অনিন্দ্য সেনগুপ্ত: "সুপ্রিয়া দেবীর নাম শুনলে আমাদের অবধারিত মনে পড়ে অনসূয়া আর নীতাকে।‌ সকালে মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পরেই প্রথম মনে পড়ল ঋত্বিক ঘটকের হাতে তৈরি এই চরিত্রগুলির কথা। খুঁজে দেখতে ইচ্ছা করে, কেন সুপ্রিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন ঋত্বিক? আসলে সুপ্রিয়া দেবীর মধ্যে ছিল এশিয় ও ইউরোপিয় সৌন্দর্য্যের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। যে প্রত্নপ্রতিমার ছবি ঋত্বিকের ক্যামেরায় বারবার ধরা পড়েছে, সুপ্রিয়া ছিলেন সেই প্রতিমার আদর্শ উদাহরণ। কেননা, তাঁর মুখের গঠন, চেহারা ছিল, যাকে বলে ‘‌ঠিক দুগ্গা ঠাকুরের মতো’‌। আর সেই মিথিকাল সৌন্দর্য্যকে নতুন হাতে এঁকেছিলেন ঋত্বিক। আর কিছু নয়, বারবার সেই আশ্চর্য সাদাকালো কাব্যে নীতার বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত তাই কোথাও যেন মিশে যায় প্রচলিত কাব্যধারার নায়িকা সংজ্ঞা। সেই কাব্য ধারার রূপ গন্ধকে নতুন করে পূরণ করেন সুপ্রিয়া দেবী। যা পূর্ণতা দেয় তাঁর রূপ। শুধু তাই নয়, সুপ্রিয়ার সঙ্গে আশ্চর্য মিল ছিল ইউরোপিয় জনপ্রিয় নায়িকাদের।

কেউ কেউ বলতেন, প্রায় সমসাময়িক সোফিয়া লোরেনের সঙ্গে অদ্ভুত মিল ছিল সুপ্রিয়ার। শুধু সোফিয়াই নন, আদর্শ ইতালিয় সুন্দরী বলতে যা বোঝাতো, তাঁর প্রায় সমস্তটাই মিলে যেত সুপ্রিয়ার সঙ্গে। ১৯৩৪ সালে ইতালির রোমে জন্ম নিয়েছিলেন সোফিয়া, আর তার একবছর আগে সুপ্রিয়া জন্মেছিলেন বার্মায়। পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই অপূর্ব সুন্দরীর মধ্যে তাই তুলনা চলে এসেছিল স্বাভাবিক নিয়মে। একধরণের বলিষ্ট, দৃপ্ত, অ্যাসার্টিভ ব্যক্তিত্ব সুচিত্রা সেনের মধ্যেও ছিল। মূলধারার ছবিতে কিন্তু সেইরকম ব্যক্তিত্বই একই সময়ে সুপ্রিয়া কীভাবে ভিন্নতার সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন তা বোঝার জন্য আরো নিবিষ্ট নিরীক্ষার প্রয়োজন। সিনেমা জগতে যাঁরা ‘‌স্টার’, তাঁদের শুধু অভিনয় করলেই চলে না, একধরণের পারসোনা বয়ে নিয়ে চলতে হয় যা হয়ে ওঠে এক একটি যুগের প্রতীকের মত। সুপ্রিয়া দেবীরা তা পারতেন। সবাই পারে না। "

 

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যার অধ্যাপক

জনপ্রিয়

Back To Top