‌এর মতো গান তো আজও জনপ্রিয়। সেই পুজোর আধুনিক গান বন্ধই হয়ে গেল। দুঃখ পান?‌
•• শিল্পী হিসেবে যতটা দুঃখ পাই, তার চেয়ে অনেক বেশি দুঃখ পাই বাংলা গানের শ্রোতা হিসেবে। শ্রোতারা কী অনেক কিছু হারালেন না?‌ এইসব আধুনিক গান, বেসিক গান একসময় অনেক বেশি হিট হয়েছে সিনেমার গানের চেয়ে। পুলকদা (‌পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ লিখলেন, সুর করলেন নচিদা (‌নচিকেতা ঘোষ)‌—তৈরি হল ‘‌জলে নেমো না’‌। পুরো গানটা শ্রোতাদের মনের মধ্যে একটা স্পষ্ট ছবি তৈরি করে দিল। কিংবা ধরো, ‘‌লজ্জা, মরি মরি একী লজ্জা’‌ গানটা যখন বের হল, বড় কাগজের এক সঙ্গীত সমালোচক লিখেছিলেন, গান শুনে মনে হচ্ছে যেন সত্যিই লজ্জা পাচ্ছে এক কিশোরী। আর, কিশোরদা তো আমায় একটা গানের আড্ডায় খেপালেন, ‘‌এই আরতি লজ্জা পাচ্ছিস, তুই যা এখান থেকে।’‌ এটা তো মজার ব্যাপার। কিন্তু নচিকেতা ঘোষ বা সুধীন দাশগুপ্তর মতো সুরকাররা যেভাবে কম্পোজিশন করেছেন, যেভাবে গাইয়েছেন, তার কোনও তুলনা নেই। বেসিক গানকে তাঁরা এত উঁচুতে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটা ভাবাই যায় না। এখন তো বেসিক গান উঠে গেল। এখন তো টিভিতে পিকচারাইজেশন দেখিয়ে, নায়ক-‌নায়িকাকে দেখিয়ে সিনেমার গানকে হিট করাতে হচ্ছে। বাংলা আধুনিক গান কিন্তু শুধু গানের কথা, সুর আর কণ্ঠ দিয়ে ছবি এঁকে দিত শ্রোতাদের মনে।
• আপনি তো গানের কম্পিটিশনের মাধ্যমেই দেশের বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালকদের নজরে পড়েছিলেন। নিজে থেকেই নাম দিয়েছিলেন সেই প্রতিযোগিতায়?‌ 
•• না, না। আমার গান শেখার মূলে আমার মা (‌প্রভাবতী মুখোপাধ্যায়)‌। আমার বাবাও (‌মনোরঞ্জন মুখোপাধ্যায়)‌ ভাল গান গাইতেন, অর্গান বাজাতেন। আমাদের বাড়িটা ছিল গানের আর পড়াশোনার বাড়ি। আমার এক কাকা খুব ভাল সেতার বাজাতেন। অল ইন্ডিয়া মিউজিক ট্যালেন্ট কম্পিটিশনের খবর পেয়ে কাকাকে দিয়ে আমার মা আমার জন্যে ফর্ম ফিল-‌আপ করিয়েছিলেন। তখন আমার ১৪/‌১৫ বছর বয়স। সেই কম্পিটিশনে নিজেই আমার গান গাওয়ার, রেকর্ড করার দরজা খুলে গেল। নৌসাদ আলি, মদনমোহনজির মতো সঙ্গীতগুরুরা ছিলেন বিচারক। তাঁরা এত বিশাল মাপের সঙ্গীতজ্ঞ যে তাঁদের কানকে ঠকানো সহজ ছিল না।
• এখন তো বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে গানের রিয়্যালিটি শো হয় প্রতি বছরই। এখানেও কম্পিটিশন হয়। রিয়্যালিটি শো কি তাহলে নতুনদের ক্ষেত্রে গানের দরজা খোলার প্ল্যটফর্ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে?‌
•• ঠিক তার উল্টোটাই হচ্ছে। আমারা তো অল ইন্ডিয়া কম্পিটিশনে গুরুর কাছে শেখা গান গেয়েছি। সেইসব গান লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া গানের ‘‌কপি’‌ নয়। তখন কি লতা মঙ্গেশকর পপুলার ছিলেন না?‌ তাঁর গলাও তখন অনেক ভাল। কিন্তু আমাদের গুরুরা অন্য কম্পোজিশন শেখাতেন। আমরা নিষ্ঠা নিয়ে শিখতাম। অন্য কোনও শিল্পীকে নকল করে গাওয়ার কোনও প্রশ্নই থাকত না। আজকের রিয়্যালিটি শো-‌তে বিখ্যাত শিল্পীদের গাওয়া গানগুলো নতুনরা নকল করে গাইছে। নকল-‌ই তো। সেইসব বিখ্যাত গানের অ্যাসিড টেস্ট তো বহু বছর আগে হয়ে গেছে। শ্রোতাদের হৃদয়ে সেইসব গান আছে। এখন চ্যানেলগুলো টি আর পি বাড়ানোর ব্যবসায় সেইসব গানগুলো নতুনদের দিয়ে গাওয়াচ্ছে‌। জানে, এইসব গান সহজে শ্রোতাদের ভাল লাগবে। কিন্তু ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে নতুনদের। তারা নতুন গান গেয়ে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছনোর যে লড়াই এবং আনন্দ, সেটাই পাচ্ছে না। শুধু পপুলার গানগুলো তাদের দিয়ে গাওয়ানো হচ্ছে। নতুন গানের যে কী ভ্যালু, তারা বুঝতেই পারছে না। ফলে, এইসব রিয়্যালিটি শো তাদের প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠতে দিচ্ছে না। ক্ষতি করছে নতুনদের। তাদের জীবনের সুন্দর সময়গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটা তাদের শিক্ষার সময়। শেখার সময়। কিন্তু চ্যানেলের ব্যবসা বাড়ানোর জন্যে, টি আর পি-‌র জন্যে পাগলামো করা হচ্ছে নতুনদের নিয়ে। তারাও সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে, টিভির দর্শকদের সামনে আসার জন্যে ছুটোছুটি করছে। তারপর একদিন রিয়্যালিটি শো শেষ হবে, তারা বাস্তবের জমিতে দাঁড়াবে আর অবসাদে ভুগবে। একসময় তারা বুঝবে, তাদের নিজেদের কোনও গান নেই। বিখ্যাত শিল্পীদের পুরনো হিট গান গাওয়ার জন্যে তখন আর একদল নতুন ছেলেমেয়ে চলে আসবে টিভির রিয়্যালিটি শো-‌এ। খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে নতুনদের। এটা আমি দ্বিধাহীন ভাবে বলতে চাই।
• আপনি হিন্দিতে, বাংলায় সিনেমার গান, আধুনিক বাংলা গানের জন্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। কিন্তু উচ্চাঙ্গসঙ্গীতটা আপনি খুব মন দিয়ে শিখেছেন, চর্চা করেছেন। এটার কী অভাব দেখছেন আজকের সময়ে?‌
•• উচ্চাঙ্গসঙ্গীত না শিখলে একজন শিল্পী তৈরি হবে কী করে?‌ আমি সাগিরুদ্দিন খাঁ সাহেব, চিন্ময় লাহিড়ী, লক্ষ্মণপ্রসাদ জয়পুরওয়ালে, রমেশ নাদকার্ণির কাছে ক্লাসিক্যাল শিখেছি। জানো তো, রমেশ নাদকার্ণি ছিলেন আমির খাঁ সাহেবের গুরুভাই। লতাজিরও গুরুভাই। আমন আলি খাঁ সাহেবের কাছে রমেশজি আর লতাজি একসঙ্গে শিখতেন। আসলে, গুরুদের কথা উঠলে মনে হয়, এখনও কত শেখা বাকি থেকে গেছে। তবে, এখনও কিন্তু সঙ্গীত শিক্ষক আছেন। কিন্তু তাঁদের তো খুঁজে নিতে হবে। তাঁদের কাছে যেতে হবে। সঙ্গীতটা তো রিয়্যালিটি শো-‌এর এক-‌দেড় ঘণ্টার মজা নয়, সঙ্গীতটা একটা সাধনা। নতুনদের এটা বুঝতে হবে। বড়রাই তো বোঝাবে। কিন্তু বড়রাই তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার মোহের দিকে। সঙ্গীতটা তাৎক্ষণিক ব্যাপার নয়। এটা একটা ম্যারাথন দৌড়। সারাজীবনে সঙ্গীতের এই যাত্রা শেষ হয় না।
• বাংলা নতুন গানের ক্ষেত্রে কিন্তু কবীর সুমন ভাষায়, সুরে অন্য একটা বাঁক এনেছেন।
•• সুমনের গানে কথার প্রাধান্য বেশি। সেই কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সুমন বা নচিকেতার গানকে ‘‌জীবনমুখী’‌ তকমা দেওয়াটা কেন হল, আমি বুঝতে পারি না। আমরা কি সব মরণমুখী গান গেয়েছি?‌ সলিল চৌধুরি কি মরণমুখী গান তৈরি করেছেন?‌ পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্তর মতো গীতিকার, সুরকাররা অসাধারণ প্রতিভা দিয়ে বাংলা গানকে একটা বিরাট উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের গান কি জীবনমুখী নয়?‌ এইসব তকমা শুধু গিমিক তৈরি করার জন্যে। আর, তাই-‌ই যদি হবে, তাহলে পুজোর গান উঠে গেল কেন?‌ কেন বাংলা বেসিক গান আরও উচ্চতায় না উঠে হারিয়ে গেল?
• বাংলা সিনেমাতেও আপনি প্রায় সব নায়িকার‌ ‘‌লিপ’‌-‌এই গান গেয়েছেন। এবং আপনার প্রায় সব গানই জনপ্রিয় হয়েছে।
•• দেখো, ছবি চলেনি, কিন্তু আমার গান জনপ্রিয় হয়েছে, এমন উদাহরণ অনেক।
• আপনি তো সুচিত্রা সেনের জন্যে ‘‌ফরিয়াদ’‌-‌এ গান গেয়েছেন ‘‌সে আমার ছোট্ট একটা চিঠি’‌।
••  খুব জনপ্রিয় হয়েছিল সেই গান। ‘‌হার মানা হার’‌-‌এ মিসেস সেনের লিপ-‌এ দুটো গানই আমার গাওয়া। জানো তো, আমি মুনমুনের লিপ-‌এও গান গেয়েছি ‘‌রাজবধূ’‌ ছবিতে। দীনেন গুপ্তর একটা ছবিতেও মুনমুনের জন্যে গেয়েছি। আমি একদিন মুনমুনকে বলেছিলাম, এবার রাইমার লিপ-‌এ একটা গান গাইব (‌হাসতে হাসতে)‌।
• সেটা তো আপনি ইচ্ছা প্রকাশ করলেই হতে পারে। সৃজিত মুখোপাধ্যায় তো আপনার ভাইপো। আপনার এই অ্যালবাম রিলিজেও সৃজিত এসেছিলেন। সৃজিত আপনাকে ওঁর ছবিতে গান গাওয়ার কথা বলেননি?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ সৃজিতের কাছে আমিও ইচ্ছে প্রকাশ করিনি, সৃজিতও আমাকে বলেনি। আমার নিজের মামাতো ভাইয়ের ছেলে হল সৃজিত। আমার গান ও খুব ভালবাসে, সেই ছোট থেকেই। ওর ছবিও আমি দেখি, আমার মতামত দিই। দেখো, ছবির গান তো সিচুয়েশন অনুযায়ী, চরিত্র অনুযায়ী, গল্প অনুযায়ী তৈরি হয়। (‌হাসতে হাসতে)‌ সেখানে কি পিসিমণি-‌র জন্যে স্পেশাল গান তৈরি করা যায়?‌
• আপনার অনুষ্ঠানে অনুপমও (‌অনুপম রায়)‌ এসেছিলেন।
•• হ্যঁা, অনুপমও আমাকে খুব শ্রদ্ধা করে। অনুপমের গান তো কথা প্রধান। ওর গান আমার ভাল লাগে।
• সৃজিত-‌অনুপম প্রথম ছবি ‘‌অটোগ্রাফ’‌ থেকেই জুটি। ওঁরা যদি চান, আপনি নিশ্চয়ই ওঁদের গান গাইবেন?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ গাইব না কেন?‌ ওরা তো আমার ছেলের মতো।
• আপনার ছেলে সোহম (‌সোহম মুনিম)‌ তো সেতার শিল্পী?‌
•• হ্যঁা, ও খুব ভাল সেতার বাজায়। অনেক কনফারেন্সে বাজিয়েছে।
• আপনি তো এখন মুম্বইতেই বেশিরভাগ সময় থাকেন?‌
•• হ্যঁা, আমার শ্বশুড়বাড়ি তো মুম্বইতে। ওঁরা গুজরাটি। অভিজাত পরিবার। আমাদের পরিবারের সঙ্গে পণ্ডিচেরি আশ্রমের খুব যোগাযোগ। আমার শ্বশুরমশাই পণ্ডিচেরিতে একটা বাড়িও করেছিলেন। সেখানেও আমরা মাসে মাসে যাই।
• আপনি নিবিড়ভাবেই ক্লাসিক্যাল গানের চর্চা করেছেন। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের রেকর্ড করেছিলেন একসময়। এখনও গাইতে ইচ্ছে করে?‌
•• দেখো, রেওয়াজ তো রোজই করি। ফলে, উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের সঙ্গে যোগ তো আছে। থকেই যাবে। তবে, এখন তো শুনি, কবীর সুমন বাংলা খেয়াল গাইছেন। বহু বছর আগে আমি কিন্তু বাংলা খেয়াল গেয়েছিলাম, রেকর্ড করেছিলাম। এইচ এম ভি থেকেই সেই রেকর্ড বেরিয়েছিল। সরস্বতী রাগে গেয়েছিলাম—‘‌যেয়োনা যেয়োনা সখী’‌। তারসঙ্গে তারানা গেয়েছি। হংসধ্বনী রাগে পুরো বোলতান দিয়ে বাংলা খেয়াল গেয়েছি। টপ্পা গেয়েছি। এই গানগুলো বেরিয়েছে আধুনিক বাংলা গানের অ্যালবামেই। কোনও মিশ্রণ নেই। কিন্তু বাংলার শ্রোতারা আজ কি সেই গানের খোঁজ রাখেন?‌
• তার জন্যে কি কষ্ট হয় আপনার?‌
•• দেখো, একদিন শ্রোতাদের শুনতেই হবে এই গান। ‘‌নেট’‌ খুলে ল্যাপটপেই হয়ত শুনবে। তবু শুনতে হবে। আরও অনেক শিল্পীর অনেক ভাল ভাল গান আছে, যা প্রচারের বাইরে থেকে গেছে আজও। এখন তো প্রচারের যুগ। কিন্তু বহু শিল্পী আছেন, বহু সঙ্গীত শিক্ষক আছেন, যাঁরা সৃষ্টির আনন্দে থাকেন। তাঁরা প্রচারের বাইরে থাকেন। তাঁদের কাছে যেমন শ্রোতাদের যেতে হবে, তেমনি নতুনদেরও যেতে হবে। যে সব নতুন শিল্পী বা শিক্ষার্থী এগিয়ে যেতে, তাদের যেতেই হবে সাধক সঙ্গীত গুরুদের কাছে।
• আপনি কি প্রথম প্লে-‌ব্যাক শুরু করেন হিন্দিতে?‌ মিণাকুমারী অভিনীত ‘‌সাহারা’‌য়?‌
•• না, না। প্রথম বাংলা ছবিতেই গেয়েচি—‘‌মামলার ফল’‌। তারপর ‘‌সাহারা’‌য়। মিম্মি লিপ দিয়েছিলেন আমার গানে। ছবিটা চলেনি। কিন্তু আমার গানটা জনপ্রিয় হয়েছিল।
• তখন বাংলা আর হিন্দি ছবিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, লতা-‌আশার সুবর্ণযুগ। আপনার বয় করেনি?‌ বা কোনও বাধা পাননি?‌
•• দেখো, অন ইন্ডিয়া কম্পিটিশনে জিতে আমি সিনেমার গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। তারাচাঁদ বরজাতিয়ার মতো বিশাল প্রোডিউসার, ডিস্ট্রিবিউটর আমাকে নিয়ে গেছেন হিন্দি ছবিতে গান গাওয়াতে। তাই বাধা পাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। হিন্দিতে, বাংলায় শ্রেষ্ঠ সব সঙ্গীত পরিচালক আমার গলার প্রশংসা করেছেন, আমাকে স্নেহ, ভালবাসা দিয়েছেন। সেটাই আমার পাথেয়। শুধু হিন্দি, বাংলা তো নয়, ভারতের অনেক ভাষাতে আমি গান গেয়েছি, যা জনপ্রিয় হয়েছে। আমি বিরাট উচ্চাকাঙ্খী নই। কিন্তু সুধীনদা, গৌরীদার মতো সঙ্গীত-‌ব্যক্তিত্ব আমাকে বলতেন, ‘‌তোর গান বেঁচে থাকবে। গানের আরতি থাকবেই।’‌ এই আশীর্বাদ আমাকে শক্তি জুগিয়েছে বরাবর।
• রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম করলেন। পুজো আসছে। আরতি মুখোপাধ্যায় কি পুজোর বাংলা গান নিয়ে আসবেন ?‌
•• আসব তো। সত্যিই আসব। গৌরীদা (‌গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার)‌ বহু বছর আগে আমার জন্যে একটা গান লিখেছিলেন, নামও দিয়েছিলেন ‘‌পুজোর আরতি’‌। এবার পুজোতেও তাই পুজোর আরতি আসবে।
• কারা লিখলেন, কারা সুর দিলেন?‌
•• সুনীলবরণ আমার জন্যে গান লিখেছিলেন। উনি তখন বেঁচে ছিলেন। আমাকে দিয়েছিলেন গানগুলো। সুর করেছে আমার ভাই অনুপ মুখোপাধ্যায় আর গৌতম মুখোপাধ্যায়। গৌতম হল হেমন্তদার (‌হেমন্ত মুখোপাধ্যায়)‌ জামাই। রানুর বর। খুব ট্যালেন্টেড সঙ্গীতজ্ঞ। এখানকার কেউ তার খোঁজ রাখে?‌ কানন সাহেবের কাছে শিখেছে গৌতম। শিখেছে অন্নপূর্ণা দেবীর কাছেও। আমার গানে অসাধারণ সুর করেছে গৌতম। এইসব গান নিয়ে পুজোয় আসব শ্রোতাদের কাছে।
কথা বলতে বলতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে আরতি মুখোপাধ্যায়ের চোখ। এখনও নতুন গান দিয়ে শ্রোতাদের ছুঁতে চান এই অনন্য শিল্পী। পুজোর আরতির অপেক্ষায় থাকছি আমরাও।‌

কলকাতায় নিজের বাসভবনে আরতি মুখোপাধ্যায়। ছবি:‌ অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

জনপ্রিয়

Back To Top